শনিবার, ১৮ মে, ২০১৯

গান্ধির হত্যাকারী ‘দেশপ্রেমিক’, সাধ্বী প্রজ্ঞার মন্তব্য নাড়া দিয়েছে জাতির বিবেককে


আহমদ হাসান ইমরান

সংঘ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত স্বঘোষিত স্বাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর শুধু যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্যই মিডিয়ায় আলোচিত হয়েছেন তা নয়, তাঁর নানা বিষভরা উক্তিও তাঁকে আরও খ্যাতি বা কুখ্যাতি এনে দিয়েছে। তবে বেশ বোঝা যায়, নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ এঁদের কাছে কিন্তু সন্ত্রাসী এই তরুণী সাধ্বী প্রজ্ঞা হিরো বা অনুকরণীয় আদর্শ। অন্যদিকে– যারা তথ্য-প্রমাণ ও সুবিচারের অনুসারী তারা জানেন– এই প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর এবং তাঁর সহযোগীদের দ্বারা সংঘঠিত বিস্ফোরণগুলির ফলে বহু নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।  তা সে মালেগাঁও-১– মালেগাঁও-২– সমঝোতা এক্সপ্রেস– আজমীর দরগাহ– মক্কা মসজিদ কিংবা দিল্লির জামা মসজিদই হোক না কেন। শহিদ হেমন্ত কারকারে– যিনি মুম্বাইতে সন্ত্রাসী হামলা রুখতে গিয়ে খানিকটা রহস্যময়ভাবে নিহত হন। দৃঢ়চেতা ও নিরপেক্ষ এই আধিকারিক তথ্য-প্রমাণসহ  গেরুয়া-সন্ত্রাসের স্বর*প উন্মোচন করেছিলেন। পরে মোদি সরকারের আমলে এনআইএ এই বিস্ফোরণগুলির তদন্তভার গ্রহণ করে ধৃত সন্ত্রাসীদের হয় জামিন– নয় মুক্তির ব্যবস্থা করে। প্রতিবাদস্বর*প খোদ সরকারি আইনজীবী রোহিনী সালিয়ন পদত্যাগ করেন। তিনি এও বলেন– এনআইএ কোথায় দোষীদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পেশ করবে– বরং তারা উলটে এই অপরাধীদের আড়াল করছে এবং তাদের পক্ষেই ঢালস্বর*প কাজ করছে।
প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর– স্বামী অসীমানন্দ– লেফটেন্যান্ট পুরোহিত এদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা ছিল। বেশিরভাগ মামলাতেই এরা খালাস পেয়ে গেলেও দু’একটি মামলা এখনও এদের উপর রয়েছে। তবে সেগুলোতেও এনআইএ-র বদান্যতায় তারা জামিন পেয়ে গেছে।  প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর এদের মধ্যে অন্যতম।
প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরকে বিজেপি তাঁর ‘অসামান্য কৃতিত্বে’র জন্য স্বাগত জানিয়ে খোদ ভারতীয় পার্লামেন্টের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে।  এরপরই সাধ্বী প্রজ্ঞা বিবৃতি দিয়ে বলেন– তাঁর অভিশাপেই হেমন্ত কারকারে নিহত হয়েছেন। দাউদ ইব্রাহিম কিংবা হাফিজ সৈয়দকে অভিশাপ না দিয়ে হেমন্ত কারকারেকে প্রজ্ঞা কেন অভিশাপ দিয়ে হত্যা করলেন– সেই প্রশ্নও উঠেছে।
আর দ্বিতীয় বিতর্কটিতে জবরদস্তভাবে প্রজ্ঞা ফের লাইম লাইটে এসেছেন। এর শুরু করেছিলেন দক্ষিণের প্রখ্যাত অভিনেতা এবং বর্তমানে একটি  রাজনৈতিক দল মাক্কাল নিধি মাইয়াম-এর প্রধান কমল হাসান। দোষের মধ্যে তিনি বলেছিলেন– স্বাধীন ভারতের প্রথম উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী হচ্ছে একজন হিন্দু। তিনি তাঁর বক্তব্যের সপক্ষে জাতির জনক গান্ধিজির হত্যাকারী নাথুরাম গডসের নাম উল্লেখ করেন। আর যায় কোথায়! নাথুরাম গডসকে উগ্রপন্থী বলায় সংঘপন্থী গডসের ভক্তরা কমল হাসানের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। খোদ বিজেপি গডসকে উগ্রপন্থী বলার জন্য নির্বাচন কমিশনে কমল হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। সোশ্যাল মিডিয়াতে কমল হাসানের বিরুদ্ধে দেদার গালিগালাজ চলতে থাকে। একটি নির্বাচনী জনসভায় তাঁকে লক্ষ্য করে নাথুরাম গডসের এক ভক্ত চপ্পল ছুড়ে মারে। এখানেই শেষ নয়– এর পরে আসরে নামেন বিজেপির নয়া মসিহা প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর। প্রজ্ঞা বলেন– মহাত্মা গান্ধির হত্যাকারী নাথুরাম গডস একজন দেশপ্রেমিক। প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর আরও বলেন– নাথুরাম গডসে দেশপ্রেমিক ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও তিনি দেশভক্ত হিসেবেই খ্যাত থাকবেন। অহিংসার পূজারী গান্ধির হত্যাকারীকে এভাবে ‘দেশপ্রেমিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করায় বিজেপি খানিকটা অস্বস্তিতে পড়ে। অবশ্য এ কথাও সত্য– আরএসএস শেষপর্যন্ত স্বীকার করেছে যে– নাথুরাম গডসে এবং তার সহযোগী এক সময় আরএসএস-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। আর এজন্য সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল সেই সময় আরএসএস’কে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেন। তবে অনেকে বলেছেন– বল্লভভাই প্যাটেল এসব পদক্ষেপ নিয়ে হয়তো আরএসএস’কে বরং খানিকটা আড়াল-ই করেছিলেন। গান্ধি হত্যার জন্য সংগঠন হিসেবে আরএসএসকে দায়ী করা হয়নি। নরেন্দ্র মোদি চিন থেকে প্রযুক্তি ও নির্মাণ সামগ্রী নিয়ে গুজরাতে বল্লভভাই প্যাটেলের বিশাল এক মূর্তি তৈরি করেছেন।
(শেষ অংশ আগামীকাল)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only