বুধবার, ১৫ মে, ২০১৯

বিনাশকালে বুদ্ধিনাশ অমিতের, আহমদ হাসান ইমরানের কলাম





বিনাশকালে বুদ্ধিনাশ অমিতের

এই বাঙ্গাল কাঙ্গাল! বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে কামাল




আহমদ হাসান ইমরান

বাংলায় একটি কথা রয়েছে, ‘বিনাশকালে বুদ্ধিনাশ’। মনে হচ্ছে, মোদির দোসর অমিত শাহ বাংলায় এসে কী বলতে হবে, তা বেমালুম গুলিয়ে ফেলছেন। একদিকে তাঁর বেশিরভাগ সভাতেই লোকজন হচ্ছে না। অন্যদিকে, যে খবরাখবর সামনে আসছে তাতে দেখা যাচ্ছে বিজেপি এবার বেদম হারতে চলেছে। ফলে মাথা গুলিয়ে যাওয়ারই কথা। কত সাধ ছিল, কত আশা ছিল মোদি-২ হবে। কিন্তু মুখে ‘মারিতং জগৎ’ করেও মানুষের ভোটে মানুষের ক্রোধে বিজেপি হারছে, তা অমিতজিরা বুঝে গেছেন। বুঝে গেছেন তাঁদের প্রধান সহচর উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ যোগীও। তিনি তো সরাসরি হুমকি দিয়ে রেখেছেন, যদি বিজেপি হারে সেক্ষেত্রে তাঁরা সারাদেশে অর্থাৎ আমাদের এই পবিত্র ভারতভূমিতে আগুন লাগিয়ে দেবেন। তা কিন্তু যোগীজি-অমিতজিরা পারবেন না এমন কোনও গ্যারান্টি নেই। এই ধরনের ‘সৎকর্ম’ যোগীজিরা যে বহুবার করেছেন, গেরুয়া ইতিহাসে না হলেও সংবাদপত্রে তার প্রমাণ রয়েছে। এখন যোগী-মোদি-অমিত শাহদের খোয়াব হল, যেসব আসন তাঁরা গো-বলয়ে হারাবেন, তার ক্ষতিপূরণ নাকি করা হবে বাংলা ও উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে। কিন্তু মুশকিল হল, বাঙালিরা এখনও বিজেপি করেন না। তাই ভাষণ দিতে আসতে হচ্ছে যোগী-মোদি-অমিত শাহদের। যোগীজিকে নিয়ে অবশ্য তেমন কোনও সমস্যা নেই। তিনি বাংলায় এসে খালি মাঠেই এবং অনেক ক্ষেত্রে খালি মঞ্চ থেকে গরম গরম বক্তৃতা দিয়ে সরে পড়ছেন। আর অমিতজি কী যে বলবেন, তা খুঁজে পাচ্ছেন না। বীরভূমে এসে খুব বড় রবীন্দ্র-ভক্ত সেজে বড় মুখ করে বলে দিলেন, বীরভূমে পূর্ণ ভূমিতেই নাকি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেছেন। তবে এই রবীন্দ্রনাথ যদি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির নোবেল জয়ী রবিঠাকুর হন, তাহলে কিন্তু কথাটি সত্য নয়। তবে একে অমৃত না হলেও অমিত-বাচন বলে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। সোমবার অমিতজি বাংলায় এসে বচন দিলেন যে, বাঙালিদের দশা নাকি এখন কাঙালিদের মতো। আর এর জন্য দায়ী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অর্থাৎ বাঙালিরা এখন কাঙালিতে পরিণত হয়েছে। এ কথা সত্য, বাঙালি-বিরোধী বিজেপির মনোগত ইচ্ছে সোনার বাংলা কাঙালি স্থানে পরিণত হোক। আর তার জন্য তাদের চেষ্টারও কমতি নেই। মোদি সরকার আসার পর থেকেই বাংলাকে অব্যাহতভাবে বঞ্চিত করে চলেছে। কিন্তু মহাশয়দের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজস্ব পুঁজি থেকেই বাংলায় উন্নয়ন কাজের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন। কৃষি-শিল্প-স্বাস্থ্য, স্কুলের ছাত্রছাত্রী, কৃষক---সব ক্ষেত্রেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাকে টেনে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আর এর আশাপ্রদ ফলও পাওয়া গেছে। বাংলায় বেকারত্ব কমেছে, কৃষির উন্নয়ন হয়েছে এবং শিল্পেও বিনিয়োগে জোয়ার বইতে শুরু করেছে। তাই শুধুমাত্র ক্ষমতায় আসার জন্য অমিত শাহ বাঙালি জাতিকেই কাঙাল বলে বর্ণনা করে সোনার বাংলার চূড়ান্ত অপমান করেছেন। আর একটা কথাও গুরুত্বপূর্ণ। তা নিয়ে আমি আজ সকালেই ট্যুইট করেছি। তাতে বলেছি, বাঙালি মাথা উঁচু করে বাঁচার জাতি, তারা কোনওভাবে কাঙাল নয়। এ ছাড়া এই বাংলা ও রাজধানী কলকাতাকে কেন্দ্র করে দেশের প্রায় সমস্ত শিল্প ও বিজনেস হাউজের জন্ম হয়েছে। এখন থেকেই তাঁরা তাঁদের সম্পদ গড়ে তুলেছে। তারপর অনেকেই পা বাড়িয়েছেন নিজপ্রদেশে কিংবা ভিন্ন রাজ্যে। এঁদের মধ্যে মোদি ও অমিত শাহের প্রদেশবাসী গুজরাতের বিজনেস হাউজগুলিও পড়ে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাঙ্গাল কিন্তু কাঙ্গাল হয়নি। দেশভাগের পর লাখ লাখ উদ্বাস্তুকে আশ্রয় ও পুনর্বাসন দিয়েছে এই বাঙ্গাল। সীমান্ত প্রদেশ হলেও গুজরাত দেশভাগের কোনও বোঝা বহন করেনি। বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ এবং অন্যান্য রাজ্য থেকে শ্রমিক, শিক্ষিত ও আধা-শিক্ষিত বেকারদের কোলে টেনে নিয়েছে এই বাংলাই। তা সত্ত্বেও কিন্তু বাংলা কাঙাল হয়নি। সন্দেহ নেই, বামফ্রন্ট সরকারের ভুল শিল্প-কৃষি ও শিক্ষা নীতির ফলে বাংলায় এক সময় স্থবিরতার সৃষ্টি হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর তৃণমূল কংগ্রেস সেই বুকচাপা জগদ্দল পাথরকে সরিয়ে বাংলার সবক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় জোয়ার এনেছে। তা সে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক উন্নয়ন, ব্যবসা, শিল্প, কৃষি---যাই হোক না কেন। মোদিজি ক্ষমতায় আসার পর অবশ্য বাংলার উন্নয়নে প্রাপ্য অর্থ বরাদ্দ না করে বাঙ্গালকে প্রকৃতই কাঙ্গাল করার জোর প্রয়াস চালিয়েছেন। কিন্তু বাংলার মু্যূমন্ত্রী কেন্দ্রের এই বঞ্চনাকে আমল দেননি। শিক্ষা, সংস্কৃতি, বুদ্ধিভিত্তিক কার্যক্রম, গ্রামোন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ---প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাংলা অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় বেশ এগিয়ে রয়েছে। তাই বাংলায় এসে এই বাঙ্গালকেই ‘কাঙ্গাল’ বলে প্রতিপন্ন করার যে প্রয়াস বিজেপির সর্বভারতীয় নেতা ও খুন-দাঙ্গাসহ বিভিন্ন মামলায় জেলখাটা আসামি অমিত শাহ করে গেলেন, তার প্রতিফল তাঁকে ভুগতেই হবে। এর উপর র‍্যালি বের করে বহিরাগতদের দিয়ে যেভাবে বাংলার শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার আন্দোলনের প্রাণপুরুষ বিদ্যাসাগর কলেজ ও বিদ্যাসাগরের মূর্তিকে বহিরাগত বিজেপি ও গেরুয়া বাহিনী ধ্বংস করে দিল তাতে প্রমাণ হয়, এরা বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস সবকিছু সম্বন্ধেই একেবারেই অজ্ঞ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সঠিকভাবে বলেছেন, বাংলার এই অপমানের জবাব বাংলার বাসিন্দারা অবশ্যই দেবে। সবথেকে মোক্ষম কাজটি করেছেন তৃণমূলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন। তিনি অমিত শাহের উদ্দেশ্যে পেশ করেছেন জীবনানন্দ দাসের একটি বিখ্যাত কবিতার আবৃত্তি। অমিত শাহ এর ‘ভাও’ তো নয়ই, বাংলার নিসর্গ চেতনার বিন্দুবিসর্গও যে বুঝবেন না, তা বলাই বাহুল্য। ডেরেক ও’ব্রায়েনের এই মিসাইল আঘাত সহ্য করে অমিতজি ফের বাংলায় কোনওদিন আসবেন কিনা, কে জানে!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only