সোমবার, ৬ মে, ২০১৯

১৯৭১: মাদার অব সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, আহমদ হাসান ইমরানের কলমে


সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে এখন তীব্র বাদানুবাদ চলছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিছুতেই বিশ্বাস করতে রাজি নন যে, কংগ্রেস পরিচালিত সরকারও অতীতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করেছে। রাজনীতিতে ভদ্রলোক বলে পরিচিত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছেন, তাঁর সরকারও এর আগে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করেছে। কিন্তু তা নিয়ে শোরগোল করেনি– পাবলিসিটি দেয়নি কিংবা পাবলিসিটি নেয়নি। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকগুলিকে কংগ্রেস জোট সরকার ‘গোপন সামরিক তথ্য’ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কংগ্রেস নেতৃত্বের মতে, সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের মধ্যে দিয়ে কার্যসিদ্ধির পর তারা এ নিয়ে শোরগোল করে পরিবেশ উত্তপ্ত করেনি। কিন্তু মোদিজি ও তাঁর অনুগামী নেতৃবৃন্দের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে– সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের উপর একমাত্র মোদি সরকারেরই অধিকার রয়েছে। কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় যে সেনা– বিমান ও নৌ-বাহিনী ছিল তাদের উপর ভরসা করে তৎকালীন সরকার মোদিজির মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। অবশ্য ৫৬ ইঞ্চি ছাতির অধিকারী বিজেপির নরেন্দ্র মোদি সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে পুরো ভারতবাসীকে গর্বিত করে দিয়েছে।

এখন এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইকটি নরেন্দ্র মোদিজির নির্বাচনী ভাষণে প্রধান মুদ্দা। কারণ– উন্নয়ন ও বিকাশের যে সমস্ত জুমলা মোদিজি বাজারে ছেড়েছিলেন– তা বাস্তবায়িত না হওয়াতে তিনি এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সাফল্যকেই প্রচারের প্রধান বিষয় করে তুলেছেন। প্রতিটি সভায় বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বুক ঠুঁকে জনতাকে জিজ্ঞেস করছেন– বালাকোটে বিমান হামলা করায় আপনারা কি গর্বিত হননি? আপনাদের সিনা (বুক) কি গর্বে ফুলে ওঠেনি? রোগ-শোক– ক্ষুধা-দারিদ্র্য– বেকারত্ব– কৃষিঋণের ফাঁদ---সব কিছু ভুলে বারবার জিজ্ঞাসায় জনতাকে বলতে হয়েছে---হ্যাঁ তাঁদের সিনা ৫৬ ইঞ্চি হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও মিডিয়া বলেছে এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে পাক জঙ্গিদের খুব একটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে– এমন কোনও সাবুদ পাওয়া যায়নি। যে মাদ্রাসাকে লক্ষ্য করে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হয়েছিল– সেটা অক্ষত রয়েছে। অমিত শাহ এবং বিজেপির অন্যান্য নেতা-মন্ত্রী দাবি করেছেন, এই হামলায় ৩০০ থেকে ৪০০ জঙ্গির মৃত্যু হয়েছে।

ভারতীয় বিমানবাহিনী অবশ্য বলেছে, লাশ গোনা তাদের কাজ নয়। বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও বলেছেন, আমাদের বিমানবাহিনীর হামলায় কোনও পাকিস্তানি নাগরিকের মৃত্যু হয়নি। দেখা গেছে, এই ঘটনার সময় আমাদেরই এক ক্ষেপাণাস্ত্রের আঘাতে একটি শক্তিশালী হেলিকপ্টার কাশ্মীরে ধ্বংস হয়। আর তাতে বিমানবাহিনীর পাঁচজন পদস্থ আধিকারিক নিহত হন। নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং কংগ্রেস সরকার কথিত সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে বেশ কয়েকবার ব্যঙ্গ করেছেন।

এ দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডি এস হুদা দাবি করেছেন– মনমোহন সরকারের আমলেও সীমান্ত পেরিয়ে জঙ্গিদের উপর আঘাত হানা হয়। তিনি আরও বলেন– অতীতে এ ধরনের আরও ছ’টি সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হয়েছে। জেনারেল হুদার মতে– মিলিটারি অপারেশন নিয়ে কারওরই রাজনৈতিক ফায়দা লোটা উচিত নয়। আর নির্বাচনে তো সেনাবাহিনীর কৃতিত্ব থেকে ফায়দা তোলার চেষ্টা সম্পূর্ণ অনৈতিক।

কংগ্রেস নেতা রাজীব শুক্লা দিন কয়েক আগে নির্দিষ্ট বিবরণ দিয়ে বলেছেন– মনমোহনের সময় ছ’টি সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হয়। এমনকী অটল বিহারী বাজপেয়ীর সময়ও সামরিক বাহিনী দু’টো স্ট্রাইক করেছিল।

কিন্তু নরেন্দ্র মোদিজিকে কেউই মনে করিয়ে দিচ্ছেন না– পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইতিহাসের সবথেকে বড় সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হয়েছে কংগ্রেস আমলে ইন্দিরা গান্ধির নেতৃত্বে। ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে ভেঙে দু’টুকরো করে দেয়। জেনারেল অর্জুন সিং অরোরার নেতৃত্বে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানকে পর্যুদস্ত করে উপস্থিত হয় ঢাকায়। পাক জেনারেল নিয়াজি তাঁর ৯০ হাজার সেনাসহ আত্মসমর্পণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। মানচিত্র থেকে পূর্ব পাকিস্তান নামটি চিরতরে বিদায় নেয়। অভু্যদয় হয় বাংলাদেশের। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এভাবে সামরিক বাহিনীর অভিযানে আর কোনও রাষ্ট্রের জন্ম হয়নি। মোদিজি ও তাঁর অনুগামীরা এই ‘মাদার অব সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’টির কথা বেমালুম ভুলে যাচ্ছেন। তাঁরা ৫৬ ইঞ্চি ছাতি দেখাতে ব্যস্ত।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, এত বড় সামরিক ও কূটনৈতিক কৃতিত্বের পরও ইন্দিরা গান্ধি কিন্তু এর জন্য কোনও রাজনৈতিক ফায়দা তোলার কিংবা অযথা গর্ব করার চেষ্টা করেননি। তবে মনে হয়– কংগ্রেস নেতারাও সম্ভবত বিষয়টি ভুলে গেছেন। কারণ তাঁরা মোদিজির সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সামনে ইন্দিরা গান্ধির ‘মাদার অব সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-কে তুলে ধরার কোনও চেষ্টাই করছেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only