বৃহস্পতিবার, ১৬ মে, ২০১৯

উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ

গোলাম রাশিদ

ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় একটি নাম নয় শুধুমাত্র। বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড। বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তিনি অমর ‘বিদ্যাসাগর’। তাঁর মূর্তি ভেঙে ফেলল দুর্বৃত্তরা। আমরা আজ কোথায় চলেছি?


দেখ রাম, কাল তুমি, পড়িবার সময় বড় গোল করিয়াছিলে। পড়িবার সময় গোল করিলে, ভাল পড়া হয় না, কেহ শুনিতে পায় না। তোমাকে বারণ করিতেছি, আর কখনও পড়িবার সময় গোল করিও না।

তুলে আছাড় দিয়ে মাটিতে ফেলা হচ্ছে। আবার তোলা হচ্ছে ভগ্নপ্রায় মূর্তি। আবার ছুড়ে ফেলা হচ্ছে। এ ভাবেই বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে ফেলার সাক্ষী থাকল কলকাতা। আর ঠিক সেই সময় দুষ্কূতীদের কি এই কথাগুলি মনে পড়েছিল। কিংবা, সুবোধ বালক গোপালের কথা কি মনের স্মৃতিকোঠায় ভেসে ওঠেনি? ইলেকট্রিক আলোয় ক্যামেরাতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ভেঙে ফেলার দৃশ্য। কিন্তু এই দৃশ্য অসহ্য। এই ছবি আলোর নয়, অন্ধকারের। আর সেই অভিশপ্ত অন্ধকার বাসা বেঁধেছে খোদ কলকাতায়, বইপাড়া কলেজ স্ট্রিটে।  এই কলকাতা সেই কলকাতা, যাকে বলা হয় ভারতের সাংস্টৃñতিক রাজধানী। এই কলকাতা সেই কলকাতা যা একদিন দেশকে পথ দেখিয়েছে। এই কলতাতা রাজা রামমোহন রায়– ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর– স্বামী বিবেকানন্দ– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর– কাজী নজরুল ইসলাম– মৌলানা আজাদের কলকাতা। তাঁদের কর্মক্ষেত্রের লীলাভূমি কলকাতা কলংকিত হল। আমরা ধরে রাখতে পারলাম না আমাদের শান-শওকতময় ঐতিহ্য। নিজেদের কাছে আমরা নিজেই আজ লজ্জিত। এ লজ্জা আমরা রাখব কোথায়?

বিদ্যাসাগরকে চেনে না এমন বাঙালি বোধহয় নেই। শৈশবের বর্ণপরিচয় যার হাত ধরে শুরু হয়, তাঁকে চিরদিন মনে রাখতেই তো হবে। এমনকি যারা লেখাপড়া করেননি, তারাও চেনেন এই ধুতিপরা, চাদর গায়ে প্রশস্ত কপালের মানুষটিকে। কারণ তিনি পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল– সমাজ-সংস্কারক– সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করেছেন। বিধবা নারীদের অধিকার আদায়ের জন্য প্রাণপাত করেছেন। ‘বিদ্যাসাগর’ নামটাই তো তাকে চিনিয়ে দিয়েছে। বাঙালির বিদ্যাসাগর ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেউ চিনবেন না তাই হয়! সেই প্রাণের বিদ্যাসাগরকে আজ ভূলুন্ঠিত করা হল। ভেঙে ফেলা হল তাঁর আবক্ষ মূর্তি। কারা ভাঙল? চৌকিদারের দল। তারা নিজেদের চৌকিদার বলে দাবি করে। কিন্তু রক্ষা করার বদলে বাংলায় এসে বর্গীরা (হ্যাঁ, একদম বর্গীদেরই মতো) বাংলার সম্মানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল। ওরা বর্গী, ওরা অমানুষ, ওরা বাঙালিকে ‘কাঙাল’ বলে। ওরা বাঙালিকে ভিখারি দেখতে চায়, ওরা বাঙালিকে চরম অপদস্থ করতে চায়। ওরা বিদ্যাসাগরের মূর্তি গুঁড়িয়ে দিয়ে বাংলাকে নিরক্ষর প্রমাণ করে রাখতে চায়। ওদের নাম এই বিদ্যাসাগরের মাটিতে উচ্চারণ করতে বিবমিষা হচ্ছে। এই ন্যক্কারজনক কাজের জন্যই কি নির্বাচনের বাহানায় শান্তির বাংলায় পদার্পণ এই নব্য বর্গীদের?
সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলনের উত্তাল সময়েও বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছিল। সেই ইতিহাসেরই যেন পুনরাবৃত্তি ঘটাল এই হায়েনারা। ২০০ বছরের জন্মদিন আসছে তাঁর। তার জন্য সাজছিল শহর। সেই সময় এই আক্রমণ বিদ্যাসাগরের মূর্তিকে আক্রমণ নয়, তাঁর আদর্শকে আক্রমণ।
এই নব্য বর্গীরাই কিছুদিন আগে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মূর্তিতে কালি মাখিয়ে দিয়েছিল। ত্রিপুরায় লেনিন, সুকান্ত ভট্টাচার্যের মূর্তি ওরাই ভেঙেছে। দস্যুদের সস্কৃতি মূর্তি ভাঙার সস্কৃতি। সেই সস্কৃতি সারা দেশে কায়েম করতে চাইছে তারা। মহাপুরুষরা তাদের কাছে কোনও সম্মানের যোগ্য নয়। ওদেরকে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়াই ওদের ধর্ম। ভেঙে ফেলাই ওদের হাতিয়ার। বাবরি মসজিদ ভেঙেছে ওরাই। ভাঙাই যে ওদের মজ্জাগত, তার প্রমাণ দিল বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে ফেলে। ওরা প্রণম্যদের রাখতে চায় না। গডসেকে ওরা পূজনীয় মনে করে। যাদের কাছে জাতির জনক মহাত্মা গান্ধির হত্যাকারী মহাপুরুষ, তারা তো এমন কাজই করবে!

আজ একটাই আহ্বান। প্রতিবাদ করুন। না-হলে একদিন কলকাতায় বহিরাগত হয়ে যেতে হবে আমাদের। সস্কৃতির রাজধানী কলকাতা, গঙ্গার ধারের কলকাতা, নন্দনের কলকাতা এই কুৎসিত দৃশ্য দেখল। এই দৃশ্য তৈরির জন্য কি আমরা একটুকুও দায়ী নই? নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য আমরা কি ইঞ্চি ইঞ্চি জমি নব্য বর্গীদের ছেড়ে দিইনি? বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, সংখ্যালঘু মুসলিমদের জব্দকারী দল হিসেবে এই মসজিদ-বিদ্বেষীদের আপানারা সহানুভূতি দেখিয়ে এই বাংলায় ডেকে আনেননি? খাল কেটে কুমির এনেছেন। এই বাংলায় দাঁড়িয়ে (যে-বাংলা নেতাজির বাংলা) ওরা উচ্চকণ্ঠে বিজাতীয় শব্দ উচ্চারণ করে স্লোগান দিচ্ছে। দলের পর দল গেরুয়া পরে ট্রাক ভর্তি হয়ে ভাড়া করা গুন্ডা ঢুকে পড়ছে এই সোনার বাংলায়। সিরাজ-উদ-দৌলার এই বাংলাকে তছনছ করে দেওয়ার জন্য পঙ্গপালের মতো ওরা আসছে। এখন আর লুকিয়ে থাকার সময় নয়। এখন আর চুপচাপ বসে থাকার সময় নয়। এখন সময় হয়েছে যোগ্য জবাব দেওয়ার। ওরা আজ বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙছে, কাল রামমোহন, বিবেকানন্দ, পরশু নজরুলের মূর্তি ভাঙবে। তারপর আমার, আপনাদের ঘরের দরজায় এসে কড়া নাড়বে। আপনি ভয়ে দরজা খুলবেন না। ঘরে কিশোরি মেয়ে, বউ, ছোট্ট বাচ্চা। আপনি তখন শিউরে উঠবেন। মালদার ছেলে আফরাজুলকে ওরা রাজস্থানের মাটিতে পুড়িয়ে মারে। বাংলার মাটিতে জায়গা পেলে বর্গীরা কী করবে সে ধারণা করার জন্য খুব বেশি চিন্তা করতে হয় না। দেখুন, দেশের মসনদে কাদের আপনি এনেছেন ভোট দিয়ে! আর সত্যি বলতে কি, এই লড়াইটা ভোট বাক্সে হলেও এটা পুরোপুরি রাজনৈতিক বিষয় নয়। এটি সন্ত্রাস। ভাষা সন্ত্রাস ও সস্কৃতি সন্ত্রাস। ওরা বাঙালি সস্কৃতি পছন্দ করে না। বাঙালিবাবুদের দু-চোখে দেখতে পারে না। কারণ হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান কায়েমে বড় বাধা এই ধর্মনিরপেক্ষ সস্কৃতিপরায়ণ বাঙালিরা। ওরা ভুলতে পারে না চিত্তরঞ্জন দাশ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে, ভয় পায়। তাই এই বাংলায় ঘাঁটি গেড়ে ওরা বাঙালিকে ধ্বংস করতে চায়। আজ কলকাতাজুড়ে বিজাতীয়দের রাজত্ব। আমরাই সেই সুযোগ করে দিয়েছি। আজ বাংলার রাজধানীতে একটি পান-সিগারেট-চকোলেট কিনতে গেলেও হিন্দিতে কথা বলতে হয়। অথচ বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য রফিক– জব্বার– সালাম– বরকতরা প্রাণ দিয়েছিল। এখন আমরা যেন নিজভূমে ‘পরভাষী’ হয়ে উঠৈছি। পিছনে হঠতে হঠতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। ঘুরে দাঁড়ানোর এই তো সময়। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। বর্গীরা যেন আর সুবিধা করতে না পারে এ বাংলায়। সমস্ত বাঙালিকে আজ রাজনৈতিক ভেদ মুছে একজোট হতে হবে। ঘর পোড়াতে আসছে দস্যুরা। অতএব দলাদলির রাজনীতি পরে করুন, কমরেড! যদি ঘরটাই পুড়ে যায়, তবে কোথায় দাঁড়িয়ে রাজনীতি করবেন? তাই এবার জনতার ব্যারিকেড তৈরি হোক। এই ব্যারিকেড ভেদ করে আর আমরা কোনও মহাপুরুষের সম্মানকে ভূলুণ্ঠিত হতে দেব না। বাংলার মাটি হয়ে উঠুক দুর্জয় ঘাঁটি।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only