বৃহস্পতিবার, ১৬ মে, ২০১৯

সাফল্যের দুনিয়ায় আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দুই কৃতী

পিতার সঙ্গে আবু দাউদ পাখিরা
গোলাম রাশিদ

পলাশ ফুল ফুটে আছে ক্যাম্পাসের চারধারের গাছগুলিতে। আবু দাউদ পাখিরার অবসর সময়ে চোখের প্রশান্তি এনে দেয় এই প্রকৃতি। আর বাকি সময় তো পড়া। জেদ ধরে পড়া। প্রথম হতে হবে। দশজনের একজন হতে হবে। ১৬ মে পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদ বোর্ডের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা গেল– স্বপ্ন সাফল্য হয়ে ধরা দিয়েছে। সারা রাজ্যে হাই মাদ্রাসার মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় সম্ভাব্য দ্বিতীয় হয়েছে আল আমীন অ্যাকাডেমি বাঁকুড়ার ছাত্র আবু দাউদ পাখিরা। একই ক্যাম্পাস থেকে যুগ্মভাবে দ্বিতীয় মুহাম্মদ হাসমত আলি শাহ। প্রাথমিকভাবে পাওয়া খবর অনুযায়ী দু’জনেরই প্রাপ্ত নম্বর ৭৫৭ (৯৪.৬৩ শতাংশ)। তারা পরীক্ষায় বসেছিল বাঁকুড়া সম্মিলনী হাই মাদ্রাসা থেকে।

রাজ্যে হাই মাদ্রাসা পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থানাধিকারী দাউদের বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের ভোগপুর গ্রামে। আর্থিক প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়েই তার বেড়ে ওঠা। বাবা লোকমান পাখিরা কৃষিকাজ করেন। মা গোলেনুর বিবি গৃহবধূ। বাকি চার ভাইয়ের কেউই তেমন একটা লেখাপড়া করতে পারেননি, সুযোগ পাননি বলা যায়। তবে দাউদের মেধা দেখে গ্রামের স্কুলের শিক্ষকরা পরামর্শ দেন কোনও ভালো স্কুলে ভর্তি করে দেওয়ার জন্য। তারা এই সময় এম নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে আল আমীন মিশনের নাম শোনে। গ্রামের বেশ কয়েকজন এর আগে সেখানে ভর্তি হয়ে ভালো ফলও করেছে। অতএব লোকমান ছেলেকে ভর্তি করে দেন বাঁকুড়ার এই আল আমীনের শাখা স্কুলে। জীবনের গতিপথ পালটে যায় আবু দাউদের। চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে ক্লাস সিক্সে সে ভর্তি হয় এখানে। প্রথমে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হলেও পরে নতুন বন্ধুদের সঙ্গে ভালোই সময় কেটেছে বলে জানাচ্ছে আবু দাউদ। তার কথায়, আমার এই সাফল্যের পিছনে আব্বার অবদান অনেক। আর শিক্ষকরাও খুব সাহায্য করেছে। সহপাঠীদের সঙ্গে গ্রুপ ডিসকাশন খুব কাজে লেগেছে।
একই কথা শোনা গেল যুগ্মভাবে দ্বিতীয় আল আমীনের আরেক পড়ুয়া মুহাম্মদ হাসমত আলি শাহের কাছ থেকে। সেও জানাল, আমরা দু’জন (হাসমত ও আবু দাউদ) একই ঘরে থাকতাম। একসঙ্গে বসে ইংরেজি পড়তাম, অংক করতাম। এতে বেশ সুবিধা হত।
আবু দাউদের মতো হাসমত আলিও উঠে এসেছে দরিদ্র পরিবার থেকে। বাবা ইয়াসিন শাহ একটি মসজিদের ইমামতি করেন। স্বল্প বেতন। তবু ছেলের পড়াশোনার পিছনে কোনও কার্পণ্য করেননি। ক্লাস সেভেনে আল আমীন অ্যাকাডেমি বাঁকুড়ায় ভর্তি হয় সে।
নিজের সাফল্য নিয়ে অবশ্য খুব একটা উত্তেজিত নয় হাসমত। তার মতে, মোটামুটি ভালো লেগেছে। এ তো সবে শুরু। আরও অনেক পথ পেরোতে হবে। আমি অত সিরিয়াসলি পড়িনি। তবে জানতাম ভালো ফল করব। এমনই আত্মবিশ্বাসের সুর শোনা গেল বর্ধমানের আউসগ্রামের হাসমতের কাছ থেকে। অবসর সময়ে ক্রিকেট খেলতে ভালোবাসে সে। পছন্দের ক্রিকেটার মহেন্দ্র সিং ধোনি। অপরদিকে, তার সঙ্গে যুগ্ম দ্বিতীয় আবু দাউদের অবসর কাটে গান শুনে, বই পড়ে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটগল্পের ভক্ত কোলাঘাটের আবু দাউদ পাখিরা।
দু’জন একই ঘর থেকে পড়াশোনা করে মাধ্যমিকে দ্বিতীয়। মিলও রয়েছে তাদের মধ্যে। দাউদ ও হাসমত দু’জনেরই প্রিয় বিষয় জীববিজ্ঞান। আবার দু’জনেই পরবর্তী জীবনে ডাক্তার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চায়। আর এই পথ পাড়ি দিতে হলে আরও পরিশ্রম করতে হবে তাদের, এমনই প্রতিজ্ঞার ছবি দু’জনের চোখেমুখে।

বর্তমানে আবু দাউদ উলুবেড়িয়া আল আমীন অ্যাকাডেমিতে বিজ্ঞান বিভাগে একাদশ শ্রেণিতে পড়ছে। অন্যদিকে হাসমত আলি গলসী আল আমীনে পড়ছে। দু’জনেই সংগ্রাম করে দারিদ্রতাকে হারিয়ে এই সাফল্য ছিনিয়ে এনেছে। আবু দাউদের পরিবারে সে-ই প্রথম মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরলো।
পরিবারের পাশাপশি আল আমীন মিশনকে এই সাফল্যের সিংহভাগ কৃতিত্ব দিতে চাইছেন দুই কৃতীই। শিক্ষকদের সাহায্য তো ছিলই, পাশাপাশি মিশন কর্তৃপক্ষ যদি তাদের পড়ার খরচের ব্যাপারে সাহায্য না করত তবে এই সাফল্য অধরা থেকে যেত বলে দুই পড়ুয়ার মত। এ জন্য তারা ধন্যবাদ জানিয়েছে আল আমীনের প্রাণপুরুষ এম নুরুল ইসলামকে। তিনিও আল আমীনের পড়ুয়াদের এই সাফল্যে খুশি হয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ছাত্র-শিক্ষকদের। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এবার আল আমীনের ৯ জন পড়ুয়া হাই মাদ্রাসা পরীক্ষায় বসেছিল। সবাই আশি শতাংশের বেশি নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। ৭৪৯ নম্বর পেয়ে রাজ্যে সম্ভাব্য সপ্তম হয়েছে বাঁকুড়া শাখারই সারতাজ আলি লস্কর। তার বাড়ি হাওড়া।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only