শুক্রবার, ১৭ মে, ২০১৯

জাতীয় নির্বাচন কমিশনের আচরণ গণতন্ত্রের জন্য লজ্জাজনক

আহমদ হাসান ইমরান
২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের পর পর ছ’দফা পর্যন্ত দেখে মনে হচ্ছিল, ভারতের নির্বাচন কমিশন যেন কোমায় আচ্ছন্ন রয়েছে। যতই তাদের কাছে বিরোধী দলগুলি প্রমাণপত্রসহ অভিযোগ করুক না কেন– কমিশনের তেমন কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। নরেন্দ্র মোদি– অমিত শাহ ও আদিত্যনাথ যোগী এবং প্রজ্ঞা সিং ঠাকুররা একের পর এক আচরণ সংহিতা ভঙ্গ করলেও  কমিশন উচ্চবাচ্য না করার পথকেই বেছে নেয়। শেষপর্যন্ত দেশের শীর্ষ আদালতের বিচারপতিদেরও এতে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
তবে নির্বাচন কমিশন একেবারেই যে শাসকদলের বিরুদ্ধে কিছু করেনি– তা নয়। গুজরাতের বিজেপি-প্রধানের বিরুদ্ধে কমিশন এক নির্দেশিকা জারি করে বলে যে– তিনি ৭২ ঘণ্টা বা তিনদিন নির্বাচনী প্রচারে কোনওরকম অংশ নিতে পারবেন না। কারণ– নির্বাচনী বিধি উল্লঙ্ঘন করেছেন রাজ্যের বিজেপি-প্রধান। অনেকেই বলতে থাকেন– যাক– কমিশন বোধহয় আচ্ছন্ন ভাব থেকে খানিকটা হলেও বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু হা হতোস্মি! পরে দেখা যায়– যে তিনদিন বিজেপি-প্রধান ভোটপ্রচার করতে পারবেন না বলে কমিশন যে নির্দেশ দিয়েছে– তার প্রায় ৭ দিন আগেই গুজরাতে নির্বাচন শেষ হয়ে গেছে।
কমিশনের শাসক সুহ*দ চেহারা একেবারে সামনে এসে যায় যূন দেখা গেল– নজিরবিহীনভাবে কমিশন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারের সময়সীমা নির্দিষ্ট সময়ের একদিন আগেই বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ জারি করে। কিন্তু শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নয়– ওমর আবদুল্লাহ– মায়াবতী থেকে শুরু করে বিরোধী দলগুলির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ নেতা কমিশনের এই আচরণের তীব্র নিন্দা করেছেন। তাঁরা বলেছেন– কমিশন যেভাবে ইতিহাসে এই প্রথমবার ৩২৪ ধারা প্রয়োগ করল– তা লজ্জাজনক এবং নগ্নভাবে পক্ষপাতমূলক। আর দেখা গেছে কমিশন ভোটপ্রচার বন্ধ করার যে সময়সীমা ধার্য করেছে– তাতে বিজেপির বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবাংলায় তাঁর দু’টো সভাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে পারবেন। আর মুশকিলে পড়বে তৃণমূল কংগ্রেস ও অন্য দলগুলি। এর থেকে বেশি পক্ষপাত আর কী হতে পারে? এই প্রথম ভারতবর্ষের ইতিহাসে নির্বাচনী প্রচারের উপর এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হল। বোঝা যাচ্ছে– বিজেপির পক্ষে কমিশন নিজের স্ব-আরোপিত কোমা থেকে বেরিয়ে এসেছে। সকলে বলছেন– না-না প্রাণ আছে– এখনও প্রাণ আছে!
এই পরিস্থিতিতে বাংলার তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাখঢাক না রেখেই সরাসরি বলেছেন, স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে– যদি সহিংসতা হতে পারে এই আতঙ্কে কমিশন নির্বাচনী প্রচার দু’দিন আগে বন্ধ করে দিল– তা হলে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা এবং অমিত শাহের র্যালিতে সহিংসতার পর পরই কেন নির্বাচনী প্রচার বন্ধ করার ঘোষণা হল না? কলকাতার মুসলিমপ্রধান এলাকা কলাবাগান দিয়ে যাওয়ার সময় পরিষ্কার দেখা গেছে, ভিনপ্রদেশ থেকে আনা বহিরাগত মারমুখী যুবকরা শুধু মুসলিম বিদ্বেষী স্লোগান নয়– ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে প্ররোচক ও অশ্লীল নানা আওয়াজ তুলে মুসলিমদের স্থানীয় মুসলিমদের ক্ষেপিয়ে তোলার সবরকম প্রচেষ্টা করেছিল। রমযানের সময় মুসলমানরা সবর করায় কোনও দাঙ্গা বাধেনি। কিন্তু পরিকল্পনা যে ছিল– তা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এইসব খবর নিশ্চয় নির্বাচন কমিশন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে গিয়েছিল। তা হলে কেন আরও দু’দিন প্রচারের জন্য ছাড় দেওয়া হল? তবে কি কমিশন চাইছিল যে– নরেন্দ্রবাবুর প্রচার শেষ হওয়ার পরই তারা এই নিষেধাজ্ঞা জারি করবে? অমিত শাহেরর্ যালির পর যদি রাজ্য প্রশাসন দু’দিন শান্তি বজায় রাূতে পারে– তাহলে তৃতীয় ও চতুর্থ দিন এমন কী ঘটতে পারত– যা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পুলিশ-প্রশাসনের ছিল না?
আর যে পদ্ধতিতে হঠাৎ শেষ মুহূর্তে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব এবং একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারকে সরিয়ে দেওয়া হয়– তাতেও বোঝা যায় ছ’দফা তাদের উপর আস্থা রাূার পর এমন কী ঘটল– ক্ষেপে গিয়ে নির্বাচন কমিশনকে এই ধরনের ব্যবস্থা নিতে হল?
নাকি আসল রহস্য হল– বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙায় বুদ্ধিজীবী– অ-বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতি নিরপেক্ষভাবে পশ্চিমবাংলার মানুষ যেভাবে গর্জে উঠেছিল তা যেন রাজনৈতিক প্রচারে উঠে না আসে– তার জন্যই নির্বাচন কমিশনের প্রচার বন্ধ করার এই সিদ্ধান্ত? পরের দিন প্রথমে বিভিন্ন দল ও বুদ্ধিজীবীদের এবং সন্ধ্যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার বিরুদ্ধে এক সুবিশালর্ যালিতে সাধারণ মানুষ– আবাল-বৃদ্ধ-জনতা যেভাবে রাস্তায় নেমে এসে শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ জানায়– তাতেই কি নির্বাচন কমিশন ভয় পেয়ে গিয়েছিল? বাংলায় এই প্রতিবাদ যাতে আর না প্রসারিত হতে পারে– তার জন্যই মোদিকে সভা শেষ করতে দিয়ে জারি হল চেঙ্গিজি নিষেধাজ্ঞা? সুধী পাঠক নিজেই সিদ্ধান্ত নিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only