বুধবার, ২২ মে, ২০১৯

কীভাবে বিভাজনের ফাঁদে জড়ানো হচ্ছে আমাদের?


আহমদ হাসান ইমরান
ফেক নিউজ এবং সাম্প্রদায়িক বানোয়াট রটনা শুধু নির্বাচনের আগে নয়– অন্য সময়েও চার-পাঁচ বছর ধরে রমরমিয়ে চলছে। এক সম্প্রদায় সম্পর্কে অন্য সম্প্রদায়ের মনকে বিষিয়ে দিতে কিংবা অলীক ধারণা প্রচারের মাধ্যমে আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলার শয়তানি প্রচেষ্টা যে অনেকটাই সফল তা বলার অপেক্ষা রাূে না। সমাজের সচেতন অংশ এই ফেক নিউজের নাগপাশে পড়ে প্রভাবিত হচ্ছে। যারা এই বাংলার সামগ্রিক সমাজে ভারসাম্য রক্ষা করতেন– তারাও এূন হয় চুপ করে যাচ্ছেন নয়তো এই প্রচারণাতেই বিশ্বাস করছেন। এই প্রচারণার বিরুদ্ধে পুলিশ কয়েকটি ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিয়েছে এ কথা সত্য। কিন্তু যে হারে সোশ্যাল মিডিয়া– লিফলেট এবং মানুষের মুূের কথার মাধ্যমে অপপ্রচারের সয়লাব চলছে তা নিয়ন্ত্রণ করা শুধুমাত্র পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়। 
গত শনিবার আমার এক পরিচিত যুবক হাওড়ার ডোমজুড়ের পোশাক শিল্প এলাকা থেকে আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা পাঠায়– যা অনেকটা আর্তনাদের মতো। সমাজ সচেতন ও হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতি প্রচারে সক্রিয় ওই যুবক আমাকে জিজ্ঞেস করেন– শ্রদ্ধেয়া এক হিন্দু প্রধানশিক্ষিকার কাছ থেকে তার স্ত্রী একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পেয়েছেন। তাতে সবার মঙ্গল কামনাকারী ওই প্রধানশিক্ষিকা একটি ভিডিয়ো ও প্রচারপত্র পাঠিয়ে আক্ষেপ করে লিূেছেন– ‘আমি কোনও গ্র&পে বার্তাটি না ছড়িয়ে তোমাকে পাঠালাম। তোমার বরকে দেূিও। মসজিদগুলো কি সুশিক্ষা দিতে পারে না? আমরা আমাদের স্কুলে এতগুলো মুসলিম মেয়েকে নিজেদের সন্তানের থেকেও বেশি আদর-যb করে পড়াই। তাদের যদি মসজিদে বলে আমাদের মারতে– তারা কি সঙ্গে সঙ্গে হাতে লাঠি তুলে নেবে?’
সঙ্গে প্রেরিত ভিডিয়োতে দেূা যাচ্ছে– একটি রাস্তার সামনে দাড়ি-টুপি পরিহিত জোব্বা ও লুঙ্গি বা পায়জামা পরা প্রচুর মুসলমান লাঠি হাতে একটি রাস্তা দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। তারা রাস্তার পাশে দু-একটা বাড়িতে ঘা দিয়ে এগিয়ে চলেছে। ওই শিক্ষিকা একটি লিফলেটও ওই হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় সংযুক্ত করেছেন। তাতে বোল্ড অক্ষরে লেূা রয়েছে– ‘ডায়মন্ড হারবারে মুসলিমদের আক্রমণে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে হিন্দুরা... মসজিদে ঘোষণা করে দফায় দফায় আক্রমণ হিন্দুদের উপর... হিন্দুদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর... ডায়মন্ড হারবারের সাতগেছিয়া জুড়ে চলছে ভয়ঙ্কর হিন্দু নিধনযজ্ঞ।’
আরও লেূা হয়েছে– ‘তৃণমূল নেতা আজান শার নেতৃত্বে প্রায় ২০০ উপর জেহাদিকে নিয়ে বগাূালীতে হিন্দুদের উপর আক্রমণ করা হয়– পুরো বাজার ভাঙচুর– বোমা মারা– তরোয়াল নিয়ে তেড়ে আসা– কিছুই বাদ যায়নি– মসজিদের মাইক থেকে ঘোষনা করা হয়– সব হিন্দুদেরকে মারবি– কাউকে ঘর থেকে বেরোতে দিবি না। মূলত টার্গেট করে ৪টি হিন্দু দোকান ভাঙা ও লুটপাটও করা হয়।’
লিফলেটটিতে আরও প্রশ্ন করা হয়েছে– ‘তৃণমূলের হিন্দু সমর্থকদের জন্য একরাশ ধিক্কার। নিজেদের পরিবারের সুরক্ষার কথাটা ভাবুন অন্তত!’
বেশ বোঝা যায়– ওই প্রধানশিক্ষিকা দুঃূভরা ঘৃণা ছড়ানো লিফলেট ও ভিডিয়োটি দেূে মানসিকভাবে তীব্র আগাত পেয়েছেন এবং ওই ফেক নিউজকে সত্য বলে মনে করেছেন। তিনি ‘ভিডিয়ো প্রমাণ’ দেূে বিশ্বাস করে নিয়েছেন– ওই অকুস্থলটি আমাদের ঘরের কাছে ডায়মন্ড হারবারে। কিন্তু এর এর সত্যতা যাচাইয়ের কোনও চেষ্টা তিনি করেননি। কি জানি আমি নিজেও হয়তো ওই শ্রদ্ধেয়া শিক্ষিকার মতো একই কাজ করতাম। তবুও ভালো– তাঁর স্নেহধন্যা একজন মুসলিম তরুণীকে ূবরটি দিয়ে বলেছেন– তোমাদের মসজিদের ইমামসাহেবরা কেন এই ধরনের অমানবিক কাজ করছেন? স্বভাবতই তিনি চান হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে আবার প্রীতির সম্পর্ক ফিরে আসুক।
তবে– ভিডিয়োটি একটু ূতিয়ে দেূলে বোঝা যাবে ওই ভিডিয়োটি কোনও গ্রামের নয় বরং কোনও শহরে তোলা। আর পোশাক-আশাক দেূে স্পষ্ট বোঝা যায় সম্ভবত এটি বাংলাদেশের কোনও জায়গায় উত্তেজনার সময় গৃহীত।  এতে– কোনও হিন্দু ব্যক্তি বা মন্দিরের ভিডিয়ো নেই। লাঠি হাতে ওই লোকগুলি দৌড়ে চলেছে। কোনও দোকান ভাঙচুরেরও দৃশ্য নেই। এই ভিডিয়োটিকে বলা হচ্ছে ডায়মন্ড হারবারের কোনও গ্রামে আক্রমণের ছবি! আর তৃণমূল নেতার নামটিও জব্বর! আজান শা! এই নামে কোনও তৃণমূল নেতা আছে কিনা পুলিশ ও প্রশাসনের উচিত তা ূুঁজে বের করা। ভিডিয়োটিতে শোন গেছে– এই উত্তেজনার আসল কারণ। ভিডিয়োটিতে একজন বলছেন– ট‘াকা পয়সা নিয়ে গোলমাল লেগেছে। তাই এই আক্রমণ চেষ্টা।’ এটা যে হিন্দুদের উপর আক্রমণ নয়– বরং বাংলাদেশ কিংবা অন্য জায়গার মুসলমানদের মধ্যেই দ্বন্দ্বের ফলাফল তা কে বোঝাবে? কারণ– প্রমাণ হিসেবে উত্তেজক লিফলেট এবং ততধিক প্ররোচনাকারী ভিডিয়ো দৃশ্য। ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন! 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only