বৃহস্পতিবার, ৩০ মে, ২০১৯

বাংলাকে গুজরাত করতে দেব না, নৈহাটিতে মমতা

ছবি সন্দীপ সাহা
 বিজেপির সন্ত্রাস রুখতে তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার ছাত্র-যুবদের নিয়ে ‘জয়হিন্দ বাহিনী’ এবং মহিলাদের নিয়ে ‘বঙ্গ জননী কমিটি’ গড়ে তোলার কথা ঘোষণা করলেন। বৃহস্পতিবার ব্যারাকপুর মহকুমার নৈহাটি পুরসভার সামনে তৃণমূল কংগ্রেস আয়োজিত সত্যাগ্রহ মঞ্চ থেকে মমতা এই ঘোষণা করে বলেন– শুধু এই মহকুমার ভাটপাড়া– নৈহাটি– বীজপুর– কাঁচরাপাড়াতেই নয় রাজ্যের প্রতিটি ব্লকেই বিজেপির সন্ত্রাস মোকাবিলায় ছাত্র-যুবও মহিলাদের নিয়ে জয়হিন্দ বাহিনী এবং বঙ্গজননী কমিটি তৈরি করা হবে। এই বাহিনী ও কমিটির সদস্যদের নিজস্ব ড্রেস কোড থাকবে। সঙ্গে থাকবে পরিচয়পত্র। ব্যারাকপুর মহকুমা থেকে শুরু হবে জয়হিন্দ বাহিনী ও বঙ্গজননী কমিটির কাজ। কোথাও হামলা বা গণ্ডোগোল করতে গেলেই ছাত্র যুবদের জয়হিন্দ বাহিনী এবং মেয়েদের বঙ্গ জননী কমিটি হামলাকারীদের তাড়া করবে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায় ওরা আরএসএস করলে আমি জয়হিন্দ বাহিনী করব। ঘরছাড়াদের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী বলেন– ঘরছাড়ারা যে যার বাড়ি ফিরে যাবেন– ভয় পাবেন না। কিসের জন্য এত ভয়? সবাইকে বলব– বুঝে চলুন– মাথা খাটিয়ে চলুন। বিজেপির টাকায় নিজেদের মান-ইজ্জত খোয়াবেন না।
 নির্বাচনের সময়  এবং পরবর্তী পর্যায়ে গত কয়েকসপ্তাহ ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে ব্যারাকপুর মহকুমার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে চলছে সন্ত্রাস। গুলি– বোমার আওয়াজে সাধারণ মানুষের মনে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। অশান্তি এখানেই থেমে নেই কাঁকিনাড়া– ভাটপাড়া অঞ্চলে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীর জয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেস বহু কর্মীর ওপর হামলা এবং মারধরের ঘটনায় প্রায় ৭০০ পরিবার এলাকা ছাড়া। তৃণমূল কংগ্রেসের বহুকর্মীর বাড়ি ঘর ভাঙা হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে তৃণমূল সমর্থিত ব্যবসায়ীদের দোকান বাজারও। এলাকার বহু তৃণমূল সমর্থক এলাকা ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন অন্যত্র। বিজেপির লাগাতার সন্ত্রাসের প্রতিবাদে এদিন মুখ্যমন্ত্রী নৈহাটি যান। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম– খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক– নৈহাটির বিধায়ক পার্থ ভৌমিক প্রমুখ। বিজেপির ভয়াবহ সন্ত্রাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে এদিন সত্যাগ্রহ মঞ্চে কান্নায় ভেঙে পড়েন পার্থ ভৌমিক এবং নৈহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান অশোক চট্টোপাধ্যায়। পুরভবনের সামনে সত্যাগ্রহ মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তৃণমূল নেত্রী বিজেপির মাত্রা ছাড়া সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন। এই মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাষায় জানিয়েদেন– পশ্চিমবাংলাকে কোনওমতেই গুজরাট করতে দেব না। বাংলা বাংলাই থাকবে। কোনওরকম সন্ত্রাসগুন্ডামি বরদাস্ত করা হবে না। বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভপ্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী এদিন সত্যাগ্রহ মঞ্চস্থলে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন– ধন্যবাদ দিয়ে আপানাদের ছোট করব না। আপনারা অনেক অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। বিজেপির টাকা নিয়ে কিছু গুন্ডা মাথায় ফেট্টি বেঁধে অত্যাচার চালাচ্ছে। এই অত্যাচারের সঙ্গে যুক্ত আছে কিছু গদ্দারও। এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন আমি বিজেপির মতো পার্টিকে ঘৃণা করি। 
বিজেপির সন্ত্রাসের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন– সব হিন্দিভাষী মানুষ খারাপ– আমি এটা বিশ্বাস করি না। দীর্ঘদিন ধরে বহু হিন্দিভাষী মানুষ এইসব অঞ্চলে বসবাস করছেন। তিনি বলেন– আমি বাঙালী-অবাঙালী করি না– আমি হিন্দু মুসলমানও করি না। আমি বাংলার সংস্টৃñতিতে বিশ্বাস করি। এখানে বিজেপি বাঙালী-অবাঙালীদের মধ্যে বিভাজন করার চেষ্টা করছে। বাঙালী অবাঙালীদের মধ্যে দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। আমি এসব হতে দেব না। আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব। বাংলার সংস্টৃñতির প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন– বাইরে থেকে কেউ এখানে অন্য সংস্টৃñতি হাজির করবে– তা হবে না। আমি জয় হিন্দ হাজার বলব। জনতার উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী বলেন– ফোনে কারওর সঙ্গে কথা বা কারওর সঙ্গে দেখা হলে আপনারও বলবেন জয়হিন্দ– জয়বাংলা। ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী দীনেশ ত্রিবেদীর পরাজয়ের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন– এই আসন আমি ফের উদ্ধার করব। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন– দিনেশ ত্রিবেদী সামান্য ভোটে হেরেছেন। বিজেপি টাকা ছড়িয়ে–রিগিং করে নির্বাচনে জিতেছে। নির্বাচনের সময় বিজেপির হামলা ও সন্ত্রাস নিয়ে একাধিক অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের কাছে করা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোনও পদক্ষেপই নেয়নি। ভোটে জিতেই এখানকার বিজেপির গুণ্ডারা ভাবছে এই অঞ্চলটা মুক্তাঞ্চল হয়ে গেছে। ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী এদিন আরও বলেন– আমরা এখানে মোদি বা বিজেপির দয়ায় নেই। আমি খুব ভয়ঙ্কর। আমাকে আঘাত করলে আমি প্রত্যাঘাত করি।
বিজেপির সন্ত্রাস প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন– বুধবার এই অঞ্চলের ঘরছাড়াদের অনেকেই আমার সঙ্গে কথা বলতে নবান্নে এসেছিল। তাঁদের কাছ থেকে শুনলাম বাঙালী মেয়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে হামলাকারীরা। সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার করেছে গোপাল নামে একজন। সে নাকি সেবাদল করে। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন এরা কারা? অর্জুন সিংয়ের নাম উল্লেখ না করে মমতা বলেন– একটা সিটে জিতে এলাকায় সন্ত্রাসের কারখানা করেছে গদ্দার। পুলিশের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী এদিন হুঁশিয়ারী দিয়ে বলেন– এলাকায় যত আগ্নেয়াস্ত্র– বোমা আছে সব উদ্ধার করতে হবে। এলাকায় যেন কোনওরকম হামলা– সন্ত্রাসের ঘটনা যেন না ঘটে। আমি এখান থেকে চলে যাওয়ার পর ফের যদি কোনও ঘটনা ঘটে আমি ডিজির কাছ থেকে বুঝে নেব। তিনি আরও বলেন– নির্বাচনের সময় থেকেই হামলা– সহ নানা ঘটনা চারশো এফআইআর করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ কিছু ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশ তখন কাজ করেছে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে। এদিন পুলিশেরউদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রীর আরও স্পষ্ট নির্দেশ প্রতিটি নির্দিষ্ট ঘটনার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিন। দুÜৃñতীদের কোনও মতেই ছাড়া হবে না। যত বড়ই নেতা হোক না কেন আমি এলাকায় একটা বোমা ও হামলা বরদাস্ত করব না।
নির্বাচন পর্ব থেকে শুরু করে ফল ঘোষণার পর লাগাতার হামলার ঘটনায় ব্যারাকপুর মহকুমার বিভিন্ন অঞ্চলে যাদের ঘরবাড়ি ভাঙা হয়েছে– দোকানপাঠ ক্ষতিগ্রস্থ করা হয়েছে– নাম ঠিকানা উল্লেখ করে ক্ষতিগ্রস্তদের তিন দিনের মধ্যে তালিকা তৈরি করে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন– ক্ষতিগ্রস্তদের যাতে সরকার থেকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা যায়। সত্যাগ্রহ মঞ্চে ভাষণ শেষ করার আগে মুখ্যমন্ত্রী এদিন স্থানীয় মানুষদের উদ্দেশ্যে জানিয়ে যান ফের ১৪ই জুন তিনি ব্যারাকপুর মহকুমায় আসবেন। তিনি আরও বলেন– এবার থেকে তিনি নিয়মিত ব্যারাকপুর– ভাটপাড়া– নৈহাটি– কাঁচড়াপাড়ায় ঢু মারবেন।      

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only