সোমবার, ৬ মে, ২০১৯

পুরনো বইঘর আর ইতিহাস নিয়ে তাঁর সংসার

’’ইতিহাসের বিস্মৃতপ্রায় অথচ উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বদের নতুন আঙ্গিকে চর্চা করতেই কলম তুলে নেওয়া’’


উনিশ ও বিশ শতকের মহিয়সী মুসলিম নারী, সোহরাওয়ার্দী পরিবার কিংবা, চর্চার আড়ালে থাকা মুসলিম সমাজের ‘বিদ্যাসাগর’-এর কথা উঠে এসেছে তাঁর কলমে। বহরমপুরের নিজ বাড়ির লাইব্রেরিতে দুষ্প্রাপ্য বই ও পত্র-পত্রিকার সংগ্রহ ঈর্ষণীয়। এ হেন গবেষক, প্রাবন্ধিক আলিমুজ্জমানের সঙ্গে আলাপচারিতায় গোলাম রাশিদ


পুরনো বই সংগ্রহ করা তাঁর কাছে নেশার মতন। সেই নেশার বদৌলতে আজ বইঘরে শোভা পাচ্ছে মোহাম্মদি, দৈনিক আজাদ, সওগাতের মতো পুরনো বহু পত্রিকা। সংগ্রহে রয়েছে নানা গবেষণাপত্র, পুরনো নথি । পুরনোর বইয়ের মাঝে নিজেকে অবিরাম খুঁজে চলেন তিনি, আলিমুজ্জমান।
বহরমপুরের চালতিয়ায় থাকেন। ঘুরে বেড়ান গঙ্গার ঘাটে, ব্যারাক স্কোয়ারের ময়দানে। হেঁটে যান কোর্টের পাশের রাস্তা দিয়ে। মাথায় থাকে আত্মাণ্বেষণের ভাবনা। কী খুঁজে চলেন তিনি? পুরনো ইতিহাস। যা হারিয়ে যায়নি, সুপ্ত অবস্থায় লুপ্ত হতে চলেছে, অথচ যার গুরুত্ব অপরিসীম, তাকেই খুঁজে চলেন তিনি। তাঁর কথায়, বিশ শতক ও উনবিংশ শতকের মুসলিম নারীদের নিয়ে আলোচনা উঠলেই ভাষ্য চলে আসে যে সে সময় মুসলিম নারীরা খুব পিছিয়ে ছিলেন। এটা যেমন সত্যি কথা, তবে অতি বাস্তবও রয়েছে। সেই সময়েও বেশকিছু মুসলিম মহিলা শিক্ষা আন্দোলনে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন। তাঁদেরকে খুঁজে বের করাও আলিমুজ্জমানের লক্ষ্য।

খুজিস্তা আখতার বানু, তাঁর ছেলে শহিদ সোহরাওয়ার্দী কিংবা সোহরাওয়ার্দীর মামা স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীকে এই প্রজন্মের ক’জন চেনে? এই দুই সোহরাওয়ার্দীকে আবার অনেকে এক করে ফেলেন। স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরপর দু’বার উপাচার্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর সম্পর্কে আমাদের বৌদ্ধিক মহলে খুব কম আলোচনা হয় কিংবা, হয় না বললেই চলে। এদেরকে আমি আবার চর্চাক্ষেত্রের মধ্যে আনতে চাই, জানাচ্ছেন ইতিহাসের একনিষ্ঠ গবেষক আলিমুজ্জমান।

তিনি বললেন নতুন একজন ব্যক্তিত্বের কথা যাঁকে অনেকেই চেনেন না। তিনি স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর পিতা---ওবাইদুল্লাহ আল ওবাইদি সোহরাওয়ার্দী(১৮৩২-১৮৮৫)। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মাতামহ। তাঁকে বলা হত ‘বাহারুল উলুম’ বা বিদ্যাসাগর। ‘‘বিদ্যাসাগর যে শুধু হিন্দু সমাজে জন্মেছিলেন তা নয়। ওবাইদুল্লাহ আল ওবাইদি সোহরাওয়ার্দীকে বলা হত ‘বাহারুল উলুম’ বা বিদ্যাসাগর । তাঁর সম্পর্কে ছাড়া ছাড়া কিছু জায়গায় পড়েছি, এবার তাঁর উপর আরও বিস্তূত কাজ করব ভেবেছি, পড়াশোনা চলছে। ওবাইদুল্লাহর ছাত্র ছিলেন মহাকবি কায়কোবাদ। আশ্চর্যজনকভাবে দুই বিদ্যাসাগরেরই জন্ম মেদিনীপুরে।’’ এমনকি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ওবাইদুল্লাহকে চিনতেনও বলে জানাচ্ছেন আলিমুজ্জমান।

শহিদ সোহরাওয়ার্দীকে নিয়েও তিনি নিরপেক্ষ ইতিহাস লিখেছেন লিটল ম্যাগাজিন ‘সহমত’-এর জানুয়ারি– ২০১৯ সংখ্যায়। তাঁর মতে, এই ব্যক্তিটির নাম উঠলেই সবাই দেশভাগ– ছেচল্লিশের দাঙ্গা–ক্যালকাটা কিলিংয়ের ধুয়ো তুলে সবাই তেড়ে যায়। অথচ এই মানুষটি গান্ধিজিকে সঙ্গে করে মানষের দোরে দোরে ঘুরে দাঙ্গা থামিয়েছেন। দেশভাগের পরেও অনেকদিন এ দেশে থেকে গিয়েছিলেন। শান্তি মিশনের কাজ করতেন। গান্ধিজির মৃতু্য হলে তাঁকে এক রকম জোরপূর্বক এ দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়। বাংলাকে তাঁর মতো কোনও রাজনীতিবিদ সে সময় ভালোবেসেছিল কি না সন্দেহ রয়েছে। সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে তাঁর মু?তার কথা অকপটে জানান আলিমুজ্জামান। বললেন, অবাঙালিরা তাঁকে গুরুত্ব দিতে চাইত না। কারণ সোহরাওয়ার্দী বাঙালি জাতিসত্তার উপর খুব গুরুত্ব দিতেন। তিনি এই উপমহাদেশের ভূখণ্ডে তাঁর সাধের বাংলাদেশ দেখে যেতে পারেননি---এ কথা সত্য– কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না---এর বীজ রোপণ একান্ত তাঁরই হাতে– স্বগতোক্তি করেন আলিমুজ্জমান।

আপাতভাবে মৃদুভাষী হলেও প্রয়োজনে স্পষ্ট উচ্চারণ শোনা যায় তাঁর মুখ থেকে। উজ্জ্বল চোখের তারায় খেলা করে ইতিহাস---উনিশ ও বিশ শতকের মুসলিম নারীদের বিজয় গৌরব তিনি নতুন করে লিখতে চান। যেমন, ওবাইদুল্লাহ্ সোহরাওয়ার্দীর কন্যা খুজিস্তা আখতার বানু (শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মা) ছিলেন সেই সময়ে একমাত্র সিনিয়র কেমব্রিজ পাশ নারী ব্যক্তিত্ব। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দুভাষার এমএ পরীক্ষক ছিলেন তিনি। ‘নবাবের দেশ’ মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা জানালেন, খুজিস্তা আখতার বানু ছিলেন একজন সংস্কারহীন পর্দানশীন মহিলা। স্ত্রী শিক্ষা প্রচলন ও প্রসারের জন্য তাঁর চেষ্টা উল্লেখের দাবি রাখে। এমন সব মহিলাদের নিয়ে একটি বইও করবেন বলে জানালেন কথায় কথায়। এই সময়ের মুসলিম মেয়েদের মধ্যে অবরোধ প্রথার কথা বল হয়। তাঁর মতে, ওরকম প্রথা হিন্দু সমাজেও ছিল। বিদ্যাসাগর কিংবা রবীন্দ্রনাথ বাড়ির মেয়েদের বাল্য বিবাহ দিয়েছেন।

দীর্ঘদিন উদয়চাঁদপুর হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন আলিমুজ্জমান। সামলাতে হয়েছে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদও। তাই সেই সময়ে কাজের চাপে তেমন ভাবে লেখালেখি করে উঠতে পারেননি। ৩৬ বছরের শিক্ষক জীবন শেষ করে এখন মন দিতে চাইছেন ইতিহাস-চর্চায়। ১৯৫৩ সালে জন্ম। সপ্তম শ্রেণি থেকেই সাহিত্যচর্চায় হাতেখড়ি। স্কুলে পড়া অবস্থা থেকেই তার রয়েছে বই সংগ্রহ করার বাতিক। বায়োলজি নিয়ে বিএসসি করলেও এমএ করেন বাংলায়। তারপর যখন চাকরি-জীবনে পা দিলেন– সেই সময়েই (১৯৭৫-১৯৮১) ছয় বছর ধরে সম্পাদনা করেন লিটল ম্যাগাজিন ‘প্রবাল’। এখানে গল্প লিখেছেন আবদুর রাকিব। সেই সূত্রে রাকিবের সঙ্গে ভালোরকম বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল আলিমুজ্জমানের, যা অটুট ছিল আবদুর রাকিবের প্রয়াণের আগ পর্যন্ত(১৯৩৯-২০১৮)। অবসর নেবার পর আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইফুল্লার একান্ত উৎসাহে ‘আলিয়া’ পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন আলিমুজ্জমান। সূচনা হয় চর্চার দ্বিতীয় পর্ব।

‘গোরাবাজারে থাকতাম, হয়তো কোনও কাজে খাগড়া যাব। রিকশা না নিয়ে হাঁটতাম। আর রিকশার পয়সা বাঁচিয়ে বই কিনতাম।’ জানাচ্ছেন তিনি। এমন একজন মানুষ যে দুর্লভ বই সংগ্রহ করে বাড়ির আলমারি ভর্তি করবেন তা জানা কথাই। তাই তাঁর পাঠাগারে দেখা যায় ‘বিলায়েতনমা’র বাংলা সংস্করণ। আমরা সাধারণভাবে পড়ে আসি, প্রথম ভারতীয় বিলেতযাত্রী রাজা রামমোহন রায়। কিন্তু তার অনেক আগেই নদিয়ার পাচনুর গ্রামের মির্জা মুহাম্মদ ইহতেশামুদ্দিন ১৭৬৫ (মতান্তরে ১৭৬৬) সালে বিলেত পাড়ি দেন। ফিরে এসে ফারসি ভাষায় রচনা করেন ‘ বিলায়েতনামা’। তারই একখানা বাংলা তরজমার বহু পুরনো কপি রয়েছে আলিমুজ্জমানের সংগ্রহে। তবে লাইব্রেরির সবই যে তাঁর নিজস্ব সংগ্রহ, তা নয়। তিনি এই সংগ্রহ-শিক্ষা পেয়েছেন ছোট নানা হাজি আবদুল বারির কাছ থেকে। তিনিও প্রচুর বই সংগ্রহ করে রাখতেন।

আবদুল আযীয আল আমান সম্পাদিত ‘জাগরণ’-এ আবদুল জব্বারের উপন্যাস ‘ইলিশমারির চর’ প্রকাশিত হয়েছিল– তাও রয়েছে আলিমুজ্জমানের অমূল্য ‘কালেকশনে’। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের লেখা ‘পিঞ্জর সোহাগিনী’ প্রকাশিত হয়েছিল আবদুল আযীয আল আমানের ‘কাফেলা’য়। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘অলীক মানু¡’ ধারাবাহিকভাবে বেরিয়েছিল আবদুর রাউফ সম্পাদিত ‘চতুরঙ্গ’-এ( হুমায়ূন কবীর প্রতিষ্ঠিত) । সেসবই নিজের বইঘরে পরম যত্নে রেখেছেন আলিমুজ্জমান।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only