শনিবার, ২৫ মে, ২০১৯

মোদির বিশাল বিজয় ভারতের বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য বিপদের কারণ:­ দ্য গার্ডিয়ান


২০১৪ সালে যে জনাদেশ নিয়ে দেশের মসনদে বসেছিলেন মোদি– এবার তার বহর আরও বেশি। বিজেপি একাই তিনশোর অধিক আসন দখল করেছে। তাহলে কি ভারত একটি ‘ওয়ান-পার্টি স্টেট’ হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে? ফেক নিউজ ছড়ানো ও মুসলিম-বিদ্বেষী দলটিই কি দেশের জনগণের একমাত্র প্রতিনিধি হয়ে উঠছে? এমনই সব গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’। সম্প্রতি এক সম্পাদকীয় কলামে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে---নরেন্দ্র মোদির এই বিপুল বিজয় ভারত-আত্মার জন্য ক্ষতিকর। বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নির্বাচনে একজন মাত্র ব্যক্তি জয়লাভ করেছেন। তিনি হলেন মোদি। পরপর দু’বার বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও ম্যাজিক ফিগার পেরিয়ে সরকার গড়ছে এবং এর ফলে কার্যত দলটিও মোদিরও নামান্তর হয়ে পড়েছে। দলের চেয়ে মোদির ইমেজকেই ভোটে কাজে লাগানো হয়েছে বেশি। আর এখানে কংগ্রেসের কণ্ঠস্বর মানুষের কানেই পৌঁছায়নি।
গত ৫ বছরে দেশের অর্থনীতির গ্রাফ নিম্নমুখী– জিএসটি– নোটবন্দী নিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। তবুও এমন বিপুল বিজয়! এই জয়কে বিশ্ব ও ভারতের জন্য খারাপ সংবাদ হিসেবে অভিহিত করেছে পত্রিকাটি। বিশ্বে সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদীরা খুব ভয়ংকর। তারা ধীরে ধীরে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। মোদির ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটতে পারে বলে আশংকা এই পত্রিকার। তাই এমন জনপ্রিয় নেতা বিশ্বে আর প্রয়োজন নেই। বিজেপির বিজয়কে ভারতের বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্যও হুমকি-স্বর*প বলে উল্লেখ করেছে ‘দ্য গার্ডিয়ান’। কারণ– দলটি কোনও বিরোধীর অস্তিত্ব স্বীকার করে না। বিরোধী মানেই তারা দেশদ্রোহী– পাকিস্তানপন্থী। বিরোধীদের চাপে রাখা ও জনগণের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদের ঢেউ জিইয়ে রাখার জন্য প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে অশান্তি করতেও পিছপা হন না মোদি বলে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে।
ভারতীয় জনতা পার্টিকে ‘দ্য গার্ডিয়ান’ সরাসরি হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের রাজনৈতিক শাখা বলে উল্লেখ করে দেশকে আরও দুর্ভোগের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এদেরকে দায়ী করেছে। শুধু তাই নয়– এই নারীবিদ্বেষী– মৌলবাদী– স্বৈরতান্ত্রিক দলের সরকার কর্পোরেট গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করে চলে– এমন দাবিও করেছে তারা। আর সর্বোপরি মুসলিম-বিদ্বেষের ব্যাপারটিও তুলে ধরা হয়েছে এখানে। মোদি সরকার যে দেশের প্রায় ২০ কোটি মুসলিমকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করবে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। দেশ অন্ধকারের  দিকে যাবে বলে তাদের মত। মুসলিমদের মাঝে-মধ্যেই ‘উইপোকা’ বলে সম্বোধন করা হয় ভারতে। আর এটা যিনি করেন– তিনি আর কেই নন– মোদির ডান হাত অমিত শাহ। গত ৫ বছরে গরুর মাংস রাখা বা বহন করার সন্দেহে মুসলিমদের নানাভাবে হেনস্থা করা হয়েছে দেশজুড়ে। পিটিয়ে মারা হয়েছে। রাজনৈতিক ভাবেও ভারতের মুসলিমরা অনাথ বলে উল্লেখ করেছে ‘দ্য গার্ডিয়ান’। এখানকার প্রধান দলগুলি মুসলিমদের খোলাখুলি জোরদার সমর্থন করতে পারে না। তা হলে সেটা তোষণ হয়ে দাঁড়াবে এবং সে ক্ষেত্রে সংখ্যাগুরুদের ভোটব্যাঙ্ক খোয়ানোর ভয়ও রয়েছে। সংসদে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বও কম।
এমনসব বহু খামতি থাকা সত্ত্বেও বিজেপির বিজয়ের কারণ কী? সেটা হল মোদির ইমেজ। মোদিকে ভোটপ্রচারক হিসেবে সম্মোহনী ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ভারতের জনগণকে জাতপাত-ধর্মে ভাগ করে তাদের মনপসন্দ কথা বলে থাকেন। তিনি এলিট সমাজের প্রতিনিধিদের সুরক্ষা দেন। আবার বত্তৃ«তার সময় দরিদ্র মানুষের প্রতিভূ হিসেবে নিজেকে বর্ণনা করেন ‘ফকির আদমি– চা-ওয়ালা’ বলে। সাধারণ মানুষ তাঁর এই বিভাজনের রাজনীতি ধরতে পারেননি।
পরিশেষে দুর্বল বিরোধী হিসেবে কংগ্রেসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পত্রিকাটির পরামর্শ–তাদের আরও চিন্তা-ভাবনা করা উচিত কীভাবে তারা বিজেপির সঙ্গে সমান তালে প্রচার করতে পারে– মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে। জাতপাত-ধর্মের রাজনীতি বাদ দিয়ে  সব ধর্মের সব মানুষদের নিয়ে দেশের সর্বাঙ্গীণ উন্নতি হবে কীভাবে– সেটাই কংগ্রেসের দেখা উচিত– সেই পথে এগোনে উচিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only