মঙ্গলবার, ২৮ মে, ২০১৯

টানা ২৪ বছর ধরে ৩৬০ দিন রোযা, ৯৫ বছর বয়সে তরতাজা প্রাণ


দেবশ্রী মজুমদার, বীরভুম, ২৮মেঃ  টানা ২৪ বছর ধরে টানা ৩৬০ দিন রোযা রেখে অসুখ কী জানেন না  মুহাম্মদ মুনকির হোসেন। একইভাবে ৯৫ বছর বয়সে রমযান মাসে  রোযা রেখে চনমনে তরতাজা প্রাণ আব্দুল হাসিব। এদের মধ্যে একজন বিজ্ঞানী। নাম মুহাম্মদ মুনকির হোসেন। আরেকজন অবসরপ্রাপ্ত মোয়াজ্জেন। নাম আব্দুল হাসিব। বয়স ৯৫। দুজনের বাড়ির দূরত্ব অনেক। কিন্তু লক্ষ্য এক। রোযা ও নমাজ আদায়ে জীবনের পরিপূর্ণতা লাভ।
বিজ্ঞানী হিসেবে মুনকির সাহেব দীর্ঘ ১৭ বছর তাইওয়ানের তাইপোর ‘এক্যাডেমিয়া সিনিকা ইন্সটিটিউট অব কেমিস্ট্রিতে, কেমিস্ট্রির ‘ক্যাটালিসিস’ বা অনুঘটক নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর কাছে রোযা মানে জীবনের মৌলিক রসায়ন। তিনি একটানা ২৪ বছর একটানা ৩৬০ দিন রোযা রেখেছেন। এই ষাঠোর্ধ বিজ্ঞানী মনে করেন, সংযমই অধ্যাত্ম চিন্তার মূল কথা। আর যেটা আমাদের রোযা মনে করিয়ে দেয়। আর নমাজ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে মন শুদ্ধি ঘটে। জীবনের সঠিক দিশা পাওয়া যায়।  পঁচানব্বই বছর বয়স্ক আব্দুল হাসিব বছর খানেক হল মোয়াজ্জেনের বৃত্তি থেকে অবসর নিয়েছেন। তাঁর বাড়ি বীরভূমের মাড়গ্রামের গোদাম পাড়ায়। মুখে এক গাল ভরা দাড়ি সুঠাম চেহারা। গায়ে সাদা রঙের গেঞ্জী। পরনে লুঙ্গী। মাথায় সাদা রঙের টুপি। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে হাসিব সাহেব বলেন, আমি বাচ্চা ছেলে থেকেই রোযা রাখা শুরু করি। বড়ো অভাবের সংসার ছিল।  কৃষি কাজ করে জীবনে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। এখন ছেলেদের কাছে থাকি। কখনো রোযা বাদ দিই নি। মাড়গ্রামের বড়ো মসজিদে দীর্ঘ ২৪বছর মোয়াজ্জিনের কাজ করেছেন। এখন বয়স বাড়ার কারণে আর আযান দেওয়া বা মুয়াজ্জিনের কাজ থেকে বিরত আছেন। বাড়িতেই রোজা নামাজ আদায় করেন। তিনি আরও বলেন,  এত কড়া প্রখর রোদ। তথাপিও তিনি কোন কিছুই মনে হয় না। রোযা অবস্থায় আমাকে খুবই ভালো লাগছে। এই অবস্থায় বাড়ির ছোট ছোট কাজ কর্ম সবই করি। আতর বিক্রি করি।  একইভাবে অত্যন্ত অভাবের মাঝে বেড়ে ওঠা বিজ্ঞানী মুনকির সাহেবের।  রোযা তাঁর জীবনে কতটা জায়গা জুড়ে আছে বোঝাতে মুনকির সাহেব বলেন, আগে ৩৬০ দিন রোযা রাখতাম। কোরবানির ৪ ও ঈদের ১ দিন মিলে মোট ৫ দিন খুসির দিনে রোযা জায়েয নয়। বছরের বাকি দিনগুলিতে রোযা রাখতাম। দু’একবছর আগেও সপ্তাহে দুদিন অর্থাৎ সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখতাম। এখন বয়সের কারনে আর পারি না। তব রমযানের রোযা রাখি। রমযানের পর ৬টি রোযা, সবেবরাতের রোযা আছে।  সেগুলি রাখি। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ২৪ বছর ৩৬০ দিন রোযা রাখি। বিজ্ঞানের জগত বলতে পারে এরকমভাবে রোযা রাখলে, গ্যাস হবে। শরীরের ক্ষতি হবে। কিন্তু,  একজন বিজ্ঞানের লোক হয়েও, আমি মনে করি বিজ্ঞানের জগতের বাইরেও, অধ্যাত্মিক জগত আছে।  এই রোযা রেখে আমার শরীরের কন অসুবিধা হয় নি। সারা জীবনে আমাকে কোন দিন ব্লাড টেস্ট করতে হয় নি। আমার ব্লাড গ্রুপ কী আমি জানি না।  ব্লাড টেস্ট ছাড়া তো কোন চিকিৎসা হয় না। আমি বলতে চাইছি, আমার কোন অসুখ হয় নি। আমি মনে করি, সংযম থাকলে, কোন অসুখ হবে না। উল্লেখ্য,  মুরারইয়ের ভীমপুর থেকে ১ কিমি দূরে খুঁটকাইল গ্রামে নানির বাড়িতে মানুষ মুনকির সাহেব। সংসারে এতটাই অভাব ছিল একবার মায়ের গহনা বিক্রি করে পাকুর থেকে চাল কিনতে হয়েছিল  তাঁর আব্বাকে। আব্বা ফাইজ হোসেন এবং মা রাজিয়া বিবি নিরক্ষর ছিলেন। প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। মুনকির সাহেবের কথায়,  ‘প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও, আমার আব্বা বা আম্মা কেউ কোনদিন আমাকে বিয়ের জন্য জোর করেন নি। শুধু বলে গেছেন, ‘শুধু পড়ে যাও বেটা। মন লাগিয়ে পড়”। সে পড়া আজও থামাই নি’।  ভীমপুরে ‘হারুল হুদা ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠায় মুনকির সাহেবের অন্যতম উল্লেখযোগ্য এবং অগ্রণী ভূমিকা আছে।  হেতমপুর কলেজে কেমিস্ট্রি অনার্স পাস করে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে এএসসি ও পিএইচডি করেন তিনি।  ৮৯ সালে মুম্বাই আইআইটি যাওয়া রিসার্চের কাজে। সেখানে সাড়ে সাত বছর কাটানো। ৯৬ সালে তাইওয়ানে গবেষনার কাজে যাওয়া।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only