শুক্রবার, ২১ জুন, ২০১৯

ভাটপাড়ায় হিংসা হত ২

নির্বাচনের পর থেকেই দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার ভাটপাড়া এলাকা। সেই ঝামেলা রুখতেই জগদ্দল থানা ভেঙে  নতুন ভাটপাড়া থানা গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য সরকার। বৃহস্পতিবার নতুন থানা উদ্বোধনের দিনই অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল ভাটপাড়া থানার অর্ন্তগত কাঁকিনাড়ার ঘোষপাড়া রোড এলাকা। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে ভাটপাড়া ও জগদ্দলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করল রাজ্য সরকার। এ দিন সকাল থেকেই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে ভাটপাড়ার পরিস্থিতি। মৃতু্য হয় দুই যুবকের। আহত আরও চারজন। এরপরেই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে তড়িঘড়ি জরুরি বৈঠক শুরু হয় নবান্নে।  বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যসচিব মলয় দে– স্বরাষ্ট্র সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়–ডিজি বীরেন্দ্র এবং এডিজি আইনশৃঙ্খলা জ্ঞানবন্ত সিং।
এরপরই রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের জানান– কিছু সমাজবিরোধী ও বহিরাগত ওখানে জড়ো হয়ে এ সব ঘটনা ঘটাচ্ছে। সরকার কড়া হাতে এ সবের মোকাবিলা করবে। তিনি বলেন– এরজন্য এডিজি দক্ষিণবঙ্গ সঞ্জয় সিংকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে ব্যারাকপুর কমিশনারেটে পাঠানো হয়েছে। ভাটপাড়া ও জগদ্দলে জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা।
 এদিকে– ভাটপাড়ার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে কড়া হওয়ার নির্দেশ দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি পুলিশকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন– দল ও রঙ না দেখেই ব্যবস্থা নিতে। তিনি পুলিশকে তিনদিনের সময় দিয়েছেন। বলেছেন– যে করেই হোক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসুন। এদিন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরই ব্যারাকপুরে পুলিশ কমিশনার তন্ময় রায়চৌধুরিকে বদল করে তার জায়গায় মনোজ বর্মাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়াও এডিজি দক্ষিণবঙ্গ সঞ্জয় সিংহকে এদিন বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে ব্যারাকপুর কমিশনারেটে পাঠানো হয়েছে। তিনিও ভাটপাড়া অশান্তির দিকে নজর রাখবেন।  নবান্নের তরফে জানানো হয়েছে ভাটপাড়ার নতুন থানা এদিন থেকেই কাজ শুরু করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে বাড়তি বাহিনী ওর্ যাফ পাঠানো হয়েছে। এদিন ভাটপাড়া পুরসভার ৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলরা মাকসুদ আলম পুবের কলমকে জানিয়েছেন নির্বাচনের পর থেকেও বারবার সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে ভাটপাড়ায়। ইতিমধ্যেই সেখানে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ সংখ্যালঘুদের বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে। বহু মানুষ প্রাণের ভয়ে এলাকা ছাড়া। বহু দোকান ও বাড়ি লুট করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন– ইতিমধ্যেই ঘরছাড়া ও আক্রান্তদের একটি তালিকা আমরা প্রশাসনের কাছে দিয়েছি। আমরা চায় প্রশাসন সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করুক। 

উল্লেখ্য– অশান্তি পিছু ছাড়ছে না ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে। এলাকার ‘বাহুবলী’ নেতা অর্জুন সিংহ তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে যে অশান্তির শুরু– প্রতিদিনই তা  নিয়ম করে বাড়ছে। এলাকার মানুষের দাবি– শাসক দল এবং অর্জুন সিংহ দু’পক্ষই এলাকা নিজের দখলে রাখতে মরিয়া। লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনে জিতে এলাকায় দখল অর্জুন এবং তাঁর দলবলের। কিন্তু জমি ফিরে পেতে মরিয়া কামড় দিচ্ছে শাসকদলও। আইনশৃঙ্খলা যাতে আরও কঠোর ভাবে বলবৎ করে শান্তি ফেরানো যায়– সে জন্য জগদ্দল থানা ভেঙে নতুন ভাটপাড়া থানা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার সেই থানা উদ্বোধনের দিনই থানা এবং থানায় থাকা পুলিশ কর্মীদের লক্ষ্য করেও এলোপাথাড়ি বোমাবাজি করল দুÜৃñতীরা। কয়েকশো পুলিশের সামনে গুলি চালাতেও পিছপা হল না তারা। পুলিশের সামনেই দু’পক্ষের মধ্যে গুলিবোমা চলতে থাকে। আহত হয়েছেন ১০ জনের বেশি পুলিশ কর্মী। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের গাড়িও। পুলিশ সূত্রে খবর– পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস এবং শূন্যে ১০ রাউন্ড গুলিও চালায়।  পুলিশের একটা সূত্র জানাচ্ছে– দুÜৃñতীদের এই বোমাগুলির লড়াইয়ে মৃতু্য হয়েছে কমপক্ষে দু’জনের।  মৃত একজনের নাম রামবাবু সাউ (২৬)। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে মৃত অন্যজনের নাম ধরমবীর সাউ (৩০)। স্থানীয়দের দাবি– রামবাবু কৈলাশ জুটমিলের কর্মী। গুরুতর জখম হয়েছেন ৫ জন। বিজেপির তরফে অবশ্য সব দোষই পুলিশের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে। বিজেপি নেতা তথা ব্যারাকপুরের সাংসদ অর্জুন সিং দাবি করেছেন– পুলিশের গুলিতেই মৃতু্য হয়েছে দু’জনের। এমনকী পুলিশকে সামনে রেখেই এলাকায় আক্রমণ চালিয়েছে তৃণমূল আশ্রিত দুÜৃñতীরা।
অন্যদিকে তৃণমূল নেতা তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্রের অর্জুন সিংহের সেই দাবি খারিজ করে দিয়ে বলেছেন– তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সাংসদ কী ভাবে জানলেন পুলিশের গুলিতে মৃতু্য হয়েছে? তাঁর কথায়– পুলিশের দাবি তারা শূন্যে গুলি চালিয়েছে। যে কোনও মৃতু্যই দুঃখের। কিন্তু সাংসদ কী ভাবে জানলেন পুলিশের গুলিতেই মৃতু্য হয়েছে ওই ব্যক্তির? উত্তর ২৪ পরগণার তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি তথা মন্ত্রী েজ্যাতিপ্রিয় মল্লিক দাবি করেছেন– ভাটপাড়ায় তৃণমূল কংগ্রেসের অস্তিত্ব এখন আর নেই। ফলে সেখানে যে ঘটনা ঘটেছে তা নব্য এবং পুরনো বিজেপির গোষ্ঠিকোন্দল। এদিকে বিজেপির তরফে এক সংসদীয় প্রতিনিধি দল আজ ভাটপাড়ায় আসছে। বৃহস্পতিবার এই প্রতিনিধিদলের আগমণের কথা জানিয়েছেন কৈলাশ বিজয় বর্গীয়। তিনি বলেন– মমতার সরকারের শাসনে বিজেপি কর্মীদের ওপর আক্রমণ ‘আম’ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ কোনও ব্যবস্থায় নিচ্ছে না। শুক্রবার বিজেপির সংসদীয় প্রতিনিধি দল ভাটপাড়ায় যাবে। তারা রিপোর্ট দেবে স্বরাষ্টÉমন্ত্রী অমিত শাহকে। মুখ্যমন্ত্রী ৭২ ঘন্টার মধ্যে ভাটপাড়াকে স্বাভাবিক করার বার্তা দেওয়ার পরই বিশেষ বাহিনী পাঠানো হয় সেখানে।র্ যাফ এবং কমব্যাট ফোর্স রুটমার্চ শুরু করেছে এলাকায়। সংঘর্ষ আপাত ভাবে থামলেও– আতঙ্ক চারদিকে। বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালছে পুলিশি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only