শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

‘জয় শ্রীরাম’ না বলায় ট্রেনে মার, অভিযোগ জিআরপিতে


নির্মাল্য সেনগুপ্ত
এবার আর অসম– উত্তরপ্রদেশ কিংবা রাজস্থান নয়। খোদ কলকাতা শহরের বুকেই মুসলিমদের মারধোর করে জবরদস্তি ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগান দেওয়ানোর চেষ্টায় উত্তেজনা ছড়াল। আর বাংলার সং্যূালঘুরা এতে প্রবলভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছে। শুধুমাত্র জয় শ্রীরাম শ্লোগানই নয়– টুপি-দাড়ি নিয়েও আপত্তি তোলা হয়। শুধু আপত্তি নয়– গালিগালাজ করা হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে এমনই তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুূীন হতে হয় কয়েকজন মুসলিম ট্রেন যাত্রীকে। ঘটনাটি ঘটেছে ওইদিন দুপুরে বালিগঞ্জ থেকে পার্ক সার্কাস স্টেশনের মাঝামাঝি জায়গায়। কেন তাঁরা মুসলমান হওয়ার সত্ত্বেও ট্রেনে উঠেছেন সে প্রশ্ন করা হয়।
এই ঘটনায় অত্যাচারিতরা প্রত্যেকেই আতঙ্কে রয়েছেন। যদিও এসআরপি শিয়ালদা জিআরপি অশেষ বিশ্বাসকে ফোন করে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন– ভিড়ের মধ্যে ট্রেনে ওঠা নামা নিয়ে পার্ক সার্কাস স্টেশনে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তার থেকেই ঝামেলা। ঘটনার তদন্ত হচ্ছে। কিন্তু পুবের কলম জিআরপি-তে আক্রান্তদের দাূিল করা যে অভিযোগপত্র পেয়েছেন তাতে কিন্তু ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে কি হয়েছিল? পুবের কলম-এর তরফ থেকে এক আক্রান্তের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি মাদ্রাসায় কর্মরত বছর কুড়ির যুবক– নাম শাহরুফ হালদার। তিনি প্রতিবেদককে বলেন– আমি হুগলি জেলার একটি মাদ্রাসায় কাজ করি। তাই কাজে যোগ দিতে ক্যানিং স্টেশন থেকে শিয়ালদাগামী ট্রেনে উঠেছিলাম। বৃহস্পতিবার নাকি আমহার্স্ট স্ট্রিটের শ্রদ্ধানন্দ পার্কে ‘হিন্দু সংহতি’ নামে একটি উগ্রসংগঠনের সভা ছিল।  ওই সময়েই ক্যানিং থেকে বেশ কিছু লোক শ্রদ্ধানন্দ পার্কে যাওয়ার জন্য ট্রেনে ওঠে। তাদের মাথায় ‘হিন্দু সংহতি’র ফেট্টি বাঁধা ছিল। তারা প্রথম থেকেই ট্রেনে ‘জয় শ্রী রাম’ শ্লোগান দিচ্ছিল। মুসলিম-বিরোধী কথাবার্তাও বলছিল। শ্লোগান দিচ্ছিল– মুসলিম হঠাও– দেশ বাঁচাও।  এরইমধ্যে হিন্দু সংহতির গ্র&পটির সঙ্গে বেতবেড়িয়া স্টেশন থেকে আরও কিছু লোক যোগ দেয়। তারাও ছিল হিন্দু সংহতির লোক। সব মিলিয়ে সংখ্যাটি পঁচিশ-তিরিশ জন হবে। ততক্ষণে চলন্ত ট্রেনের মধ্যে আশপাশের বগি থেকে চেঁচামেচি ও আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল ওই বগিতে কিছু লোককে মারা হচ্ছে এবং গালাগালিও দেওয়া হচ্ছে।


কিন্তু আমি যে বগিতে বসেছিলাম সেখানে তখনও কোনও সমস্যা তৈরি হয়নি। তার কিছু পরেই হিন্দু সংহতির একজন আমার পাশে সিটে এসে বসে। আমার পোশাক বেশভুষা দেখে বুঝতে পারে আমি একজন মুসলমান। বালিগঞ্জ স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়তেই বিনা প্ররোচনায় আচমকা আমার উপরও তারা চড়াও হয়। বলে– টুপি– লম্বা দাড়ি এসব আর চলবে না। ঢিলেঢালা পোশাক পাল্টাতে হবে। আমি কোনও প্রতু্যত্তর না করলেও মারধর শুরু করে দেয় তারা। উদ্ভ$ত এই পরিস্থিতিতে দেখি পার্কসার্কাস স্টেশনে ট্রেন ঢুকছে। এই অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে পার্কসার্কাস স্টেশনে নামতে যাই। সেখানেও ওই সংগঠনের লোকজন আমাকে বাধা দেয়। স্টেশনে থাকা স্থানীয় লোকজনদের সাহায্যে শেষ পর্যন্ত ট্রেন থেকে নামতে পারি। তবে ততক্ষণে শরীরের নানা জায়াগায় চোট পেয়েছি। স্থানীয়রাই আমার অবস্থা দেখে পার্ক সার্কাসে একটা ডাক্তারখানায় নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তপসিয়া থানায় আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে দেখি আমি একা নই আমার মতো আরও অনেকে আহত হয়েছে। প্রত্যেককেই মারধর করা হয়েছে জয় শ্রীরাম না বলার কারণে। তারপর জানতে পারি যেহেতু ঘটনাটি চলন্ত ট্রেনের মধ্যেই ঘটেছে– তাই এ ব্যাপারে তদন্ত করবে রেল পুলিশ। শেষপর্যন্ত রেলপুলিশ এসে আমাদের বালিগঞ্জ জিআরপি থানায় নিয়ে যায়। সেখানেই গোটা বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছি। লিখিত অভিযোগ করি। পুলিশ জানিয়েছে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। 
এদিকে এই ঘটনার পর থেকেই যথেষ্ট আতঙ্কে আছি। দীর্ঘদিন ধরেই ট্রেনে শিয়ালদা যাই। কখনও এধরনের ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়নি। আল্লাহর রহমত যে আমি রক্ষা পেয়েছি।
একই ধরনের হেনস্থা– মারধরের ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন মুহাম্মদ নইম লস্কর ও তাঁর তিন ভাই– মোতাহার হালদার ও তার সঙ্গে আরও চারজন এবং ভোলা দাস নামের এক হকারও।
পশ্চিমবঙ্গের অসাম্প্রদায়িক রাজ্যতে এই ঘটনা ঘটতে পারে তা শুনে অনেকেই আশ্চর্য হয়েছেন। কয়েকজন আলেম বলেছেন– এবার তাহলে পশ্চিমবঙ্গে আমাদের চলাফেরা দায় হয়ে উঠল। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পশ্চিমবঙ্গ প্রধান এবং মন্ত্রী মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন এবং বলেছেন তিনি আশা করেন– অপরাধীদের ধরে উপযুক্ত সাজার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বিষয়টি মু্যূমন্ত্রী গো-চরে আনবেন বলে এই প্রতিবেদককে বলেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only