বুধবার, ১৯ জুন, ২০১৯

ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মুরসির মৃত্যু ও নেপথ্যের প্রেক্ষাপট

আহমদ হাসান ইমরান


ড. মুহাম্মদ মুরসি ইসা আল-আইয়াত ‘সভ্যতার দেশ মিশর’-এর জননেতা এবং গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট। মাত্র ১ বছর ৪ মাস তিনি প্রেসিডেন্ট হিসাবে দেশ শাসন করতে পেরেছিলেন। তারপরই মিশরের সামরিক জান্তার স্বৈরাচারী শাসক আবদেল ফত্তা এল সিসি অবৈধ অভ্যুত্থানে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। জনগণের দ্বারা  নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও– সেই সময় থেকেই তিনি ছিলেন  মিশরের কারাগারে এক নির্জন সেলে। সেই ড. মুহাম্মদ মুরসি অন্তরীণ অবস্থায় ১৭ জুন ইন্তেকাল করলেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন)। তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন আদালতের কাঠগড়ার সলাকার পিছনে। তাঁর এই অকস্মাৎ মৃতু্য হয়তো দুনিয়ার মানুষকে বলে গেল– আদালত হচ্ছে আদ্ল বা সুবিচার প্রদানের জন্য। কিন্তু স্বৈর শাসকের অধীনে এই আদালত পরিণত হয়েছে প্রহসনের প্রতীকে।
স্বৈরশাসকের অধীনস্ত মিশরের আদালত গুলি পরিণত হয়েছে সামরিক শাসক জান্তার স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে। আর সেজন্যই বুঝি বিচার বঞ্চিত মিশরের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসি আদালতের কাঠগড়ায় প্রাণ ত্যাগ করে প্রমাণ করলেন– এখানে কোনও আদ্ল বা ইনসাফ পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি সুবিচার পেতে  পারেন একমাত্র মহান স্রষ্টা আল্লাহর দরবারে।
অবশ্য স্বাভাবিক কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে কিনা সে বিষয়ে ঘোরতর সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মহল থেকে।
কী কারণে সামরিক জান্তা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে অবৈধভাবে মুহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত  করে কারাগারের অন্ধকারে পাঠাল তা বোঝা দুষ্কর কিছু নয়। তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলাগুলি দেওয়া হয়েছে তা মধ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্ট মুরসি নাকি কাতারের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেছিলেন এবং তিনি নাকি তাঁর বিরোধীদের গ্রেফতার করে অন্যায়ভাবে নিগ্রহ করেছিলেন ইত্যাদি ইত্যাদি।
কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে সামরিক জান্তার বিদ্রোহ ও তাঁকে ক্ষমতাচু্যত করার পেছনে আসল কারণ হচ্ছে ইসলামি সংগঠন ব্রাদারহুড বা ইখওয়ান সমর্থিত প্রেসিডেন্ট মুরসি ছিলেন ইসলাম ও ইনসাফপন্থী। যে এক বছর চারদিন তিনি ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন তাতে তিনি দুর্নীতিমুক্ত– জনকল্যাণমূলক ও ইসলামি শরীয়ার অনুসারী বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। যার ফলে শুধু মিশরে নয়– সমগ্র পশ্চিম এশিয়ায় তাঁর জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এর ফলে প্রমাদ গোনে যায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল– মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্র– রাজতন্ত্র পরিচালিত সৌদি আরব এবং আশেপাশের সমস্ত পাশ্চাত্য অনুগামী  রাষ্ট্র। এছাড়া–  ফ্রান্স– ব্রিটেন ও অন্য  রাষ্ট্রগুলিও ছিল মুরসির ঘোরতর বিরোধী। কাজেই শেষের পাঁচ বছর পর মেয়াদ শেষে তাঁকে যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উৎখাত করা যাবে তার কোনও সম্ভাবনা ইসরাইল– মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্র কিংবা সৌদি রাজতন্ত্র দেখতে পারছিল না। তাই সকলে মিলে মিশরের সেনাপ্রধান আবদেল ফত্তা এল সিসিকে মিশরের ক্ষমতায় বসানোর জন্য এক ষড়যন্ত্র করে। আর তারাই অর্থের বিনিময়ে মুরসির বিরুদ্ধে এক বিক্ষোভের আয়োজন করে। আর এটাই হচ্ছে এই আধিপত্যবাদী রা রাষ্ট্রের চিরাচরিত প্রথা।তাই ভেনেজুয়েলা– সুদান– ইরাক কিংবা ইরানে পশ্চিমাদের দলদাস সরকার ছাড়া আর কাউকে তারা কূনও বরদাস্ত করে না। আর খানিকটা ইসলাম অনুরাগী হলে তো কথাই নেই। সামরিক বাহিনী– স্বৈরতন্ত্রী বা গণতন্ত্র বিরোধী দুর্নীতিবাজ হলেও কোনও কথাই নেই। পশ্চিমাদের স্বার্থরক্ষাকারী হলেই হল। তাকে তারা সমর্থন করবেই। এছাড়া তাদে সঙ্গে রয়েছে খুবই শক্তিশালী মিডিয়া ও ইন্টারনেট সহ বিশাল প্রচারণা যন্ত্র। অন্যদিকে– সৌদি আরবের ক্ষেত্রে মুশকিল ছিল তারা ভয় পাচ্ছিল প্রেসিডেন্ট মুরসি বা ইখওয়ানের যদিও প্রভাব বলয় বৃদ্ধি পায় সেক্ষেত্রে ইসলাম বিরোধী রাজতন্ত্র কখনওই দুই পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনার তত্ত্বাবধায়ক থাকতে পারবে না রিয়াধের গদিতে। গণতন্ত্রপন্থী নাগরিকরা তাদের উৎখাত করবেই। তাই ইসরাইলের মোসাদ এবং আমেরিকার সিআইএ- সঙ্গে মিলে প্রেসিডেন্ট মুরসিকে অন্যায়ভাবে উৎখাত করে জেলে প্রেরণ করা হয়। ইসলাম ও গণতন্ত্রপ্রেমী শক্তির উপর নেমে আসে বুলডোজারের বিধ্বংসী হামলা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only