মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০১৯

জবরদস্তি ‘জয় শ্রীরাম’: চাপে পড়ে আক্রান্তদেরই দোষ দিচ্ছে হিন্দু সংহতি। পড়ুন পুবের কলম এক্সক্লুসিভ

‘জয় শ্রীরাম’ না বলায় চলন্ত ট্রেনে বেধড়ক মারধর করা হয় বেশ কয়েকজন দাড়ি, টুপি পরিহিত মুসলিমকে। সংস্কূতির শহর কলকাতায় গত বৃহস্পতিবার ঘটেছে এই ঘটনা। জিআরপিতে লিখিত অভিযোগও দায়ের করেন আক্রান্তরা। শনিবার পুবের কলমে এই ঘটনা উঠে আসার পর সোশ্যাল সাইটেও এই খবর ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এখন চাপে পড়ে অভিযুক্ত হিন্দু সংহতির লোকজন আক্রান্ত মুসলিমদের ঘাড়েই দোষ চাপানোর মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। কয়েকটি মিডিয়াকে হিন্দু সংহতির লোকজন জানিয়েছেন--- যাদের আক্রান্ত বলা হচ্ছে, তারাই আগে হামলা চালিয়েছিল। তবে তাদের অভিযোগের মধ্যে কিন্তু যথেষ্ট যুক্তি নেই বলে। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় হিন্দু সংহতির লোকেরাই আক্রান্ত হয়েছেন– তাহলে তাঁরা অভিযোগ জানাতে একদিন দেরি করলেন কেন? আক্রান্ত মুসলিমরা যেদিন অভিযোগ দায়ের করেন, তার ঠিক একদিন পরে পাল্টা অভিযোগ করে হিন্দু সংহতি।
শনিবার পার্ক সার্কাস স্টেশনে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন পুবের কলমের প্রতিবেদক। এই পার্ক সার্কাস স্টেশনেই জখম ও রক্তাক্ত মুসলিমদের ট্রেন থেকে ঠেলে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, কয়েকটি বগি হিন্দু সংহতির লোকেদের ভিড়ে ঠাসা ছিল। তারা শ্রদ্ধানন্দ পার্কের একটি সভায় যাচ্ছিল। হিন্দু সংহতির এই অসংখ্য ক্যাডারদের মাত্র ৮-৯ জন নিরীহ মুসলিম যাত্রী কোন সাহসে আক্রমণ করতে যাবেন? অথচ একটি সংবাদমাধ্যমকে হিন্দু সংহতির কর্মকর্তারা বলেছেন– ওরাই আমাদের ওপর পার্ক সার্কাস স্টেশনে নেমে পাথর ছোড়ে– আমাদের জয় শ্রীরাম শ্লোগান দিতে বাধা দেয়। অথচ প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, এই হিন্দু সংহতির লোকেরাই মুসলিম সম্প্রদায়ের ৮-৯ জনকে আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় ঠেলে নামিয়ে দেয়।
আসল ঘটনা হল, চলন্ত ট্রেনের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার জবরদস্তি বেশ কয়েকজন মুসলিমকে মারধর করে ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগান দেওয়ানোর চেষ্টা হয়। এমন ঘটনা কলকাতা শহরের আওতার মধ্যে ঘটতে পারে– তা কল্পনার বাইরে ছিল পার্ক সার্কাস স্টেশনের নবকুমার মণ্ডল– মুহাম্মদ সালিমদের মতো ব্যবসায়ীদের। দীর্ঘদিন পার্ক সার্কাস স্টেশনে দোকান চালাচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য– ‘দীর্ঘদিন ধরে পার্ক সার্কাস স্টেশনে ব্যবসা করছি। হাজার হাজার মানুষ দিনভর এই স্টেশন দিয়ে যাতায়াত করেন। টুকটাক ঝগড়া অশান্তি হলেও এরকম পরিস্থিতির দেখিনি কোনও দিন।’ একজন বললেন– তাহলে কি এবার জয় শ্রীরাম শ্লোগান দিয়ে উগ্রবাদীরা পাকাপোক্ত জায়গা করতে চাইছে শহরে? যদিও এই হকার ও ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস– এই শহরে এইসব নকশা বেশিদিন চলবে না। ইয়ে বাঙ্গাল কে ধরতি হ্যায়– ইহাঁ হিন্দু-মুসলিম সব মিলকরর্ যাহতে হ্যায়।
ওখানকার ব্যবসায়ীদের কথা--- ওই দিন দুপুর দেড়টা হবে– চোখের সামনে সাত থেকে আটজনকে একদল লোক চিৎকার করতে করতে ট্রেন থেকে ঠেলে নামিয়ে দেয়। যাদের নামিয়ে দেওয়া হল তারা সেইসময় অনেকেই রক্তাক্ত। অনেকেরই ফুলে রয়েছে চোখুমুখ। কারা করেছে– কী ঘটনা--- বোঝার আগেই শিয়ালদাগামী সেই ট্রেন পার্ক সার্কাস স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যায়। সে সময় ট্রেনের কয়েকটি বগি থেকে চিৎকার ওঠে ‘জয় শ্রীরাম’। আক্রান্ত রক্তাক্ত মানুষদের কাছে গিয়ে দেখি– তাঁদের দ্রুত চিকিৎসা করানোর প্রয়োজন। তারা শুধু জানায়– ‘জয় শ্রীরাম’ না বলায় তাঁদের মারধর করেছে হিন্দু সংহতির লোকেরা। স্টেশনের ওই ব্যবসায়ীরা জানান– এই ঘটনার কথা শুনে ছুটে আসেন সেখ জুম্মান শাহিদ নামে স্থানীয় এক প্রবীণ বাসিন্দা তথা সমাজসেবক। তিনিই নিজের উদ্যোগে গুরুতর আক্রান্তদের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। স্থানীয় এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে তাঁদের ওষুধ ও ব্যান্ডেজের ব্যবস্থা করা হয়। এ দিকে ততক্ষণে স্টেশন চত্বরের ঘটনা শুনে চলে আসে তপসিয়া থানার পুলিশও।
এ প্রসঙ্গে শনিবারই একটি বাংলা সংবাদমাধ্যমকে হিন্দু সংহতির শীর্¡নেতা দেবতনু ভট্টচার্য বলেছেন– ঘুটিয়ারি শরীফের লোকজন আমাদের কর্মীদের জয় শ্রীরাম স্লোগান দিতে বাধা দেয়। আমাদের কর্মীরা তা প্রতিরোধ করেছে। বরং ওরাই পার্ক সার্কাসে নেমে রেললাইনের পাথর ছুড়ে মেরেছে। তাতে একজন আহত হয়। ওই হামলার জন্য আমরাও জিআরপির কাছে অভিযোগ করেছি। যদিও প্রত্যক্ষদর্শীদের কথামতো আহত অবস্থায় পার্ক সার্কাস স্টেশনে নেমেছিলেন সাত-আটজন। আর ট্রেনের কয়েকটি বগিতে ভিড় ছিল হিন্দু সংহতির লোকেদের। ট্রেনেরই কয়েকজন নিরীহ যাত্রী তাঁদের উপর কীভাবে পাথর ছুড়লেন– সে অভিযোগ নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে।
সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান এভাবে চলন্ত ট্রেনে নিরীহ সংখ্যালঘু যাত্রীদের নিগ্রহের তীব্র নিন্দা করেছেন। তিনি বলেছেন– অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে তাদের অবিলম্বে আইনের সোপর্দ করা উচিত। এ ছাড়াও যাঁরা ওই ঘটনায় আহত হয়েছেন– তাঁদের চিকিৎসার সুবন্দোবস্ত করার জন্যও তিনি পুলিশ-প্রশাসনের প্রতি আবেদন জানান।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only