রবিবার, ২৩ জুন, ২০১৯

মুসলিম মেয়েদের তালাক, হালালা ও শরিয়তি আইন থেকে মুক্তি দিতে চান আফরোজা খাতুন, মলয় সেনগুপ্তরা



মুসলিম সমাজে পরিবর্তন চাই, সংস্কার চাই শরিয়তে, ভারতে ইউনিফর্ম সিভিল কোড লাগু করতে হবে– এই ধরনের দাবিতে কয়েকটি মহিলা সংগঠন (মুসলিম) সারা ভারতে সক্রিয়। পশ্চিমবঙ্গেও তাদের অস্তিত্ব রয়েছে। কলকাতার মহাবোধি সোসাইটি হলে শনিবার বার বেলায় তিন তিনটি মহিলা সংগঠন একত্রিত হয়েছিল মুসলিম মহিলাদের সম-অধিকারের দাবিতে। তাদের প্রশ্ন– সাধারণ জীবনে মুসলিমরা যদি েফৗজদারি আইন মেনে চলতে পারে– তবে এই ‘কালা পারিবারিক আইন’ (মুসলিম পার্সোনাল ল) মহিলাদের ক্ষেত্রে কেন মেনে চলবে মুসলিম জনসমাজ? অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন– মুসলিম ব্যক্তিগত আইন পুরুষ-নারী-শিশু বা বৃদ্ধা সকলের প্রতি প্রযোজ্য। শুধু মুসলিম মহিলাদের প্রতি নয়। মহাবোধি সোসাইটিতে ওই তিন সংগঠনের বক্তব্যের মোদ্দা কথা ছিল– মুসলিম জনজীবনে এখনও তিন তালাক ও হালালা বিয়ে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এরই জেরে বহু নিরীহ মেয়ের জীবন অসহায় অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। এদিনের অনুষ্ঠানে হাজির করা হয়েছিল  রাহেলা খাতুন– নাসিমা খাতুন– হীরা খাতুন– মাজেলা খাতুন– রোজেনা খাতুন এবং মজিলা বিবিদের। ওই তিন সংগঠনের কর্মকর্তা মলয় সেনগুপ্ত– সুজাতা দে বসু– খাদিজা বানু– চন্দনা মিত্র ও অধ্যাপিকা আফরোজা খাতুনের বক্তব্য– এই মেয়েদের জীবনে তিন তালাক হালালা বিয়ে নেমে এসেছে অভিশাপ হয়ে। পারিবারিক অশান্তির জেরে নাকি মৌখিক তালাক দিয়ে হীরা খাতুনকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। ফলে কার্যত পথে বসতে হয় তাঁকে। গ্রামের মাওলানা, মুরব্বি থেকে প্রশাসন সবার দরজায় দরজায় গিয়ে বিচার চেয়েছেন হীরা খাতুন কিন্তু না, কারও কাছ থেকেই কোনও সাহায্য পাননি। তাঁর ক্ষোভ, তিন তালাক পাওয়া মেয়েদের কেউ মানুষ বলেই গণ্য করে না। পুলিশের কাছে গিয়েছি। কথা না শুনেই তাড়িয়ে দিয়েছি। কোর্টে গিয়েছি, কিন্তু মর্যাদা পাইনি। বাপের বাড়ির লোকেরা তাড়াতে পারলে বাঁচে। তবে আমাদের কি কোনও মূল্য নেই মানুষ হিসাবে?


সভায় সুবক্তা হীরা খাতুন প্রশ্ন তোলেন, ‘আমাদের মতো নির্যাতিতাদের সমস্যার কি কোনও সুরাহা হবে না? সরকার কি আমাদের দায়িত্ব ফেলে দিতে পারে?’ তাঁর আবেগভরা অভিযোগগুলো শুনে শ্রোতা দর্শকদের অনেকেরই চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। মাজেদা খাতুনও তাঁর কাহিনি তুলে ধরেন। তিন তালাক দেওয়ার পর মাজেদার স্বামী ভুল বুঝতে পারে। কিন্তু ততক্ষণে তালাকের কথা গ্রামে জানাজানি হয়েগেছে। মৌলবিরা ফতোয়া জারি করেন– তালাকের পর একই ছাদের তলায় স্বামী ও স্ত্রী থাকা চলবে না। গ্রামের ‘ধর্মপ্রাণ’ লোকেরাই জোর করে বের করে দেয় মাজেদা ও তাঁর ২ সন্তানকে। বিহিত হিসাবে গ্রামের মাওলানারা নিদান দেন– অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে করে তাঁর কাছ থেকে তিন তালাক পেলেই তবে তাঁর পুরনো স্বামীর কাছে ফিরতে পারবেন তিনি। শেষমেশ দুঃসম্পর্কের এক আত্মীয়ের সঙ্গে বিয়ে। কিছুদিন তাঁর সঙ্গে সংসার করে তবেই ফের পুরনো স্বামীর কাছে ফিরতে পারেন মাজেদা। তাঁর অভিযোগ, হালালা বিয়ের অমানুষিক নিয়ম আসলে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে ব্যবহার করে মেয়েদের ধর্ষণ করার ফিকির। তাঁর দাবি– এবার এই নিয়ম বন্ধ হোক। একের পর এক এই ধরনের বহু কাহিনি সভায় তুলে ধরা হয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতোলির নাসিমা মল্লিক বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর শ্বশুর-ভাসুরেরা তিন সন্তান সহ তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। বাপের বাড়িতেও ঠাঁই হয়নি। তাই খোলা আকাশের নীচেই তাদের দিন কাটছে এখন। এই ঘটনার ব্যাখা দিয়ে রোকিয়া নারী উন্নয়ন সমিতির প্রধান অধ্যাপিকা আফরোজা খাতুন বলেন, মুসলিম পারিবারিক আইনে মেয়েদের সম্পত্তির অধিকারও স্বীকৃত নয়। স্বীকৃত  নয় পারিবারিক সম্পত্তির ওপর মৃতের ছেলেমেয়েদের অধিকার। অনেক মেয়েরাই তালাক পাওয়ার পর বাপের বাড়ি থেকেও সাপোর্ট পান না। আবার স্বামীর মৃত্যুর পরও মাথার ওপর ছাদ হারিয়ে সহায়হীন হতে হয় অনেককেই। আফরোজা বলেন, অসংখ্য মুসলিম মহিলাকে প্রতিদিন লড়াই করতে হচ্ছে এই সব মধ্যযুগীয় শরিয়তি নিয়মের বিরুদ্ধে। সেই কারণেই এদিন মুসলিম ব্যক্তিগত পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে নারীদের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রোকিয়া  নারী উন্নয়ন সমিতি, অহল্যা ও সাউথ কলকাতা সোসাইটি ফর এমপাওয়ারমেন্টঅফ  উইমেন( সিউ) পক্ষ থেকে যৌথভাবে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। তালাক পাওয়া মেয়েদের স্বনির্ভর করার প্রকল্প এবং মুসলিম পারিবারিক আইনের সংস্কারের দাবিতে অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রী ও সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে নির্যাতিতাদের সই সংগ্রহ করে পাঠাবেন বলে ঘোষণা করেন তিন সংগঠনের নেতানেত্রীরা। 
তবে তারা একটি সাকসেস স্টোরিও তুলে ধরেছেন। বছর কয়েক আগে নাকি জঙ্গিপুরের নাসিমা খাতুন গর্জে উঠেছিলেন এই হালালা বিয়ের বিরুদ্ধে। নাসিমার স্বামী তাঁকে তিন তালাক দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। পরে ভুল স্বীকার করে নাসিমার সঙ্গেই সংসার করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বাধ সাধে গ্রামের মোড়ল-মৌলবীরা। তারা হালালা বিয়ের পরামর্শ দেন নাসিমাকে। নাসিমা নাকি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন– সে হাদিশ কুরআনের এই নিয়ম মানে না– কারণ মেয়েরা তো পশু নয়। হালালা অনুযায়ী– তারপক্ষে অন্য কাউকে বিয়ে করে ফের ফিরে আসা সম্ভব নয়। পাড়ার লোকের চাপে বাধ্য হয় বাড়ি ছাড়তে। তবে পাড়ার পাশেই ভাড়া বাড়ি নিয়ে নাসিমা লড়াই চালিয়ে যান। অবশেষে তিনি ও তাঁর স্বামী ফতোয়া অগ্রাহ্য করে একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন। নাসিমা এখন আশেপাশের অন্য মেয়েদেরও হালালার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সাহায্য করছেন। নাসিমা খাতুনের এই সাহসিকতার জন্য এদিনের অনুষ্ঠানে তাঁকে সংবর্ধিত করেন আফরোজা খাতুনরা। তারা বলেন, এই ধরনের বহু অনুষ্ঠান করে আগামিদিনে তারা জনমত গড়ে তুলবেন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only