বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০১৯

আমরা কারও দয়ায় ভারতে থাকি না, আমরা হাজার বছরের ভূমিপুত্র : আহমেদ হাসান ইমরান


এম এ হাকিম : সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সদস্য ও দৈনিক ‘পুবের কলম’ পত্রিকার সম্পাদক আহমেদ হাসান ইমরান বলেছেন, ‘আমরা কারও দয়ায় এই ভারতে থাকি না। এই ভারতে আমরা হাজার বছর ধরে রয়েছি। এই ভারতে আমরা ভূমিপুত্র। আমাদেরকে এনআরসির নামে বিদেশি বলে ঘোষণা করবে এই  জিনিস আমরা হতে দেব না। তিনি আজ কলকাতার রবীন্দ্র সদনে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ আয়োজিত ‘শান্তি ও একতা’ সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে ওই মন্তব্য করেন।   

আহমেদ হাসান ইমরান বলেন, ‘আমরা এমন লোক যে, আমরা  মারা গেলেও এখানকার মাটিতে কয়েক হাত জমিনে শুয়ে থাকি। মারা যাওয়ার পরেও আমরা ভারতকে ছেড়ে যাই না। আমরা ভারতকে এত ভালোবাসি! আমরা ভারতের মুসলিমরা মারা যাওয়ার পরে কয়েক হাত কবরে মরে যাওয়ার পরে শুয়ে থাকি। আমরা আমাদের ইমান নিয়ে আমাদের অধিকার নিয়ে আমরা এখানে বেঁচে থাকতে চাই।’  

এদিনের সমাবেশে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের আনা সাম্প্রতিক ‘বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন (ইউএপিএ) সংশোধনী বিল’ পাসকে ‘কুখ্যাত কালা কানুন’ বলে অভিহিত করে এর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। আহমেদ হাসান বলেন, লোকসভায় দানব জাতীয় একটা বিল পাস হয়েছে। এখনও তা আইনে পরিণত হয়নি। এটা ভারতের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটা বিপদ হিসেবে আসছে। কিন্তু সেই সঙ্গে এই বিপদ বিশেষ করে আসছে সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপরে। ওই বিলের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তিকে সন্ত্রাসবাদী ঘোষণা করা যেতে পারে! পুলিশ ইচ্ছে করলে যাকে তাকে সন্ত্রাসী ঘোষণা করতে পারবে! তার সম্পত্তিও পুলিশ বাজেয়াপ্ত করতে পারবে! ভাবুন, কোনদিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে। প্রমাণ ছাড়াই সন্দেহ হলেই আপনাকে গ্রেফতার করতে পারবে। সন্ত্রাসী ঘোষণা করতে পারবে। ‘টাডা’, ‘পোটা’র মতো কুখ্যাত আইনকে ছাড়িয়েও ওই আইন তৈরির চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অধিকার দিয়েছে। কিন্তু এসব অধিকার হনন করে ওই আইন পাস হতে চলেছে। রাজ্যসভায় ওই বিল পাস হলে তা আইনে পরিণত হয়ে যাবে। তার প্রশ্ন, এটা কী গণতন্ত্র, যা সংবিধানকে উল্লঙ্ঘন করে? তিনি এব্যাপারে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।   
জনাব আহমেদ হাসান অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি আইনকে কালা কানুন বলে উল্লেখ করে এনআরসির নামে অসমের ট্রাইব্যুনালগুলোতে সেখানকার মানুষজন কীভাবে চরম হয়রানি ও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন তা বিস্তারিত উল্লেখ করে সকলকে সতর্ক থাকতে বলেন।   
আমাদের সংবিধান সংখ্যালঘু হিসেবে যে অধিকার দিয়েছে ভারতের নাগরিক হিসেবে যে অধিকার দিয়েছে আমরা সেই অধিকারের ভিত্তিতে দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে সুনাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে চাই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।        
ওই সম্মেলনে রাজ্যের জনশিক্ষা প্রসার, গ্রন্থাগার দফতরের মন্ত্রী ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের রাজ্য সভাপতি মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, ‘প্রকৃত ধর্ম হিংসা, বিদ্বেষ শেখায় না। ভারতবর্ষ সুবিশাল দেশ। এখানে ১৩০ কোটি মানুষের বাস। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই হল ভারতের রক্ষাকবচ। বর্তমান ভারতে যে গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে, গোরক্ষার নামে অত্যাচার, গণপিটুনি, নৈরাজ্য সৃষ্টি, পেশিশক্তি প্রদর্শনে নিঃসন্দেহে ভারত সরকারের মাথা হেঁট হয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই! দিল্লিতে যতই তারা শক্তি দেখান এসব ঘটনায় ১৩০ কোটি মানুষের মুখ পুড়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই! পৃথিবীর মানুষ তাকিয়ে দেখছে, লক্ষ্য করছে ভারত কোন পথে যাচ্ছে।’  

সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, আমেরিকার গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে ভারতে বজরং দল সব থেকে বড় সন্ত্রাসী দল! এটা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা রিপোর্ট। এটা   আমার আপনার রিপোর্ট নয়। দেশের যে কতখানি ক্ষতি তারা করেছে এই ভাবনা তাদেরকেই ভাবতে হবে। ভারতের সহিষ্ণুতার ঐতিহ্য ওরা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।’  

তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট বলেছে প্রত্যেক জেলায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা নিযুক্ত করতে হবে যারা গণপিটুনির বিষয়ে নজর রাখবেন। আমরা চাই ভারতের প্রত্যেক রাজ্যে যে  ‘ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী’ আছে তাদের বিরুদ্ধে সরকার আইন তৈরি  করুক। যারা ধর্মের নামে সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে, রাষ্ট্রের নামে দাঙ্গা ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন তৈরি হোক।’   

সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী স্বাধীনতা আন্দোলনে জমিয়তের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ভারতের প্রাচীন বলিষ্ঠ ও দায়িত্বপূর্ণ সংগঠন। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ভাইপো শিশির বসু বলেছিলেন, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ যদি আন্দোলনের ডাক না দিত ভারতের স্বাধীনতা একশ’ বছর পিছিয়ে যেত। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হত না।’

ওই সম্মেলনে কেন্দ্রীয় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সাধারণ সম্পাদক হজরত মাওলানা মাহমুদ মাদানী, কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রেড রোডের ইমামে ঈদায়েন ও বিশিষ্ট আলেম কারী ফজলুর রহমান-সহ জমিয়তের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only