বুধবার, ২৪ জুলাই, ২০১৯

ব্যস্ত রাস্তার ধারের ফুটপাথই এহেশানের রিডিং রুম

পিয়ালী দে বিশ্বাস, কলকাতা : পাশের রাজপথ ধারে ছুটে যাচ্ছে একের পর এক গাড়ি। রেলিংয়ের বেড়া পেরিয়ে হাজারও মানুষ হেঁটে যাচ্ছে ফুটপাথ ধরে। কিন্তু সেদিকে হুঁশ নেই খুদেটার। মন ঢেলে দিয়েছে সাদা পাতায় ভেসে ওঠা কয়েকটা ইংরেজি অক্ষরে। নাম তার মুহাম্মদ এহেশান। সাতবছরের এহেশানের ঠিকানা কেয়ার অফ মির্জাপুর স্ট্রিট, অধুনা সূর্যসেন স্ট্রিটের ফুটপাথ।

টাকি হাউজের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র এহেশান। ঠাঁই ওই টাকি হাউজেরই দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের বিপরীত দিকের ফুটপাথেই। ওর বয়সি অন্য পাঁচটা ছেলের মতো এহেশানের পড়ার টেবিল নেই, নেই বই রাখার সেল্ফ,নেই রং পেনসিলে আঁকিবুঁকি কাটার বোর্ড। তার বদলে যা আছে, তা হল স্বপ্ন বুনে যাওয়ার মতো দু'টো চোখ, মাটিতে দাঁড়িয়ে আকাশে উড়ান দেওয়ার মতো শক্তপোক্ত মন। আর আছে মাথা গোঁজার মতো একটা ফুটপাথের ঠাঁই।
বুধবার এহেশানের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখা গেল, দু'দিকে দোকান, মাঝে একটা সরু গলি, সেখানে নোনা ধরা টের ফাঁকে ঝুলছে মশারি থেকে নিত্য ব্যবহারের জামা-কাপড়। একটা মানুষ বসার মতোও জায়গা নেই সেখানে। সেই গলির সামনে ফুটপাথেই রান্নাবান্না, ফুটপাথেই ইটের খাঁজে বই রাখার বন্দোবস্ত এহেশানদের। বৃষ্টি-বাদলা, ভরা গ্রীষ্মে কিংবা দারুণ শীতেও ফুটপাথের দোকানের ছই ভরসা তার পরিবারের। বাবা মুহাম্মদ ইলিয়াস ট্যাক্সি মোছামুখির কাজ করেন, সামান্য উপার্জনে নিজেদের গ্রাসাচ্ছাদনই হয় না, তার উপর ছেলের লেখাপড়ার খরচ মানে বাড়তি বোঝা। বড়দাদা একসময় পড়াশোনা করত, এখন সে সবের বালাই নেই। কিন্তু। ছোট এহেশানের দু'চোখ জুড়ে আছে শুধু লেখাপড়ার শেখার স্বপ্ন। বড় হয়ে শিক্ষক হতে চায় সে।

কিন্তু ফুটপাথের হাজার রকম কলরবে পড়াশোনায় মন বসে কীভাবে? দিনভর ওই রাস্তা দিয়ে শুধু অসংখ্য মানুষের যাতায়াতই নয়,বাস-ট্রাম-ট্যাক্সি মিলিয়ে হাজার ধরনের যানবাহনের আওয়াজ। এছাড়াও বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কায় ফুটপাথবাসীর মৃত্যু যেখানে প্রদিনের ঘটনা, সেখানে এমন জায়গায় বসে পড়তে ভয় করে না? এহেশান বলে, তার অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। 

তাই তার বয়সি ফুটপাথ বাসিন্দারা যখন মোবাইল স্ক্রিনের চটুল ছন্দে বিনোদন খুঁজে নেয়, তখন এহেশানরা মন দেয় বইয়ের কালো অক্ষরে। কারণ সন্ধে নামলেই স্ট্রিট লাইটের উজ্জ্বলতা কমে আসবে, পাঁচ বাড়ি কাজের ধকল নিয়ে ক্লান্ত মা রোকেয়া বিবি ফুটপাথেই কুটনো কেটে রান্না বসাবেন ওই আলোয়। তখন আর ওই কম আলোয় পড়াশোনা করা যায় না। তার উপর আছে অন্য সমস্যাও, রাত নামলেই আঁধার চরিত্র বদল হয় ফুটপাথের। নেশারুদের স্বর্গ হয়ে ওঠে ফুটপাথে। ওই সময় ফুটপাথের একধারেই মশারি টাঙিয়ে শুয়ে পড়ে এহেশান। যেটুকু পড়াশোনা তাই দিনের বেলাতেই। স্কুলে পড়া বুঝতে না পারলে স্যারদের কাছে পড়া বুঝে নেয় এই মনোযোগী ছাত্র। তাঁরাও সুবিধা মতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।


ছেলে তো পড়তে চায়, পড়াবেন ওকে? এই প্রশ্নের উত্তরে এহেসানের বাবা ভাবলেশহীনভাবে উত্তর দেন, চাই তো। কিন্তু ওসবে বড্ড খরচ। ওই স্কুলে ভর্তি হয়েছে, নিজের মতো করে নিজেই পড়াশোনা করে ও। এক চিলতে ছেলের এমন চেষ্টা দেখে আশপাশের দোকানিরা কখনও খাতা, কখনও পেনসিল দিয়ে একটু এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। যেখানে নামিদামি স্কুলে সবধরনের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও পড়ুয়ারা পড়াশোনায় আগ্রহ দেখায় না, সেখানে এই খুদের চেষ্টা তাঁদেরকে অবাক করে বলে জানিয়েছেন পাশরে এক বই খাতা ব্যবসায়ী। তবে সব বাড়ানো হাত ধরে না এহেশান। পথচলতি বহু মানুষই ওই এক চিলতে খুদেকে ফুটপাথে পড়তে দেখে আগ্রহী খেলনা, কখনও বা শোখিন খাবারপ কিনে দিতে চান। কিন্তু রাজি হয় না এহেশান। এ দিন তাকে প্রশ্ন  করি কী লাগবে? খাতায় মুখ ডুবিয়েই মাথা নাড়ে, কিচ্ছু না। আসলে মির্জাপুর স্ট্রিট জুড়ে তখন সন্ধে নামছে। দিনের ফেলে যাওয়া ওই নিয়ন আলোর শেষ স্মৃতিটুকু চেছে নেয় এহেশানের চোখ। কারণ দিনের আলো থাকতে থাকতে স্কুলের হোমওয়ার্ক শেষ করতে হবে তাকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only