মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই, ২০১৯

দেড় লক্ষ গাছ বসিয়ে আজ স্বনির্ভর একুশ হাজার মহিলা



মুহাম্মদ রাকিব, উলুবেড়িয়া: "গাছ লাগান- জীবন বাঁচান" এই শ্লোগান দেওয়াল লিখন হামেশাই চোখে পড়ে। সমাজে সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য পরিবেশ প্রেমী থেকে শুরু করে পরিবেশবিদরা গাছ নিধনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন। তবে সরকারী ও বেসরকারীভাবে এত প্রচারের পর বৃক্ষরোপণ বিষয়টি কতখানি সফল তা নিয়ে বির্তক আছে। তবে সব বিতর্কের উর্ধ্বে এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে দুনিয়ায় নজির গড়ছে 'বাগনান এক নম্বর মহিলা বিকাশ সমিতি' একুশ হাজার মহিলা সদস্য।

এরা সকলেই গ্রামীন ও প্রান্তিক অঞ্চলের মহিলা। তাদের সিংহভাগের কাছে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেই। এখন পর্যন্ত তাঁরা প্রায় দেড়লাখ বৃক্ষরোপন করেছেন।  নিজেদের জায়গায় ফল ও কাঠের গাছ লাগিয়ে নিজেদের পরিবারের খাদ্য সুরক্ষার পাশাপাশি আর্থিক দিকও সুরক্ষিত করছেন।
এই বড় সংখ্যার মহিলাদের সংগঠিত করে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে সচেতন ছড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে "বাগনান এক নম্বর মহিলা বিকাশ সমিতি"। গ্রামীন হাওড়ার বাগনানের এই সংগঠনের একাধিক কাজকর্মের খ্যাতি দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বৃক্ষরোপনের মাধ্যমে "পরিবেশ সুরক্ষার সঙ্গে দরিদ্র ও সাধারণ পরিবারগুলির খাদ্য সুরক্ষার" কর্মসূচি চালাচ্ছেন তাঁরা। গ্রামের মহিলাদের সঙ্গে নিয়ে আম,জাম,লিচু,সবেদা,কাগজিওবাতাবি লেবু,পেয়ারা,জামরুল,ডালিমের মত ফলের গাছ লাগানোর, পাশাপাশি সেগুন,মেহগনি,কদম,অর্জুন, খিরিশ,আকাশমণিসহ দামী কাঠে উৎপাদনকারী গাছ লাগিয়েছেন।

এই কর্মসূচীর সূচনার কথা বলতে গিয়ে বাগনান এক নম্বর মহিলা বিকাশ সমিতির সভানেত্রী মাধুরি ঘোষ বলেন, তাদের এই কর্মসুচি শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। সেই সময় তাঁরা নিরক্ষরতা দূরীকরন কর্মসুচিতে সামিল হয়েছিলেন। চম্পা প্রামানিক, তৃপ্তি ঘাঁটি, ছবি মন্ডল,  বাহারন বেগম, অনিমা প্রামানিকসহ ও আরো বেশ কয়েকজন মহিলাকে এই কর্মসূচিতে সঙ্গে নেন তিনি।


মাধুরিদেবী বলেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিরক্ষর মহিলাদের স্বাক্ষর করার কাজ করছিলাম। সেখানে ঘোরার সময় দেখে ছিলাম, এলাকায়গুলিতে গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। যে গাছ আছে, তাও মানুষ কেটে নিচ্ছে তাদের প্রয়োজনে। আবার ব্যবসায়ীরা গাছ কিনে নিচ্ছেন। এই বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছিল।তাই, নিরক্ষরতা দূরীকরন কর্মসূচীর ফাঁকে আমরা মহিলারা মাঝেমধ্যে সবাই একত্রিত হতাম। একত্রিত হয়ে সমাজের বিশেষত মহিলাদের উন্নয়নে কি করা যায়,তা নিয়ে আলাপ আলোচনা করা হতো। তখন নিরক্ষরতা দূরীকরনের কাজের পাশাপাশি মহিলাদের সংগঠিত করে গড়ে তোলা হয়েছিল বাগনান এক নম্বর মহিলা বিকাশ সমিতি।    

তিনি আরও বলেন, সমিতির একটি বৈঠকে আমরা বসে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করি বৃক্ষরোপন করার কর্মসূচী নেওয়া হয়।সদস্যারা ঠিক করলেন তারা প্রত্যেককে দশটা করে তালের আঁটি বাঙ্গালপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের এলাকায় বাঁধের ধারে লাগাবেন। সেই থেকে শুরু। ১৯৯৬ সালের পর বিক্ষিপ্তভাবে গাছ লাগানো হয়। এর মধ্যে তাদের (বাগনান এক নম্বর মহিলা বিকাশ সমিতি) সংগঠনের বৃদ্ধি হয়। সদস্যার সংখ্যা ও বাড়ে। তখন ঠিক হয় সদস্যাদের বাড়িতে যে জায়গা আছে, সেই জায়গাতে গাছ লাগানো হবে। মাধুরি বলেন,তাদের মূল সংগঠনের (মহিলা বিকাশ সমিতি) তরফ থেকে যে,কল্যানমুলক তহবিল আছে, সেই কল্যানমুলক তহবিল থেকে চারা গাছ কেনা হবে। এক-একটি সদস্যাকে পাঁচটি করে গাছ দেওয়া হবে। চলতি আর্থিক বছরে( ২০১৮-১৯) এক হাজার ৯৯ জন সদস্যা ৪,১১০টি ফলের গাছ সহ ৬৫৮২টি গাছ লাগিয়েছেন। এই ভাবে গোটা বাগনান এক নম্বর ব্লক জুড়ে এখন ও পর্য্যন্ত প্রায় একুশ হাজার পরিবার প্রায় দেড় লক্ষ গাছ লাগিয়েছেন।


এই কর্মসূচীর মাধ্যমে তাদের নিজেদের পরিবারের খাদ্য সুরক্ষিত করার পাশাপাশি তারা অতিরিক্ত ফল বাজারজাত করছেন।  বাড়ভগবতীপুরের নেকজান বেগমের বাড়ির সামনে সামান্য জায়গা সেখানে তিনি বসিয়েছিলেন কয়েকটি জামরুল গাছ। সেই জামরুল গাছ বড় হয়েছে। এখন জামরুল ও হচ্ছে। নেকজান বলেন, আমার গাছের  জামরুল তো বাড়ির লোকেরা খাচ্ছেনই, এমন কি প্রতিবেশীদের বাড়িতে তা পাঠানো হয়। বাড়ির সামনে গাছ লাগানোর তাঁর ইচ্ছা হল কেন হল? জানতে চাইলে, উত্তরে নেকজান বলেন, আমরা সমিতির মেম্বার। সমিতির সভানেত্রী মাধুরিদি এক সভায় বলেছিলেন, যে গাছ লাগানোর কত উপকার। মাধুরিদির কথা শুনে আমি ও অন্যান্য সদসারা বাড়ির সামনে যে জায়গা আছে তাতে গাছ লাগিয়েছি। তার সুফলও এখন পাচ্ছি।  
এই কর্মসূচির জন্য হাওড়ার জেলাশাসক মুক্তা আর্য্য সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সংশ্লিষ্ট দফতরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যে ওই সংস্থাকে দিয়ে আরো গাছ কিভাবে কাজে লাগানো জন্য উৎসাহীত করা যায়,সে সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only