রবিবার, ২৮ জুলাই, ২০১৯

শিক্ষিত বাঙালি মুসলিম সমাজ মননচর্চায় উদাসীন কেন? ‘আলিয়া’র আলোচনাসভায় কারণ খুঁজলেন বিশিষ্টরা

বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠছে ক্রমশ। তবুও সংস্কৃতির বৃহৎ অঙ্গনে মুসলিমদের অংশগ্রহণ এত কম কেন? রবিবার আলিয়া সংস্কৃতি সংসদ ও ওরিয়েন্টাল মিডিয়া ফোরাম আয়োজিত সাহিত্যসভায় এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজলেন সাহিত্য ও সংবাদ জগতের অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্বরা। ত্রৈমাসিক ‘আলিয়া’ পত্রিকার নতুন সংখ্যার মোড়ক উন্মোচনকে কেন্দ্র করেই এদিন আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক সার্কাস ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। আর সেখানেই নতুনভাবে উঠে আসে বর্তমান বাঙালি মুসলিমদের নিয়ে দীর্ঘদিনের এই জিজ্ঞাসাটি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বুদ্ধিজীবী ও সম্পদশালী বাঙালি মুসলিমরা ওপারে (অধুনা বাংলাদেশ) চলে গেলে এপার বাংলার সাংস্কূতিক ক্ষেত্রটি শূন্য হয়ে পড়ে। ‘কাফেলা’র মাধ্যমে আবদুল আযীয আল আমান সেই ফাঁক পূরণের চেষ্টা করলেও অধুনা গড়ে ওঠা মুসলিম মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজ কিন্তু সাংস্কূতিক দিকটিতে যারপরনাই অমনোযোগী ও উদাসীন। এদিন এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দৈনিক পুবের কলম পত্রিকার সম্পাদক ও সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান, সাপ্তাহিক নতুন গতির সম্পাদক এমদাদুুল হক নূর, অধ্যাপক সাইফুল্লা সংখ্যালঘু সমাজের ‘সাংস্কূতিক নিরক্ষরতা’র কথাটি বেশ জোরের সঙ্গে উল্লেখ করেন। আহমদ হাসান ইমরান এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে গ্রাম থেকে উঠে আসা কলকাতার শহুরে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মুসলিমদের ‘ফ্ল্যাট কালচার’-এর কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, মধ্যবিত্তরা একটি গণ্ডির মধ্যে থেকে যাচ্ছে। ইতিহাসকে জানার আগ্রহ কমে গেছে। ফ্ল্যাটের মধ্যে সাংসারিক জীবন আর কর্মক্ষেত্র---এই বৃত্তের মধ্যেই তারা দিনাতিপাত করছেন। কলকাতায় শিল্প-সংস্কৃতির যে বৃহৎ পরিসর আছে, তার সন্ধান করছেন না বা তাতে অংশ নিতেও উৎসাহ দেখাচ্ছেন না।
বক্তব্য দিচ্ছেন অধ্যাপক সাইফুল্লা

আহমদ হাসান ইমরান আরও বলেন, অতীত-ঐতিহ্যকে ভুলে যাওয়া সাংস্কূতিক পশ্চাদ্পদতার অন্যতম কারণ। আমাদের ইতিহাস প্রীতি নেই। মহানায়িকা সুচিত্রা সেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর শ্বশুরবাড়ি বাংলাদেশ সরকার সংরক্ষণ করে রেখেছে। কিন্তু আমরা এপার বাংলায় শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক, শহিদ সোহরাওয়ার্দির বাড়ি সংরক্ষণ করতে পারিনি। সংস্কৃতির প্রতি এই উদাসীনতা আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লির কোনও শাহি খানদানি বংশের কেউ বাংলার শাসনকর্তা হলে আমরা মেনে নিতাম। কিন্তু এখানকার মুসলিম নেতারা (ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দি চল্লিশের দশকে বাংলার প্রিমিয়ার হয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেছিলেন) তো শুদ্র, দলিত শ্রেণি থেকে ধর্মান্তরিত। তাদের কর্তৃত্ব আমরা মেনে নেব না। শ্যামাপ্রসাদের এই উক্তি উদ্ধৃত করে ইমরান বলেন, প্রতিভা থাকলে কেউ তাকে চেপে রাখতে পারে না। ফজলুল হক তাই বাংলার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। অথচ তাঁকে এ প্রজন্মের অনেকেই চেনে না। এ হেন পরিস্থিতিতে চর্চার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
বক্তব্য রাখছেন সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান 

একই প্রসঙ্গে এমদাদুল হক নূর বলতে গিয়ে জানান, সওগাত, মোহাম্মদী প্রভৃতি মুসলিম সম্পাদিত পত্রিকাতেও বিজ্ঞাপনের প্রাচুর্য ছিল না। তবুও পত্রিকাগুলি টিকে ছিল। কীভাবে? এখন আমরা সেই মানের পত্রিকা করতে পারছি না কেন? আসল সমস্যা অন্য জায়গায়। এখনকার মুসলিম সমাজে এলিট ক্লাস তৈরি হলেও সংস্কৃতি চর্চার জায়গাটা নেই। আর্থিক সংগতিসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু তাদের রয়েছে সাংস্কূতিক মননের অভাব। আমরা আমাদের চেতনা ও জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে পারিনি। প্রতিভার কদরও আমরা করতে শিখিনি। আমাদের সমাজের মানুষরা প্রতিভাবান লেখকদের যোগ্য মর্যাদা দেয় না বলেও তিনি অভিযোগ করেন। সংস্কৃতি জগতের মানুষদের আর্থিক অনটন ও অবহেলার শিকার হতে হয়। এ ব্যাপারে নতুন গতি সম্পাদকের উদাত্ত আহবান, সমাজে যেসব প্রতিভাবান মানুষ ভালো সাহিত্য রচনা করতে পারেন, লিখতে পারেন, তাঁদের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে।
প্রাবন্ধিক ও প্রাক্তন সাংসদ মইনুল হাসান কথা-প্রসঙ্গে বলেন, মুসলিম সমাজকে আরও দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে সংস্কৃতির আঙিনায়। সংখ্যায় এ বাংলার মুসলিমরা কম নন, গড়ে ইউরোপের চারটি দেশের সমান। তাহলে সমস্যা কোথায়? একসঙ্গে সবাই মিলে চর্চার জগতে এগিয়ে আসলেই এই সাংস্কূতিক শূন্যতার সমাধান করা যাবে বলে তিনি মত ব্যক্ত করেন। সভায় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পার্থ সেনগুপ্ত, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার আমজাদ হোসেন, প্রাবন্ধিক আবদুর রাউফ, মুজিবর রহমান প্রমুখ।

২০১৮-র ডিসেম্বরে প্রয়াত সাহিত্যিক ওয়ালে মোহাম্মদকে নিয়ে ‘আলিয়া’ পত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্রটির মোড়ক উন্মোচন হয় এদিন। ওয়ালে মোহাম্মদের পরিবারের পক্ষ থেকে স্ত্রী, ভাই ও ভাইঝি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ভাইঝি টুলটুলি খাতুন সাহিত্যচর্চায় ওয়ালে মোহাম্মদের নিষ্ঠা ও প্রতিভার কথা আলোচনা করেন। তাকে নিয়ে ওয়ালে মোহাম্মদ যে অধ্যাপক বা লেখক হওয়ার মতো বড় স্বপ্ন দেখতেন, সে কথাও টুলটুলি স্মৃতিচারণায় উল্লেখ করেন। সাহিত্য নিয়ে আলোচনা ছাড়াও আইনজীবী শামিম আহমেদকে এদিন সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। মাদ্রাসা থেকে মাধ্যমিক পাশ পড়ুয়াদের গ্রামীণ ডাক সেবকের পরীক্ষাতে বসতে দিচ্ছিল না ভারতীয় ডাক বিভাগ। অনুমতি সংক্রান্ত মামলায় অবশেষে মাদ্রাসার জয় হয়। মাদ্রাসার ছাত্রদের হয়ে লড়েছিলেন আইনজীবী শামিম আহমেদ। একই লড়াইয়ের অপর সৈনিক মুহাম্মদ জিম নওয়াজকেও সম্মানিত করা হয় এই অনুষ্ঠানে। বাঙালি সমাজ-সংস্কৃতির ইতিবৃত্ত ­ প্রাক-তুর্কি আগমন---বিষয়ক একটি সেমিনারও এই সভায় আয়োজিত হয়। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only