বৃহস্পতিবার, ১১ জুলাই, ২০১৯

এই স্কুলে প্লাস্টিক বর্জ্যই ফি!


নির্জন প্রকৃতির বুকে বাঁশ ও মাটির ছোট ছোট কুড়ে ঘর। সেখানে চলছে স্কুল। ঘণ্টা বাজতেই লাইন করে পড়ুয়া স্কুল কম্পাউন্ডে ভিতরে ঢুকছে। স্কুলব্যাগ ছাড়াও তাদের সবার হাতেই একটা করে প্লাস্টিক থলে। কারণ জিজ্ঞাসা করতেই জানতে পারা গেল, ওই থলেতে রয়েছে প্লাস্টিকবর্জ্য, যা প্রতি সপ্তাহেই ফি হিসাবে স্কুলকে দিতে হয়। ভাবছেন হয়তো, এ আবার কেমন স্কুল। অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এটাই সত্যি। আমাদের দেশেই রয়েছে, এমন এক আজব স্কুল। যেখানে টাকা নয়, স্কুল ফি হিসাবে প্লাস্টিক বর্জ্য নেওয়া হয়।অসমের গুহাটির পামোহিতে রয়েছে এই স্কুল। নাম 'অক্ষর'


২০১৬ সালে মাজিন মুক্তার ও তাঁর স্ত্রী পারমিতা শর্মার উদ্যোগে গড়ে ওঠেছে এই স্কুলটি। দুই প্রতিষ্ঠাতা মাজিন ও পারমিতা জানিয়েছেন, এই বেশিরভাগ পড়ুয়াই দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা।সেখানকার বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর অভিভাবকই দিনমজুর।সুতোরাং, স্কুল ফি দেওয়ার মত সামর্থ্য তাদের নেই। তবে, স্কুল ফি হিসাবে প্লাস্টিকবর্জ্য নেওয়ার কারণ কি?সে প্রশ্নে, তারা বলেন, পরিবেশ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতেই তারা এই উদ্যোগ নিয়েছেন।যখন বিশ্বের তাবড় তাবড় রাষ্ট্রের প্রধানরা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে চিন্তিত, তখন সময় ব্যয় না করে সারাধণ মানুষ হয়ে দুনিতে নজির গড়ছেন মাজিন ও পারমিতার মত মানুষরা।  


মাজিন বলেন, স্কুলটি গড়ার আগে এই এলাকা ও বাসিন্দাদের ওপর জরিপ করতে গিয়ে দেখা যায়, শীতকালে বাসিন্দারা প্লাস্টিক পুড়িয়ে আগুন পোহান।তাতে দূষণ আরও বেশি মাত্রায় ছড়ায়। তাতে এলাকার বাচ্চাদের শরীরের ঢুকে পড়ছিল প্লাস্টিকের বিষাক্ত ধোঁয়া। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্লাস্টিক ব্যবহার নিয়ে সচেতনা ছড়াতে গিয়েই বিষয়টি মাথায় আসে। বেতন হিসাবে নেওয়া প্লাস্টিকগুলিকে একত্রিত করে পুর্ণব্যবহারযোগ্য করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ছাত্রছাত্রীদের। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে প্লাস্টিক রিসাইক্লিং-এর বিষয় সচেতনতা বাড়ছে।

 ২০১৩ সালে নিউইর্য়ক থেকে ভারতে একটি অভিনব স্কুল গড়ার প্রকল্প নিয়ে দেশে ফিরে ছিলেন মাজিন।সেই সময় টাটা ইন্টিটিউট অব সোশ্যাল সাইন্সের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী পারমিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় মাজিনের।স্নাতকত্ত্বর স্তরের পড়াশুনা শেষে করে শিক্ষাজগৎ নিয়ে কিছু করার চেষ্টা করছিলেন।দুজন একত্রিত হতে শুরু হয়ে তাদের অভিনব স্কুল গড়ার সংগ্রাম।



পারমিতা অসমের বাসিন্দা হওয়ায় স্থানীয়দের চাহিদা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল। তাই উদ্যোগটি নিতে তাদের খুব একটা গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করতে হয়নি।পারমিতা জানিয়েছেন, স্থানীয়দের সম্পর্কে গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করার তিন বছর পর ‍'অক্ষর'-এর পথ চলা শুরু হয়। আমরা এই স্কুলে প্রচলিত শিক্ষার সঙ্গে বৃত্তিমূলক শিক্ষার মিলন ঘটিয়েছি। সাধারণ আর পাঁচটা স্কুলের মত এখানে কোনও গ্রেডেশন বা শ্রেনি বিভাজন ব্যবস্থা রাখা হয়নি।স্কুলে ভর্তির হওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের মেধা দেখা হয়। সেই অনুযায়ী, শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হয়।৪ থেকে ১৫ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েরা এখানে একই ক্লাসে একসঙ্গে পড়াশোনা করে।প্রথমদিকে, ২০জন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে স্কুলটি শুরু হলেও এখন  তা বেড়ে একশো ছাড়িয়েছে। গতানুগতিক শিক্ষার পাশাপাশি, গান, নাচ, আঁকা, বাগানসজ্জা, সূচিকর্ম, প্রসাধনী তৈরি, কারপেন্টারি, সোলার প্যানেলিং, জৈব খামার তৈরি, ইলেকট্রনিক্স, বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য কারার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।


মাজিন জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের বই-খাতা, ইউনির্ফমের খরচ স্কুলই বহন করে।সীমিত খরচ থাকায় গোষ্ঠীর মাধ্যমে এখানে পঠনপাঠন চালানো হয়।শিক্ষার্থীদের হাতে তৈরি বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করে স্কুলের খরচ বহন করা হয়। এছাড়া বড়রা ছোটদের শিক্ষা দেয়।এর জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের একটি পারিশ্রমিক দেয়। সেই পারিশ্রমিকই আবার স্কুলের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বই,খাত,পেন্সিল, ইউনিফর্ম, খেলনা কেনার খরচে ব্যয় করা হয়। মাজিন বলেছেন, এই ভাবে সৃজনশীল শিক্ষার মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণের চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা।তাই আগামী তারা এই ধরণের আরও একশো স্কুল খোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only