বৃহস্পতিবার, ৪ জুলাই, ২০১৯

এক সপ্তাহে জোড়া বিস্ফোরণ বীরভূমেঃ এবার গ্রামীণ হাসপাতালের পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে



দেবশ্রী মজুমদার, লাভপুর,০৪ জুলাই:  এক সপ্তাহে জোড়া   বিস্ফোরণ বীরভূমে। এবার অকুতস্থল লাভপুরের দ্বারকা পঞ্চায়েতের মিরবাঁধ গ্রাম। সেখানে গ্রামীন হাসপাতালের পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে মজুত করা বোমা ফেটে উড়ে গেল ছাদ। বিস্ফোরণের তীব্রতা এত  ও বেশি ছিল যে ওই কোয়ার্টারের দুটো দেওয়াল পুরোপুরি বিধ্বস্ত। ওই বিল্ডিংয়ের বাকি অংশ ভেঙে পড়েছে। বাকি দুটি পরিত্যক্ত কোয়ার্টারের অবস্থাও খারাপ এই বিস্ফোরণের জেরে।  বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে পাশের বাড়ির ছাদ ভেঙে ঘুমন্ত অবস্থায় গায়ে পরে আহত হয়ে এক ব্যক্তি। ছাদ থেকে পড়ে যায় সিলিং ফ্যান। এলাকা জুড়ে তীব্র আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই হাসপাতালের মধ্যে অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্র। যেখানে কচিকাঁচাদের ভিড় হয় প্রতিদিন সকালে। অকুস্থল থেকে প্রায় পঞ্চাশ ফুট দূরে অর্থাৎ নাকের ডগায় পুলিশের ‍ক্যাম্প। সকালে বিস্ফোরণ হলে অনেক শিশু মারা পড়ত সে কথা ভেবেই আতঙ্কিত এলাকার মানুষ। বিস্ফোরণের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার সকালে অনেক অজানা লোক অকুতোস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করে। যদিও, পুলিশ থাকায় তারা সফল হয়নি, বলে জানা গেছে।

ঘটনার জেরে বীরভূম যে বারুদের স্তুপের মধ্যে তার প্রমান মিলল আরো একবার। বিস্ফোরণ স্থল থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে হাসপাতালের গা ঘেষেই রয়েছে পুলিশ ক্যাম্প। এদিকে বিস্ফোর পর থেকেই ঘটনায় রাজনৈতিক চাপান উতোর শুরু হয়েছে তৃণমূল বিজেপি মধ্যে। জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে যেমন তদন্ত শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিকর্তা কে রিপোর্ট পাঠিয়েছে জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক। তবে পুলিশ ক্যাম্পের পাশে এহেন বিস্ফোরণ ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ বিক্ষোভ করে লাভপুর থানার ওসি চয়ন ঘোষের অপসারণের দাবি জানায়। জেলা প্রশাসনের তরফে ফরেনসিক দলের সাহায্য চাওয়া হয়েছে।

বুধবার ভোর রাতে হওয়া বিস্ফোরণে উড়েছে লাভপুরের দ্বারকা গ্রামীন হাসপাতালের কোয়ার্টারের দুটি ঘরের ছাদ। শুধু তাই নয়, পাশে রয়েছে একটি অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্রেও। পুলিশ ক্যাম্প থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিত্যক্ত কোয়াটার রয়েছে। সেই কোয়ার্টার গুলির একটি বিপুল পরিমাণ বোমা মজুত ছিল।  বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে আশপাশের বাড়ির ছাদে, উঠানে গিয়ে কংক্রিটের টুকরো পড়ে থাকতে দেখা যায়। প্রতিবেশী মেহেরজাহান শেখ বলেন, " নিজের ঘরে ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ রাত ২.৪৫ নাগাদ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। বাড়ির ছাদ ভেঙে ফ্যান ছিড়ে পড়ল পায়ে। প্রা বাঁচাতে কোন মতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। তখন চারিদিকে এত ধোঁয়া আর বারুদ গন্ধে দমবন্ধ হয়ে আসছে। হাসপাতালের কোয়ার্টার বোমা ফেটে এমন কান্ড হল। অথচ পাশেই পুলিশ ক্যাম্প। আমরা আতঙ্কে আছি।"

উল্লেখ্য, ২২ এপ্রিল ২০১৭ সালে বালিরঘাটের দখলদারিকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষ হল লাভপুরের মীরবাঁধ ও দরবারপুর গ্রামে। সেই সময় বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছিল ১১ জনের। তারপর থেকে এই এলাকার দ্বারকা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ছিল পুলিশ ক্যাম্প। শুধু তাই নয়, ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে পাড়ুই থানার সাত্তোর কসবা প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে  প্লাস্টিকের জারে রাখা তিনশোর বেশি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। সেখানেও এক পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে বোমা রাখা ছিল।

এদিন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় বিশাল পুলিশ বাহিনী। সকলেই জানাচ্ছেন এলাকায় লড়াই মলত রাজনৈতিক দুটি গোষ্ঠীর। তাদের কোনো একপক্ষের কাজ এটা তা নিয়ে সন্দেহ নেই কারোরই। এই ঘটনার পরই মুহূর্তে রাজনৈতিক রঙ লেগে যায়। এই বিস্ফোরণ নিয়ে লাভপুরের বিধায়ক তথা বিজেপি নেতা মনিরুল ইসলাম সরাসরি তৃণমূলের জেলা সহ সভাপতি মান্নান হোসেনকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। তিনি বলেন, "তৃণমূলের মান্নান হোসেন তিন জন মস্তান নিয়ে এলাকায় রাজত্ব চালায়। তারা হল আজিজুল মিরাজ, আহাদুর শেখ এবং সোয়েব শেখ। এরাই বালি ঘাটের দখলদারি চালায়। ঐ গ্রামের পুলিশ ক্যাম্পেই এই সব দুস্কৃতিদের ওঠা বসা। তাই পুলিশ চোখের সামনেই হাসপাতালে ঘর বোমা রাখার আঁতুড়ঘর করেছে ওরা। এখন অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে সাধু সাজলে হবে? এন আই এ তদন্ত করলে প্রকৃত সত্য প্রকাশ্যে আসবে।"

মনিরুলের অভিযোগের প্রত্যুত্তরে জেলা তৃণমূলের সহ সভাপতি মান্নান হোসেন বলেন,"মনিরুল ইসলাম স্থানীয় ডালু শেখ, রেনু শেখ দের নিযে এলাকায় সন্ত্রাস তৈরি করতে বোমা মজুত করেছিল।" স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিস্ফোরণের খবর পেয়ে জেলা স্বাস্থ্য দফতর লাভপুরের বি এম ও এইচ বুদ্ধদেব মুর্মুকে তদন্তের নির্দেশ দেন। জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক হিমাদ্রি আডি বলেন, "আমরা জেলা থেকে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছি। স্বাস্থ্য ভবনে অধিকর্তাকে রিপোর্ট পাঠাচ্ছি। ইতিমধ্যেই ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে থানায় অভিযোগ জানাচ্ছি।"

উল্লেখ্য, দিন দু'য়েক আগেই বিস্ফোরণে উড়ে যায় মল্লারপুরের মেঘদূত ক্লাবের একাংশ। ওই ঘটনার তদন্তে নামে ফরেনসিক দল। এরমধ্যে ফের বিস্ফোরণ। তবে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে লাগোয়া পুলিশ ক্যাম্প থাকা সত্বেও এত বড় বিস্ফোরনের ঘটনায প্রশ্নের মুখে পুলিশের ভূমিকা। জেলা পুলিশ সুপার শ্যাম সিং বলেন, "পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে। কেন এমন হল খতিয়ে দেখা হচ্ছে।"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only