মঙ্গলবার, ২৭ আগস্ট, ২০১৯

বিড়ি বাঁধা কিশোরী থেকে শারমিনের উত্তরণ গবেষণায়

স্বামী মাসুদ রানার সঙ্গে শারমিন সুলতানা
সেখ কুতুব উদ্দিন
প্রবল ইচ্ছাশক্তির সামনে হার মানে সব প্রতিবন্ধকতা। শারমিন সুলতানা তা আরও একবার প্রমাণ করলেন। আর্থিক সংকট থামাতে পারেনি তাঁর পড়াশোনার ইচ্ছাকে। বিড়ি বেঁধে সংসারের কাজ সামলেও তিনি আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলায় টপার হন। বর্তমানে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু করেছেন গবেষণার কাজ। একেবারে প্রান্তিক মানুষদের দিনলিপি তাঁর গবেষণার অন্যতম বিষয়। তিনি নিজেও সমাজের সেখান থেকেই উঠে এসেছেন। সেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সুরঞ্জন মিদ্দের তত্ত্বাবধানে চলছে শারমিনের গবেষণা।
মুর্শিদাবাদের অরঙ্গাবাদের প্রত্যন্ত গ্রাম বেলতলার বাসিন্দা মুসাম্মৎ শারমিন সুলতানা। সংসারের নিত্য অনটনে কেটেছে তাঁর শৈশব, কৈশর, তারুণ্য। গরিব পরিবারের ছেলে-মেয়েরা একটু বড় হলেই বুঝে যায় তাদের আবদার করতে নেই। একটু বড় হতেই সারমিন সংসারের কাজে মাকে হাতে হাতে সাহায্য করতে। আব্বা সামসুল আলম ও মা শেফালি বেগমের সঙ্গে বিড়ি বেঁধে সংসারে কিছুটা স্বস্তি জোগানোর চেষ্টা করতেন। মাধ্যমিকে পেয়েছিলেন ৬৬ শতাংশ নম্বর। উচ্চমাধ্যমিকে পান ৭০ শতাংশ। ভর্তি হন অওরঙ্গাবাদ কলেজে। সেখান থেকে স্নাতক হন। উচ্চশিক্ষার জন্য আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশিকা দেন। সেখান থেকে ‘ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট’ হন।
একসময় শারমিন চেয়েছিলেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে। সেখানেও তিনি সফল। এখন তিনি চাইছেন তাঁর মতো সামাজিক অবস্থানের ছেলেমেয়েরা যেন এমন সুযোগ পায়। তিনি বলেন, এ কথা ঠিক যে আগের থেকে সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা খানিকটা ভালো হয়েছে। তবে সচেতনা সেভাবে আসেনি। ফলে বহু মেধাবীকেই কম বয়সেই নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসারে জুড়ে যেতে হয়। ফলে অকালে ঝরে পড়ে তাদের স্বপ্ন।
 শারমিন সুলতানা নিজেই একজন প্রান্তিক পরিবারের সদস্য। তাই আদিবাসী, সাঁওতালি, মুসলিম এবং পিছিয়েপড়া পরিবারের মানুষজনের জীবনধারণ নিয়েই শুরু হয়েছে তাঁর গবেষণা। শারমিনের বক্তব্য ‘আমিও একজন প্রান্তজন, আমার মতো যাঁরা আছেন, তাঁরাও যেন অন্তত এই চেষ্টাটা করেন।'
 তাঁদের জীবিকা প্রসঙ্গে বলতে ইতস্তত করলেও অবশেষে সারমিন বলেন, সারাবছর বিড়ি বাঁধার কাজ এবং সাংসারিক কাজেও সহযোগিতা করতে হত। এরজন্য পড়াশোনাতেও কিছুটা ব্যাঘাত হত তাঁর। মাধ্যমিকের আগে টানা দুই মাস পড়ে ৬৩ শতাংশ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন শারমিন। উচ্চমাধ্যমিকে ৭০ শতাংশ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে অওরঙ্গাবাদ কলেজে বাংলা অনার্সে ভর্তি হন। ২০১৫ সালে ৫৮ শতাংশ নম্বরে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্নাতকোত্তর কোর্সে ভর্তি হন শারমিন। ২০১৭ সালে ৭৩ শতাংশ নম্বর পেয়ে আলিয়া থেকে ‘প্রথম শ্রেণিতে প্রথম’ হওয়ার পাশাপাশি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড ডিগ্রিও সেরে নেন।
শারমিনের বক্তব্য, সব সময় একাগ্রতার সঙ্গে পড়াশোনা করি। আব্বা মায়ের পাশাপাশি স্বামী অওরঙ্গাবাদ কলেজের অধ্যাপক মাসুদ রানার কাছ থেকে সবরকম সহযোগিতা পেয়েছি। তিনি আরও বলেন, আমার সব সময় ইচ্ছা ছিল বাড়ির জন্য কিছু করব। এখন আমার স্বামীও আমাকে এগিয়ে দেওয়ার বিষয়ে মানসিক ও আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছেন। এই অদম্য ইচ্ছাশক্তির জন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও শারমিনকে সম্মানিত করেছেন।
 শারমিনের বক্তব্য, মুর্শিদাবাদের অওরঙ্গাবাদের প্রত্যন্ত গ্রাম বেলতলা থেকেই বড় হয়েছি। আগের তুলনায় এখন এলাকার মানুষের স্বচ্ছলতা এসেছে। আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে আগামীতে তাঁর ইচ্ছা অধ্যাপনার সঙ্গে নিজেকে নিযুক্ত করা। পাশাপাশি গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করা। পড়াশোনার পাশাপাশি গ্রামের ছেলে-মেয়েদের স্কুলছুট রোখা ও পড়াশোনায় নিযুক্ত রাখার জন্য নিজ উদ্যোগে গ্রামে একটি লাইব্রেরি তৈরির ইচ্ছা রয়েছে শারমিনের। শারমিনের মত, অনেকে গ্রাম ছেড়ে ভিনরাজ্যে কাজে যান, মেয়েরা অল্প বয়সেই পড়াশোনা ছেড়ে বিড়ি বাঁধার কাজে লিপ্ত হন। আবার অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় অনেকের। তাই গ্রামের ছেলে মেয়েরা যাতে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে, তার প্রচেষ্টা চলবে বলে জানান শারমিন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only