মঙ্গলবার, ২৭ আগস্ট, ২০১৯

এনআরসিতে বাদ পড়া ৪১ লক্ষ মানুষের ৮৯ শতাংশ অবসাদে: সমীক্ষা


পুবের কলম: কেমন আছেন, কীভাবে কাটাচ্ছেন এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়া ৪১ লক্ষ ১০ হাজার ১৬৯ জন। তাদের উপর সমীক্ষা করেছে দেশের প্রখ্যাত এক সমীক্ষা সংস্থা ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন এগেইনেস্ট টর্চার বা এনক্যাট। বাদ পড়াদের মানসিক অবস্থা এখন কেমন– তা জানার জন্য ফিল্ড সার্ভে করা হয় এই সংস্থার পক্ষ থেকে। অসমের কামরূপ, গোয়ালপাড়া ও বকসা জেলায় গতমাসে এই সমীক্ষা করা হয়। সেই সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ পেয়েছে গত সপ্তাহের শেষে। রিপোর্টের শিরোনাম, অসম ‘এনআরসি, ৪০ লক্ষ মানুষের মানসিক নির্যাতন, আঘাত ও অপমান।’
৮৯ শতাংশ মানুষ সমীক্ষকদের বলেছেন, তাঁরা চূড়ান্ত অবসাদে ভুগছেন। তাঁদের আতঙ্ক রয়েছে, যেকোনও সময় দেশ থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে। তাঁদের ভয়, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে কোনও ডিটেনশন সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বেশিরভাগ মানুষের ভার না আইনি লড়াই করার জন্য তাঁদের টাকা কোথায়? ট্রাইব্যুনালে হাজিরা দেওয়া, গৌহাটি হাইকোর্টে মাথা ঠুকতে যাওয়া, না হলে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার মতো সামর্থ্য তো তাঁদের নেই। এই ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছেন তাঁরা। নয় শতাংশ মানুষ ভয়ে রয়েছে, তবে তাঁরা ততটা আতঙ্কিত নয় বা মানসিক অবসাদে নেই। আর এক শতাংশ মানুষদের মনে ভয় আছে, তবে তা সামান্যই। তবে প্রত্যেকেই ভীত এনআরসি থেকে নাম বাদ পড়া নিয়ে।
৮৯ শতাংশ মানুষ অর্থাৎ প্রায় ৩৭ লক্ষ মানুষ যাঁরা চরম আতঙ্কে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উপসর্গ ধরা পড়েছে নীদ্রাহীনতা, ক্ষুধামান্দ্য, স্মৃতিবিভ্রম, চিন্তা ও কাজে অসামঞ্জস্য আর তার সঙ্গে রয়েছে লজ্জা ও একঘরে হয়ে পড়ার ভয়।
এনক্যাটের কো-অর্ডিনেটর সুহাস চাকমা জানান, মাঝারি ধরনের মানসিক অবসাদের মধ্যে রয়েছে ৪ লক্ষ ১১ হাজার মানুষ। আর ৮৯ শতাংশ অর্থাৎ ৩৭ লক্ষ মানুষের মধ্যে সকলেই এনআরসি তালিকা ছুট হয়ে পড়ায় অপমানিতবোধ করছেন। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ৩১ জন তালিকাছুট ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছেন চরম মানসিক অবসাদে ভুগতে থাকার পর।
সমীক্ষার রিপোর্টে প্রথম ৮৮ শতাংশ মানুষ পরিবার থেকে আলাদা হয়ে পড়ার ভয়ে দারুণভাবে উৎকণ্ঠায়। ৮১ শতাংশ এূন থেকে ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন যে তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। আর ৫৫ শতাংশ মানুষ মানসিক আঘাতগ্রস্ত হয়ে ডিপ্রেশনে চলে যেতে বসেছে। সমীক্ষকদের মতে, এনআরসি প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া। এই মানসিক নির্যাতনকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিচার করলে মনে হবে অসমের এনআরসি অত্যন্ত চমকপ্রদ নিষ্ঠুর এক কর্মসূচি। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের বিদেশি খোঁজা ও বিদেশি খেদাওয়ের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে শারীরিক কষ্ট অপেক্ষা মানসিক নির্যাতন, হতাশা, অবসাদ, একাকিত্ব, অসামঞ্জস্য ও আত্মকেন্দ্রিকতার শিকার হয়ে পড়ছে বেশি। এই ৮৯ শতাংশ মানুষ সকলেই তাঁদের নাগরিকত্ব প্রমাণপত্র দলিল দস্তাবেজ তথ্য সবকিছুই জমা দিয়েছেন। ইতিপূর্বে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল তাঁদের নাগরিক ঘোষণাও করেছে। তবুও এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি থেকে তাঁরা বাদ পড়েছে। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে থেকে তারা এই দেশের নাগরিক সেসব তথ্যপ্রমাণ জমা দেওয়ার পরও এনআরসিতে নাম ওঠেনি তাঁদের। ১৯৮৫ সালের অসম চুক্তি অনুযায়ী তাঁরা নাগরিক গণ্য হওয়ার কথা।
এনক্যাটের সমীক্ষকরা আত্মঘাতী নাগরিকদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, প্রবল উৎকণ্ঠা, হতাশা ও অবসাদের কারণে চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা। এই সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ পাওয়ার পর অসমের বাইরের মানুষ কিছুটা জানতে পারবেন। তালিকাছুটরা কেমন অবস্থায় রয়েছেন, আর কী ভয়াবহ অবস্থা অপেক্ষা করছে তাঁদের জন্য।
পড়ুন- সব রাজ্যে চালু হচ্ছে এনপিআর, আইনি মহল বলছে-এটা আসলে এনআরসি-র ভিত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only