বৃহস্পতিবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৯

স্বাগত বাংলার মব লিঞ্চিং বিল, পড়ুন আহমদ হাসান ইমরানের কলাম


আহমদ হাসান (ইমরান)

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার মব লিঞ্চিং রুখতে একটি কঠোর আইন প্রণোয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  এজন্য তিনি অবশ্যই অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য।  এর আগে একমাত্র রাজস্থান সরকার এই ধরনের একটি আইন পাশ করেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা যে আইনটি পাশ করতে চলেছে তা আরও কঠোর। 

ভারতে যেভাবে জাতি বিদ্বেষ নিয়ে মব লিঞ্চিং বেড়ে চলেছে তা আন্তর্জাতিক মহলেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।  মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলের তরফে অসংখ্যবার দাবি তোলা হয়েছে– প্রকৃতই যদি মব লিঞ্চিং রুখতে হয় তাহলে কঠোর আইন প্রণোয়ন করা হোক।  কিন্তু দেখা যাচ্ছে মানুষকে গণপ্রহারে বা পিটিয়ে মারার পর প্রতিটি ঘটনায় যে দু-চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল– তাদেরও হয় মুক্তি দেওয়া হচ্ছে কিংবা জামিনে তারা ছাড়া পাচ্ছে। অনেক সময় আবার নেতা মন্ত্রীরা গিয়ে তাদের অভ্যর্থনা করছেন। যেমন করেছিলেন মন্ত্রী জয়ন্ত সিনহা। তিনি জামিনে মুক্ত অভিযুক্তদের ‘বীরত্বের’ স্বীকৃতি স্বরূপ প্রত্যেকের গলায় মাল্যদানও করেছিলেন। এমনকী উত্তরপ্রদেশে একজন পুলিশকর্তাকে উগ্রবাদীদের নেতৃত্বে জনতা হত্যা করার পর তার চিহ্নিত ঘাতকরা সম্প্রতি জামিন পেয়ে গেছে। আর কট্টরপন্থী উগ্রবাদী সংগঠনগুলির নেতা ও সমর্থকরা কারাগারের গেটে তাদের ফুলমালা দিয়ে সম্বর্ধনা জানিয়েছেন। এতেই বোঝা যায় যে– মব লিঞ্চিং-এর অপরাধীরা একরকম এখন নির্ভয়ে। তারা জানে– যে বিশেষ দলের/অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে তারা সম্পর্ক যুক্ত এবং আর যেহেতু সেগুলি শাসকদলের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজেই তাদের পুলিশ প্রশাসন বা আইন-আদালতকে তোয়াক্কা করার প্রয়োজন নেই। যে সকল আইনি ধারা এই ঘাতকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়– তাতে তাদের খালাস এবং জামিন পাওয়া সময়ের অপেক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। 


কাজেই মব লিঞ্চিং বা গণপ্রহার রুখতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রস্তাবিত আইনটি অবশ্যই সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করবে। ইদানীং আবার গণপ্রহারে এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। তা হল– ছেলেধরা সন্দেহে নিরাপরাধ মানুষকে টার্গেট করা। একাজে সহযোগির ভূমিকা নিচ্ছে হোয়াটস অ্যাপ সহ সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম। ফেক নিউজ-এর মাধ্যমেও প্ররোচনা দেওয়া হচ্ছে মানুষ হত্যায়। 
তাই এই প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার আইনটি নিয়ে আসছেন। গুরুত্ব পূর্ণ কথা হচ্ছে পশ্চিমবাংলার লিঞ্চিং বিরোধী আইনটি কিন্তু সারা ভারতের জন্য মডেল হতে পারে। আর এই আইন ঠিকমতো প্রচারিত হলে তা যে এই ধরণের নির্মমতার প্রতিরোধক হয়ে দাঁড়াবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। 
মঙ্গলবার ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল প্রিভেনশন অফ লিঞ্চিং বিল ২০১৯’ বিধানসভায় পেশ করা হয়। সম্ভবত ৩০ আগস্টের মধ্যে এই বিল পাশ হয়ে যাবে।
এই বিলে কী রয়েছে তা একবার দেখে নেওয়া যেতে পারে। 
মব লিঞ্চিং-এর ফলে যদি কেউ মারা যায় তাহলে দোষীদের আজীবন কারাবাস এবং ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হবে। আর যদি এই ধরণের হামলায় কেউ আহত হয়– সেক্ষেত্রে অপরাধীদের ৩ বছর জেল আর ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে এই বিলে। 

সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ালেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে যারা এই নিন্দাজনক কাজ করবে– তাদের ১ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত মাশুল গুনতে হবে। মব লিঞ্চিং-এর মতো ঘটনাকে প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে কলকাতা তথা সমস্ত জেলায় পুলিশের উচ্চ পদস্থ আধিকারিককে নোডাল অফিসার নিয়োগ করা হবে।
  এছাড়া লিঞ্চিং-এ দোষীদের কেউ যদি বাঁচানোর চেষ্টা করে তাহলে বিল অনুযায়ী তাদেরও সাজা হবে। দোষীকে গ্রেফতারি থেকে বাঁচানোর জন্য কিংবা অন্যভাবে কেউ সহায়তা করলে তাঁকে ৩ বছর পর্যন্ত কারাগারে থাকতে হবে। আর এই ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের ১ লক্ষ টাকা করে জরিমানা দিতে হবে। 
আর যদি কেউ সাক্ষীদের ভীতি প্রদর্শন করে– তাদের ৫ বছর পর্যন্ত জেল আর ২ লক্ষ টাকা জরিমানা হবে।
মব লিঞ্চিং বা গণপ্রহারের সংজ্ঞাও এই বিলে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। যদি ২ জন ব্যক্তি মিলে কাউকে প্রহার করে তবে তা মব লিঞ্চিং বলে গণ্য হবে। 
আশা করা যায়– এই বিলটি আইনে পরিণত হলে গণপ্রহারের কুশীলব বা যারা দলিত ও সংখ্যালঘুদের আক্রমণ করার ইচ্ছা পোষণ করে তারা হয়তো নিবৃত্ত হবে।
  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only