শুক্রবার, ৩০ আগস্ট, ২০১৯

আলমোড়ার ব্রাহ্মণ পরিবারে ধর্মান্তর, পাকিস্তানের ‘দ্য বেগম’ হওয়ার দিলচসপ কাহানি


‘লাভ জেহাদ’ শব্দ দু’টি সেসময় আবিষ্কার হয়ে থাকলে মস্ত বড় উদাহরণ হিসেবে পেশ করতে পারত কট্টরবাদীরা। কুমাউনের পন্থ ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে মেয়েদের ধর্মান্তরণের ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া যে হয়নি তা নয়– তবে তা ছিল এলাকাভিত্তিক। হিন্দুধর্ম থেকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ নিয়ে একঘরে করে দেওয়া হয়েছিল এই ব্রাহ্মণ পরিবারকে। পরে সেই পরিবারের আধুনিক কন্যা ইসলামধর্ম গ্রহণ করে। ক্ষুব্ধ কুমাউন অঞ্চল এই ধর্ম পরিবর্তনের ঘটনায় রীতি অনুযায়ী ‘ঘটাশ্রাদ্ধ’ করে তাদের শুধু বিধর্মী নয়– ‘মৃত’ বলেও ঘোষণা দেয়। ব্রাহ্মণ পরিবারে ধর্ম পরিবর্তন– ইসলামধর্ম গ্রহণ কেবলমাত্র বিয়ের জন্য এবং পাকিস্তানের ‘ফাস্ট লেডি’ বনে যাওয়া নিঃসন্দেহে এক চিত্তাকর্ষক ঘটনা বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান বাঁটোয়ারার সময়।
কুমাউনের আলমোড়ার পন্থ সমাজের ধর্মান্তরিত তারা দত্ত পন্থ পরিবারের শিক্ষিতা কন্যা শীলা আইরিন মার্গারেট পন্থ ইসলামধর্ম গ্রহণ করেন। নতুন নাম রাখা হয় গুল-এ-রাণা। পরবর্তীতে গুল-এ-রাণা ভাগ্যের জোরে পাকিস্তানের ফাস্ট লেডি হয়ে যান দেশভাগের পর। তাঁর স্বামী হরিয়ানার নওয়ার পরিবারের লিয়াকত আলি খান পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আইরিন তখন রাণা লিয়াকত আলি। তাঁর জীবনী নিয়ে বাজারে বেশ কয়েকটি বই রয়েছে। তার মধ্যে প্রসিদ্ধ পেঙ্গুইনের ‘দ্য বেগম’– লেখিকা দীপা আগরওয়াল ও তহমিনা আজিজ আইয়ুব এবং ইরা পাণ্ডের হিন্দি বই ‘দিদি’। কয়েকজন লেখক রয়েছেন যাঁর আইরিনের সমসাময়িক। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রাণার জীবনের দিলচশপ কাহিনি বর্ণনা করেছেন তাঁরা।
আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছিল এই পরিবারে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা– বাটার টোস্টের নাশতা খাওয়া– গান শেখা– মেয়েদের সাইকেল চালানো সবকিছুতেই রপ্ত হয়ে উঠেছিল এই ধোতী ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলেমেয়েরা। আইরিন মেয়েবেলা থেকেই স্বাধীনচেতা ও দুঃসাহসি ছিলেন। ১৯২৭ সালের ভারতের হিন্দু পরিবারের মেয়ে সাইকেল চালাবে এটা ছিল বিরল ঘটনা। তাছাড়া কুমাউনের অঞ্চলে দরিদ্র আদিবাসীদের মধ্যে খ্রিস্টধর্মে আশ্রয় নেওয়ার রেওয়াজ থাকলেও বনেদি ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলেমেয়েদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের ঘটনা ছিল নজিরবিহীন। আইরিনের ঠাকুরদাদা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আইরিনের পড়াশোনা লখনউ-এর লালবাগ স্কুলে। পরে বিখ্যাত আইটি কলেজে। স্বাধীন চিন্তা ও মুুক্তবুদ্ধির জন্য প্রসিদ্ধ এই কলেজে পড়াশোনা করেছেন ইসমত চুঘতাই কুরতলেন হায়দার– রাশিদ জাঁহা– আতিয়া হোসেনের মতো বিদ্বজ্জনরা। কলেজের প্রভাব আইরিনের মধ্যেও দেখা যায়। যে হযরতগঞ্জের নাম বদল করলেন বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ সেখানেই আড্ডা জমতো কলেজ ছাত্রীদের। জর্জেট পরা আইরিন নিয়মিত আসতেন হযরতগঞ্জে ঘুরবার উদ্দেশ্যে। অপর*প সুন্দরী ছিলেন আইরিন। লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পড়ার সময় তাঁর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ডাইনামো ইন সিল্ক’। সিল্কের শাড়িতে আরও সুন্দর দেখাতো বলে। ব্লাক বোর্ডে প্রায় সময়ই ছেলেরা আইরিনের ছবি এঁকে রাখত ক্লাস শেষ হওয়ার পর।
লিয়াকত আলির সঙ্গে পরিচয়। বিহারে বন্যাত্রাণে চাঁদা সংগ্রহের জন্য লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সাংস্টৃñতিক অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর জন্য টিকিট ছাপিয়ে চাঁদা গ্রহণ শুরু হয়। আইরিনের দায়িত্ব ছিল লখনউ বিধান পরিষদের সদস্যদের কাছে টিকিট বিক্রির। বিধান পরিষদে প্রথম যার সঙ্গে দেখা হয় তিনি ছিলেন লিয়াকত আলি। মুসলিম লিগের নেতা– বিধান পরিষদের সদস্য। মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। আইরিন লিয়াকত আলিকে টিকিট দিতে চাইলে একটি টিকিট কিনতে রাজি হয়ে যান তিনি। আইরিনের জেদ আরও একটি টিকিট নিতে হবে। সঙ্গে কাউকে নিয়ে আসবেন অনুষ্ঠান দেখতে। লিয়াকত আলি বলেন– কাউকে পাব না আমি– তাই চেয়ার ফাঁকা থাকবে। কাউকে জোগাড় করে দেব আর না হলে আমিই আপনার পাশে বসে যাব এই যুক্তি দিয়ে আইরিন দু’টি টিকিট বিক্রি করে না লিয়াকত আলিকে।
অনুষ্ঠানের দিনই বিধান পরিষদে সন্ধের পর পার্টির আয়োজন হয়। এ দিকে অনুষ্ঠানে আইরিনের নিজের গলায় গানও শুরু হয়। লিয়াকত আলির জন্য দু’টি চেয়ার ফাঁক পড়ে থাকে। পরে দেখা যায় ডিনার পার্টিতে হাজিরা দিয়েই লিয়াকত আলি ছুটে আসেন আইরিনদের অনুষ্ঠানের সঙ্গে একজনকে নিয়ে। আইরিনের গলায় গান শোনা না হলেও সুরের টান অনুভূত হয়েছিল সেদিন।
পরে লিয়াকত আলি বিধান পরিষদের ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব পান। সে সময় শুভেচ্ছা জানিয়ে ছিলেন আইরিন। আইরিন তখন দিল্লির ইন্দ্রপ্রস্থ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপিকা। লিয়াকত আলি জানিয়েছিলেন– দিল্লি থেকে ফেরার সময় একদিন একসঙ্গে বসে চা খাওয়া যেতে পারে। রাজি হয়ে যায় আইরিন। সেই রেস্টুরেন্টেই প্রথম প্রেমের আদানপ্রদান। লিয়াকত আলি আইরিনের থেকে ১০ বছরের বড়– বিবাহিত এবং এক সন্তানের পিতাও। তাঁকেই মনেপ্রাণে গ্রহণ করেন আইরিন। ইসলামধর্ম গ্রহণ করতে আগ্রহ দেখান। দিল্লির জামা মসজিদের ইমাম ‘নিকাহ পড়ান’ তাদের। সে সময়কার নামকরা মেইডেন হোটেলে বিয়ের পার্টি দেওয়া হয়। ১৯৩৩ সালের ১৬ এপ্রিল আইরিন পন্থ থেকে গুল-ই-রাণা। তারপর বেগম রানা লিয়াকত আলি খান হয়ে যান স্বাধীনচেতা এই মহিলা।
লিয়াকত আলি তখন মুসলিম লিগের রাইজিং স্টার। স্ত্রী জাহানারা বেগম ও পুত্র বিলায়েত আলির সংসারে নতুন আগমন ঘটে রাণার। বেগম রাণাও দুই পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। আশরাফ ও আকবর। ভারত ভাগের সেই উত্তেজনার মুহূর্তে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ছাপ সেভাবে পড়েনি অভিজাত পরিবারের গায়ে। বেগমের লেখিকা দীপা আগরওয়াল লিখেছেন– লিয়াকত আলি ও রাণা উভয়েই সংগীতের অনুরাগী ছিলেন। পিয়ানো ও গিটার এসে মিলিত হয় গজলের সঙ্গে। ইংরেজি গানের প্রতি আইরিনের অনুরাগের কথা জানা ছিল। লখনউ-এর সেই চ্যারিটি শো-তে আইরিন ইংরেজি গান গেয়ে হাততালি কুড়িয়েছিলেন। মিয়াবিবি ব্রিজ খেলতেও ভালোবাসতেন। অভিজাত নবাব পরিবারের রেওয়াজে অভ্যস্ত হয়েছিলেন রাণা। দিল্লিতে লিয়াকত আলির বাংলো ‘পাকিস্তান হাউজ’। এখন পাক হাইকমিশনারের অফিস। এই বাংলো পাকিস্তান সরকারকে দান করেছিলেন তাঁরা। অথচ মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ আওরঙ্গজেব রোডের বাংলোটি ডালমিয়াদের বিক্রি করে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। দিল্লিতে তিলক মার্গের সেই বাড়িতে স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে আইরিনের। 
লিয়াকত আলি তখন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থমন্ত্রী। ১৯৪৬ সালের বাজেট পেশ হওয়ার সময় এই বাংলো থেকেই বাজেটের বান্ডিল সংসদে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সব কিছু ছেড়ে কয়েকটি দামি সিগারেট লাইটার সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তান পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। 
আলির উপর আক্রমণ হয় পাকিস্তানে যাওয়ার ৪ বছর পর। ১৯৫১ সালের এক জনসভায় পরপর দু’বার বুকে গুলি মেরে হত্যা করা হয় তাকে। সকলেই ভেবেছিলেন রাণা ভারতে ফিরে আসবেন। কিন্তু তিনি পাকিস্তানেই থেকে যান। লিয়াকত আলির সেরকম সম্পত্তি কিছু ছিল না সে সময়। সিন্ধ ও করাচির বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন। সিন্ধের প্রথম মহিলা গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন। পরে পাক সরকার রাণাকে হল্যান্ডে এবং পরে ইটালির তারপর টিউনিশিয়ার রাষ্টÉদূত করে পাঠিয়ে দিয়েছিল। কূটনীতিতে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন রাণা।
‘রিজলভিং প্রবলেম থ্রু ডিপলোমেসি’ জগত মেহতার লেখা বইতে রয়েছে– সুইৎজারল্যান্ডে ভারতের দূতাবাসে উপ রাজদূতের কাজ করি– সে সময় রাণা আমার ছোট ফ্ল্যাটে আসেন। আমার সেই বাচ্চাকে নিজের হাতে স্নান করিয়ে খাওয়াতে থাকেন। কূটনীতির ইতিহাসে এটা বিরল ঘটনা। ভারত আর পাকিস্তানের প্রতিনিধি এভাবে পারস্পরিক মিশবে এই দোস্তির উদাহরণ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। জগত মেহতা ছিলেন প্রাক্তন বিদেশ সচিব। পরে দূতাবাসে যোগ দিয়েছিলেন।
শিষ্টাচার স্বাধীন চিন্তার আরও উদাহরণ রয়েছে। তাহমিনা আজিজ যিনি মাদারে পাকিস্তান অংশের লেখিকা লিখেছেন– আইয়ুব খান একবার রাণাকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। নির্বাচনে তাঁর বিরুদ্ধে প্রার্থী ফাতিমা জিন্নার বিপক্ষে প্রচারের জন্য। রাজদূত হিসাবে নিজের অক্ষমতার কথা জানিয়েছিলেন রাণা। জুলফিকার আলি ভুট্টোর মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন বেগম রাণা। জিয়াউল হকের সঙ্গেও তাঁর মতের অমিল ছিল। মার্শাল ল’য়ের বিরোধিতা করেন। জিয়াউল হকের সময় জোরালো দাবি ওঠে সম্পূর্ণ ইসলামি হুকুমত বা ইসলামি আইন চালু করার জন্য। রাণা আপত্তি জানায়। রাণার দুই বাচ্চার একজন শিশু ও একজন কিশোর পৌঁছয়নি। রাণার মহিলা সংগঠনের অনেককে জিয়াউল হক গ্রেফতার করলেও রাণাকে গ্রেফতার করার সাহস দেখায়নি। তিনি ধর্ম নিরপেক্ষ ব্যবস্থায় আস্থাশীল ছিলেন। নারী উন্নয়নে বহু কর্মসূচি নিয়েছেন দেশ-বিদেশে সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছেন। বহু আন্তর্জাতিক সম্মানও পেয়েছেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারতে বেশ কয়েকবার এসেছেন। কিন্তু কুমায়ুনে নিজের জন্মভূমিতে আসেননি।
ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে মুখ খুলতেন। তাঁর বত্তৃ«তায় উঠে আসত মা খাদিজা (রা.)-র নাম। মুসলিম মহিলারা ভালো ব্যবসায়ী– ভালো সমাজকর্মী ও শিক্ষিতা হতে পারেন সেই উদ্দেশ্যে ইসলামের ইতিহাস থেকে উদ্ধৃতি দিতেন তিনি।
১৯৬৯ সালে পাকিস্তানে বাংলা শেখানোর স্কুল খোলার উপর জোর দিয়েছেন। আর পরের বছর পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্র ভাষা উর্দুভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। নিজের চোখে দেশভাগ ও বাংলাদেশ সৃষ্টি হতে দেখেছেন। বাংলাভাষার প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল। একসময় কলকাতার গোখেল মেমোরিয়াল স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। পাকিস্তানে নারী উন্নয়নের কর্মসূচির পিছনে রয়েছে কুমাউনের এই মহিলার অনেক অবদান। জীবনের শেষপ্রান্তে হুইলচেয়ারে বসেও মানবাধিকারের কথা শুনিয়েছেন। ১৯৯০ সালে ইন্তেকালের পর করাচিতে জিন্নাহর মাজারের পাশে স্বামী নবাবজাদা লিয়াকত আলি খানের কবরের পাশে শায়িত রয়েছেন কুমাউনের এই দুঃসাহসি মহিলা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only