সোমবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৯

৫৪ বছর ধরে দলিত-আদিবাসীদের সেবা করার পর দেশ থেকে বিতাড়িত হলেন বিদেশি সন্ন্যাসিনী

পুবের কলম, ব্রহ্মপুর: অতিথি দেব ভব। আতিথ্যের জন্য বিখ্যাত ভারতভূমি থেকে এবার বিতাড়ন করা হল ৮৬ বছর বয়সি স্প্যানিশ ক্রিস্টান সন্ন্যাসিনীকে। তাঁর অপরাধ, তিনি এ দেশে থেকে দরিদ্রদের চিকিৎসা, শিক্ষাদান করছিলেন বিনামূল্যে। আর এর ফলেই নাকি ধর্মান্তরিত হয়ে যাচ্ছিলেন ওড়িশার গ্রাম্য দলিত, দরিদ্র, আদিবাসীরা। অবশ্য ভিসা দিতে অস্বীকারের সময় সরকারের তরফে এমন কোনও কারণ উল্লেখিত হয়নি। সিস্টার এনেডিনাকে গত ১১ আগস্ট স্রেফ বলে দেওয়া হয়েছিল, আর মাত্র দশদিন। তারপরেই তাঁকে ভারত ছেড়ে চলে যেতে হবে চিরদিনের জন্য। সেইমতো ২০ আগস্ট ভারত ছেড়ে স্পেনে ফিরে গেলেন দুঃখ ভারাক্রান্ত সিস্টার এনেডিনা। শেষ হল ৫৪ বছরের সম্পর্ক। নিজেদের ‘মা’কে হারিয়ে কাঁদলেন দরিদ্র গ্রামবাসীরা। তাঁকে এই বিতাড়ন অর্থাৎ ভিসা না দেওয়ার ব্যাপারটি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয়েছেন তিরুবনন্তপুরমের কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর।
তিনি লিখেছেন, ৩০০০ বছর ধরে এই দেশ ছিল বিশ্বের মানুষের কাছে স্বাগত-ভূমি, যে সবাইকে কাছে টেনে নিত, সাদরে অভ্যর্থনা করত অতিথিকে। বিদেশিরাও আর বিদেশি থাকেনি এ দেশে এসে। নানা ক্ষেত্রে বহু অবদান রেখেছে, সমৃদ্ধ করেছে এ দেশের সভ্যতাকে। আর মাত্র পাঁচ বছরে এটি বিদেশি-কাতর দেশ হয়ে উঠেছে যার ফলে ৮৬ বছরের এক পরহিতকর মানুষকে বিতাড়ন করা হল। তাঁর এই পোস্টে অনেকে যেমন ভারতের মহান সভ্যতার কথা বলে তাঁকে সমর্থনও করেছেন, অনেকে বিরুদ্ধ মতও জাহির করেছেন। তাদের বড় একটা অংশের মত, এই ক্রিস্টান মিশনারি সদস্যরা নাকি গরিবদের সহায়তার মাধ্যমে ধর্মান্তরিত করার জন্যই এ দেশে আসেন।
যদিও নাগরিক সমাজের একাংশের মত, ইস্কনের সদস্যরাও বিদেশে গিয়ে ‘হরে কৃষ্ণ’ আন্দোলন করে, সাদা চামড়ার মানুষদের ধর্মান্তরিত করে, কই সেক্ষেত্রে কি তাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়? অবশ্য যিনি ৫৪ বছর ধরে ওড়িশার প্রত্যন্ত একটি গ্রামে দলিতদের সেবা করে চলেছেন, শিক্ষার আলো জ্বালাচ্ছেন, তাঁকে ভিসা না দেওয়ার জন্য এ ধরনের যুক্তি একদমই ভোঁতা।
সিস্টার এনেডিনা প্রথম ভারতে পা রাখেন ১৯৬৫ সালে। সূচনায় ওড়িশার বহরমপুরে কাজ করেন। এলাকার চিকিৎসা ব্যবস্থার খামতি পূরণের জন্য একটি ডিসপেনসারি খোলেন এখানকার দরিদ্র উপজাতি ও দলিতদের কথা ভেবে। তিনি নিজে একজন ডাক্তার ছিলেন। পাঁচ বছর পরে গজপতি জেলার মোহনা গ্রামে কাজ শুরু করেন। এখানে তিনি একাধারে হয়ে উঠেছিলেন একজন চিকিৎসক, নার্স ও শিক্ষিকা। এলাকার মানুষের কাছে পরিচিতি ছিলেন ‘মা’ হিসেবে। সিস্টার এনেডিনা কাজ করতেন ‘ডটারস অফ চ্যারিটি’ নামক সংস্থার হয়ে। সেই সংস্থার উত্তর ভারত অঞ্চলের প্রধান সিস্টার মার্থা প্রধান জানাচ্ছেন, সিস্টার এনেডিনা নিয়মমতো সেই ১৯৬৫ সালের পর থেকে ভিসা পুনর্নবীকরণ করে আসছেন। কোনওবার সমস্যা হয়নি। এবার আগস্টের প্রথম সপ্তাহে অনলাইনে আবেদন করা হয় ভিসা নবরূপায়ণের জন্য। বিধি মোতাবেক সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে প্রয়োজনীয় অর্থও জমা দেওয়া হয়। কিন্তু নোটিশ আসে দশদিনের মধ্যে সিস্টার এনেডিনাকে দেশ ছাড়তে হবে। ওরা কোনও কারণও জানায়নি এই প্রত্যাখ্যানের। হতাশা ঝরে পড়ে সিস্টার মার্থার গলায়। বিজেপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের জন্যই কি এমন হচ্ছে, তা নিয়ে অবশ্য তিনি মুখ খুলতে চাননি।
ষাটের দশকে অস্ট্রেলিয়া থেকে এ দেশে এসেছিলেন গ্রাহাম স্টেইন। তিনিও ওড়িশার গ্রামে থেকে দরিদ্র মানুষদের শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার কাজ করতেন। তাঁকে ১৯৯৯ সালে পুড়িয়ে মারা হয় ধর্মান্তকরণের অভিযোগ তুলে।
হত্যাকারী হিসেবে অভিযোগের তির ছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের দিকেই। বিদেশি মিশনারীদের প্রতি এই বিদ্বেষী মনোভাব আন্তর্জাতিক নজরও আকৃষ্ট করেছে ইতিমধ্যে। অবশ্য দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি নষ্ট করে উত্তেজনা ছড়ানো বিতর্কিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে ফের ভিসা দিয়েছে ভারত সরকার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only