মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট, ২০১৯

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্কে ‘ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট’ কুরআনের হাফিজ সিরাজুল



সেখ কুতুবউদ্দিন

এ বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরে অঙ্কে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হলেন কুরআনে হাফিজ সিরাজুল হক। বীরভূমের মুরারই থানা এলাকার প্রত্যন্ত গ্রাম কাসিমনগর থেকে উঠে এসে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করলেন সিরাজুল। একইসঙ্গে ৩০ পারা কুরআনে হাফিজ (সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ মুখস্থকারী) ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যাবিদ্যালয় থেকে এমএসসি (অঙ্ক)-তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব খুঁজে পাওয়া ভার। তা কিন্তু করে দেখালেন সিরাজুল। সিএসআইআর-ইউজিসি নেট-এ জুনিয়র রিসার্চ ফেলো হাফিজ সিরাজুল বর্তমানে বেলুড়ের রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ এডুকেশনাল অ্যান্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটে ‘অ্যালজেবরা’ নিয়ে পিএইডি করছেন।

সিরাজুলের এই উত্থান একটা ইতিহাস। মুরারইয়ে গ্রামের একচিলতে মাটির বাড়িতে বাস। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়– এমন পরিবারে সন্তান সিরাজুল। বাবা মেরশাদ মুনশি ও মা রাহমাতান বিবির সাত সন্তানের মধ্যে সিরাজুলই স্নাতকোত্তরের গণ্ডি পেরোলেন। দুই বোন আর পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে চতুর্থ সিরাজুল। ছোটবেলা থেকেই তার বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল যেভাবেই হোক ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। সেইমতো চেষ্টায় খামতি ছিল না তাদের। এক ছেলে শফিকুল হক কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়ে পাশ করে এখন টিউশনি করছেন। তবে সিরাজুলকে নিয়ে মেরশাদ মুনশির ইচ্ছা ছিল--- প্রথমে সাধারণ শিক্ষা নয়– আগে কুরআনে হাফিজ করে তারপর ভাবা যাবে সাধারণ শিক্ষার কথা। সেইমতো সিরাজুলের প্রাথমিক পাঠ শুরু হয় গ্রামেরই মাদ্রাসায়। সেখানে চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর হাফিজের তালিম নিয়ে পূর্ণাঙ্গ হাফিজ হওয়ার লক্ষ্যে যান উত্তরপ্রদেশে। মাদ্রাসা দারুল উলুম মৌভঞ্জ থেকে হাফিজের শিরোপা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। কিন্তু দাদা শফিকুল যেহেতু বিজ্ঞান নিয়ে পড়েছেন– তাই সিরাজুলের ইচ্ছা জাগে এবার তাকে বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে হবে। ভর্তি হন মেমারির মামূন ন্যাশনাল স্কুলে। স্কুলের সম্পাদক কাজী মুহাম্মদ ইয়াসিন বিশেষ আগ্রহ নিয়ে পড়ার ব্যবস্থা করেন। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলেও ইয়াসিন সাহেব অভয় দেন এগিয়ে চলো। সেখান থেকে মাধ্যমিকে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন সিরাজুল। সব বিষয়ে লেটার সহ তার প্রাপ্ত নম্বর ৬৫১। এরপর উচ্চমাধ্যমিকের পালা। কলকাতায় জিডি অ্যাকাডেমিতে থেকে উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা সিরাজুলের। হতাশ করেননি। উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিষয়ে ৪৪৪ নম্বর পেয়ে ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। অঙ্কে অনার্স। তাতে কী! রোজ সকালে ফযরের নামাযের পর কুরআন তেলাওয়াতের পর শুরু পড়াশোনা। এভাবে অঙ্কে অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হন। তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে অঙ্কে এমএসসিতে ভর্তি হন। প্রথমে ছাত্রাবাস না পেলেও পরে ক্যাম্পাস সংলগ্ন সরকারি হস্টেলও পেয়ে যান। তাতে পড়াশোনার মাত্রা বেড়ে যায়। তার ভাই শফিকুল টিউশনি চালিয়ে অর্থ জোগান দেন খরচ সামলাতে। আর এক ভাই মশারির ব্যবসা করেও আপ্রাণ চেষ্টা করেন তাকে কিছু সহায়তা করতে। কারণ তখন তার আব্বা মেরশাদ মুনশি একেবারে অচল হয়ে পড়েন। মাটির বাড়ির নীচে সাত সন্তানকে নিয়ে সংসার নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়ে। তাতে ভরসা জোগায় ছেলেদের সামান্য আয়। এই পরিস্থিতিতে পড়াশোনায় বিরতি দেননি সিরাজুল। বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের অধ্যাপিকা অতসী দেব রায় সিরাজুলের মেধা দেখে মু? হন। সিরাজুলের পড়াশোনার একাগ্রতার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

এমএসসি ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে সিরাজুলের মনে হয়েছিল ভালো রেজাল্ট হবে। কিন্তু তার আগে অধ্যাপক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সিএসআইআর-ইউিজিসি-নেট প্রবেশিকায় বসা। সেখানে সিরাজুল জুনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে উত্তীর্ণ হন। তখন রেজাল্ট বের না হলেও গবেষণার জন্য মনস্থির করে ফেলেন সিরাজুল। পিএইচডিতে ভর্তির জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পাওয়ার কারণ--- তখন রেজাল্ট বের হয়নি। ফলে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন পিএইচডির জন্য। চারজনের মধ্যে সিরাজুলের নাম থাকলেও বাদ সাধে প্রেসিডেন্সি কর্তৃপক্ষ। তারা সাফ জানিয়ে দেয়– এমএসসির ফাইনাল রেজাল্ট না থাকলে ভর্তি করা সম্ভব নয়। তখন সিরাজুলের কয়েকজন শিক্ষক পরার্মশ দেন বেলুড়ে যোগাযোগ করতে। রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ এডুকেশনাল অ্যান্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটে আবেদন জানালে তার মেধার তারিফ করে ভর্তি করে নেওয়া হয়। মার্কশিট হাতে পাওয়ার পর তা জমা দেওয়ায় ভর্তি নিশ্চিত হয়। সেখানেই ‘অ্যালজেবরা’ নিয়ে পিএইডি করছেন সিরাজুল। আর স্বপ্ন দেখছেন ভবিষ্যতে অধ্যাপক হওয়ার। যুব সমাজকে পথ দেখাতে চান– বুঝিয়ে দিতে চান ধর্মীয় শিক্ষা আধুনিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনও প্রতিবন্ধকতা হতে পারে না। সিরাজুল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন--- কুরআনের হাফিজ হলেও গবেষক-অধ্যাপক হতে কোনও বাধা নেই। আর সেটাই তিনি করে দেখানোর পথেই এগিয়ে চলেছেন। বীরভূমের প্রত্যন্ত গ্রাম কাসিমনগরে মাটির বাড়িতে বসে সিরাজুলের আব্বা মেরশাদ মুনশি দোয়া করে চলেছেন– সফল হোক তাঁর ছেলের স্বপ্ন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only