শুক্রবার, ২ আগস্ট, ২০১৯

ড্রাগের নেশা মুক্ত গ্রাম গড়া লক্ষ্যে আজমিরা বিবির প্রমীলা বাহিনী, তাঁর হাতেই শুক্রবার সন্ধ্যেয় ধরা পড়ল দুই পাচারকারী



দেবশ্রী মজুমদার, রামপুরহাট, ২ আগস্ট:-  লক্ষ্য এক! ড্রাগের নেশা মুক্ত গ্রাম গড়া! আর সেই কাজে এগিয়ে আজমিরা বিবির নেতৃত্বে তাঁর মত এলাকার গৃহবধূরা। শুনতে খুব খারাপ লাগতো  ড্রাগ পাচারের গ্রাম হিসেবে নিজের গ্রাম মোলডাঙার পরিচিতি।  কেউ ড্রাগ পাচারকারী হিসেবে ধরা পড়লে, উঠত সেই মোলডাঙার নাম। একদিন গ্রামের সেখ সোহারাব ড্রাগ বিক্রি করা অবস্থায় ধরা পড়ে তাঁর হাতেই। আজ ড্রাগ বিরোধী আন্দোলনের মুখ  সেই আজমিরা বিবি।  নিপাট গৃহবধূ। বাড়িতে স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে ভরপুর সংসার। ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। কিন্তু যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে! তাঁর প্রমাণ তিনি নিজেই।  তাঁর হাতেই এক বছর আগে গড়ে ওঠা এই ড্রাগ বিরোধী প্রমিলা বাহিনীর কাজ বন্ধ হতে দেননি তিনি।  তাঁর মহিলাদের শ্যেন দৃষ্টি এড়িয়ে এলাকায় ঢুকতে পারে না কোন ড্রাগ পাচারকারী।  

উল্লেখ্য, এক বছর আগে রূপপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূলের সদস্যা তিনি। গ্রামবাসীদের অনুরোধ ছিল পায়ে ধরে ক্ষমা চাইলে অভিযুক্তকে ছেড়ে দিতে। তিনি তা করেননি, উল্টে পুলিশের হাতে তুলে দেন। আর এভাবেই পথ চলা বছর খানেক আগে। সেদিনই রূপপুর পঞ্চায়েতের ২৩ জন মহিলা মিলে ড্রাগ বিরোধী আন্দোলনে সামিল আজমিরা বিবি। আজ আজমিরা বিবি ড্রাগ বিরোধী আন্দোলনের মুখ।  এ ব্যাপারে বর্তমান পঞ্চায়েতের সদস্য নারেন্দ্র নাথ সরকার জানান, এই আন্দোলনে পঞ্চায়েত তাঁদের পাশে আছে। একইভাবে শান্তিনিকেতন মহিলা থানা তাঁদের পাশে আছে বলে জানিয়েছে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় নেশাগ্রস্থ অবস্থায় সেখ সোহরাব ও হাঁসু সেখ নামে দুজনকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয় তাঁরই নেতৃত্বে প্রমিলা বাহিনী। একদিন গ্রামের সেখ সোহারাব ড্রাগ বিক্রি করা অবস্থায় ধরা পড়ে তাঁর হাতেই। তখন রূপপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূলের সদস্যা তিনি। এদিন ফের সোহরাব ধরা পড়ে তাঁর হাতেই। হাঁসু সেখ ও তাঁর এক ভাই ও বাবা এই ড্রাগ পাচারের অভিযোগে ৬ মাস জেল খেটে গ্রামে ফিরেছে। ফের শুরু করেছিল এই ব্যবসা। আজমিরা বিবি জানান,  হাঁসু সেখ একজন নেশাখোর। বছর তিরিশের এই যুবক পেশায় মজদুর। তার পরিবার আছে। গোটা দিন খেটে তার আয় তিনশো টাকা। নেশা করতে ব্যয় পাঁচশো টাকা। আজমিরা বিবি বলেন,  এই দুশো টাকার  জন্য হাঁসুর মত অনেককেই স্ত্রীর গহনা বা চুরির পথে নামতে হয়। আর মোলডাঙার মত গরীব গ্রামের দুর্দশা দিন দিন বেড়েই চলছিল। আর একই সঙ্গে বাড়ছিল দুর্নাম। দুই সন্তানের মা আজমিরি বিবি এলাকার অন্যান্য মহিলাদের বোঝাতে সমর্থ হন নিজেদের ছেলে মেয়েদের ড্রাগের হাত থেকে বাঁচাতে একটা কমিটি তৈরী করতে হবে। বর্তমানে তাঁদের সদস্যার সংখ্যা ২৩। তাঁরা মাসে একটা করে মিটিংয়ের জন্য এক জায়গায় মিলিত হন।  কোন হুমকি পান এই প্রশ্ন করতেই, তিনি বলেন, হাঁসু সেখকে ধরেই, গ্রামের আশরফ মিঞার বাড়ি থেকে আড়াই কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়। তার পরিবার কী আমাদের ছেড়ে দেবে ভেবেছেন? গালমন্দ করছেন। তবে হুমকিকে আমরা ভয় পায় না। ভালো কাজ করলে, হুমকি পেতে হয় আমরা জানি।     
জানা গেছে, একটা সময় ছিল যখন ওই গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ মানুষ নেশায় বুঁদ হয়ে থাকত। বাইরে থেকে কিছু ড্রাগ পাচারকারী গ্রামে ব্রাউন সুগার, চরস, গাঁজা সরবরাহ করত। গ্রামের কয়েকটি পরিবার সেই ড্রাগের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। গ্রামকে নেশামুক্ত করতে মহিলারা সঙ্গবদ্ধ হয়। এরপর আজমিরা বিবির নেতৃত্বে ২৩ জনের একটি কমিটি গঠন করে মাদক বিরোধী অভিযানে নামেন প্রমীলারা। তারা পাশে পান পুলিশ প্রশাসন ও পঞ্চায়েতকে।  বর্তমানে শাসকদলের আহ্বায়ক তিনি। আজমিরা বিবি বলেন, আমরা চাই, নতুন করে কেউ যেন গ্রামের নেশাগ্রস্থ না হয়ে পড়ে।  আমাদের লক্ষ্য নেশামুক্ত গ্রাম। পুলিশ জানিয়েছে, দুজনকে আটক করা হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া গাঁজার ক্ষেত্রে কোন অভিযোগ না থাকায় কাউকে আটক করা হয়নি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only