বৃহস্পতিবার, ৮ আগস্ট, ২০১৯

গুফকার রোড থেকে শান্তিনিকেতনের মধ্যে কোথায় মিল খুঁজছেন কাশ্মীরি অধ্যাপক সাজ্জাদ হামদানি

দেবশ্রী মজুমদার, শান্তিনিকেতন, ০৮ অগাস্টঃ শ্রীনগর গুফকার রোড।  তার নিচেই সোনওয়ার বসতি। ওখান থেকে ১০  মিনিটের হাঁটা পথ গুফকার রোডে কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লার বাড়ি।  সোনওয়ার বসতি এলাকায় বাস বাবা আলী মুহাম্মদের (৭৫)। ব্যবসা ট্রান্সপোর্টের। জম্মু শ্রীনগর রুটে বাস চলাচল করে।  দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে সাজাদ হামদানি বিশ্বভারতীর কলাভবনের অধ্যাপক সাজ্জাদ হামদানি। চারদিন হল কাশ্মীরের পুরো পরিস্থিতি ভিন্ন, উত্তেজনা পূর্ণ। তাই বাড়ির জন্য চিন্তা হলেও, উদ্বিগ্ন নন হামদানি সাহেব। থাকেন শান্তিনিকেতন এলাকায়। তিনি জানান, এটা নতুন কিছু নয়। মাত্র চার দিনে পড়েছে। ছোটবেলায় একটানা কুড়িদিন কারফিউ দেখেছি। কাশ্মীরিরা জানে এই সময় কি করতে। ৬ মাসের চাউল আমরা আগে থেকেই মজুত করে রাখি। সিটিতে কিছু অসুবিধা হতে পারে। কিন্তু গ্রামে কোন অসুবিধা হয় না। তিনি বলেন, সমস্যাটা অন্য জায়গায়। কারফিউ, জঙ্গী হানা আর কারফিউয়ে ৩০ বছর ধরে বাবার মত অনেকের ট্রান্সপোর্ট সহ বিভিন্ন ছোটখাটো ব্যবসা ধাক্কা খাচ্ছে। পর্যটন বন্ধ। এরকম চলতে থাকলে মানুষ বাঁচবে কী করে?  সাজাদ হামদানি কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং তারপর কলাভবন থেকে স্নাতকোত্তর করেন তিনি। তাঁর কথায় উঠে আসে কাশ্মীরীদের স্বপ্ন ও ব্যর্থতার কথা।  তিনি জানান, ৩৭০ ধারা তুলে লাভ কি ক্ষতি সেটা ভবিষ্যত বলবে। আমরা জাস্ট ফেড আপ। আমরা চাই এই সমস্যার একটা সমাধান।  তারপর বলতে থাকেন, আমার প্রজন্মের ৭০ শতাংশ মানুষ তো মারা গেছেন।  ৩০ শতাংশ আছে যারা চেষ্টা করছে এই সমস্যার মধ্যে থেকে এগিয়ে যেতে। আমার তিনটে ব্যাচমেট ছিল।  তার মধ্যে একজন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। আরেকজন  শ্রীনগর আর্ট কলেজে পড়ান। কাশ্মীরের অবস্থা ঠিক থাকলে এরকম অনেক কিছু হতে পারত। আপনি বুঝতে পারছেন, আমি কি বলতে চাইছি?  এখন তো মাছি বর্ডার পেরোতে পারে না। দক্ষিণ এশিয়ায় যদি দ্বন্দ্বগুলো না থাকতো,  অনেক স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারতাম।  ইউরোপে দেখুন, একটাই কারেন্সি আছে। এক জায়গা থেকে এক জায়গায় কাজ করতে যেতে পারছে।  ইস্টার্ন ইউরোপ থেকে একেবারে শেষ পর্যন্ত যেতে পারবেন। একই টাকা চালাতে পারবেন। কোথাও বর্ডারে এমন সমস্যা নেই। আপনি সব সময় যদি চাপের মধ্যে থাকেন,  নিজের মানসিক উন্নতি হলো না, দেশের উন্নতি কী করে হবে?  কাশ্মীরা সব রকম সম্ভবনা ছিল। আমার এক বন্ধু আছে।  ইংল্যান্ডের লোক। তার নাম  তারা সিং বিরিয়ানা। ছোটবেলায় বাড়ি থেকে পালিয়ে ইংল্যান্ড পৌঁছে গেছিল।  ওখানে প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর একদিন ইচ্ছে হল, নিজের গ্রামে যাবে।  ইংল্যান্ড থেকে হাঁটতে শুরু করে।  হেঁটে হেঁটে লাহোর থেকে ওয়াঘা বর্ডার হয়ে পাঞ্জাবে বাড়ি পৌঁছায়।  ৫৪০ দিন লাগে বাড়ি পৌঁছাতে। এটা ছিল ওর জীবনের একটা এডভেঞ্চার।  ওকে জিজ্ঞেস করি, কেমন অভিজ্ঞতা হল? ও বলেছিল, আমি যেখানে গেলাম, মানুষের সাথে মিশলাম। দেখলাম মানুষের মনটা বিশাল।  সবাই সাহায্য করেছে, করবে। কোন জাতি, ধর্ম নিয়ে কোন গল্প নেই।  আমি অহিংস লোক। তার জন্য আমি শান্তিনিকেতনে আছি। রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাস আমি পড়েছি। অবশ্য সেটা ইংরেজি অনুবাদ।  রবীন্দ্রনাথ উগ্রজাতীয়তাবোধ থেকে মানবতা পৃথিবীর সব থেকে বড় জিনিস।  সেখানে একজন ব্রাহ্ম নেতাকে গোরা বলছেন, আপনি আমাকে আজ সেই দেবতার মন্ত্র দিন। যিনি হিন্দু, মুসলমান খ্রিষ্টান সকলের। একদিন গোটা বিশ্বকে ভারত শান্তির বার্তা দিত।  এখন দেশ থেকে সেটা চলেই যাচ্ছে। কাশ্মীরি নতুন প্রজন্মকেও দেখে আমার অবাক লাগে। বিশ্বভারতীতে মাঝে মাঝে কাশ্মীরি ছাত্ররা আসে। কিন্তু নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে ওদের কোন ধারনা নেই। একজন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলাম কাইটের কাশ্মীরী শব্দ জানো? ওতো জানে পতঙ্গ।  ওরা জানে  না কাইটের কাশ্মীরী শব্দ ‘গাঁট ব্রেয়ার’। যখন ছোট ছিলাম তখন, পাহাড় ও ক্ষেতে ৬ রকমের শাক নিয়ে আসতাম।  নিজে থেকেই হত।  খেতে খুব সুস্বাদু।  নতুন প্রজন্ম জানেনা।  আমাদের  জম্মু কাশ্মীর লাদাখে ১২টি ভাষা আছে। যা অন্যর থেকে আলাদা। আসলে ভারতের মূল সুর বহুত্ব। এটা না থাকলে ভারতের স্বাদই থাকবে না।
(চিত্রঃ না অন কংটালান্যান্ট থাইল্যান্ড)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only