বুধবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

শিক্ষকের কোনোদিন অবসর হয় না: ড. নিখিল কুমার সিনহা

 
দেবশ্রী মজুমদার


 সরকারীভাবে অবসর নেওয়ার পরেও দীর্ঘ ৬ মাস ধরে রামপুরহাট মহকুমার দুটি স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়ে যাচ্ছেন তাঁদের প্রিয় নিখিল স্যর।  এক হাতে লেখেন। একই সাথে আরেক হাতে ছবি আঁকেন। তাই অনেকে নিখিলবাবুকে  আড়ালে আবডালে সব্যসাচী স্যর বলে থাকেন। ১৯৮৩ সালে রামপুরহাট উচ্চবিদ্যালয়ে জীব বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী অবসর নেন। দীর্ঘ দিন শিক্ষকতা করার পর, অবসর জীবনটা একটু অন্যরকমভাবে উপভোগ করতেই পারতেন। কিন্তু আবার ক্লাস রুমে চক ডাস্টার নিয়ে ঘড়ি ঘণ্টা ধরে ক্লাস নেওয়া কেন? আবার তা বিনা বেতনে। নিখিলবাবুর সোজা সাপ্টা উত্তর, একজন সৈনিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত সৈনিক। দেশ রক্ষা করার কাজ তাঁর। আমরাও সেই অর্থে এক একজন সৈনিক। আমাদের কাজ দেশের ভিতরে মানব সম্পদকে রক্ষা করা। আর সেদিক থেকে ভাবতে গেলে, একজন শিক্ষকের অবসর হয় না। তাঁকে আমৃত্যু কাজ চালিয়ে যেতে হয়। তাই যখন আমাকে আমার স্কুলের ছাত্ররা আমায় বাড়ি গিয়ে বললে ক্লাস নেওয়ার জন্য। শুধু আমাকে নয় শুনেছি তারা স্কুলের প্রধান শিক্ষককেও একইভাবে বলেছে। পাশাপাশি, আমাকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেন, ক্লাস নেওয়ার জন্য। আমি না করতে পারি নি। সব পরিবারের  তো আর্থিক অবস্থা  ভালো নয়। তাছাড়া ছাত্রদের সাথে সময় কাটাতে ভালোই লাগে!

জানা গেছে, প্রাচীনতায় ও ঐতিহ্যে ভরপুর রামপুরহাট উচ্চবিদ্যালয়। এই স্কুলে একজন বায়োলজি শিক্ষক আছেন। আরও একজন দরকার। আগামীতে হয়তো নতুন শিক্ষক আসবেন। কিন্তু এই সময়ে স্কুলের পাশে দাঁড়িয়েছেন নিখিলবাবু। তিনি জানান, এই স্কুল আমার কাছে গর্বের। আমি এই স্কুলের ছাত্র আমি। আবার এই স্কুলের শিক্ষক।  শুধু রামপুরহাট উচ্চবিদ্যালয় নয়, রামপুরহাট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়েও একাদশ- দ্বাদশ শ্রেণীর ক্লাস নেন তিনি। ওখানে নিতে হয় থিওরি ও প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস। কি করে দুটো স্কুল সামলান তার হিসেব দিলেন তিনি। রামপুরহাট বালিকা বিদ্যালয়ে দুদিন ও রামপুরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে তিন দিন ক্লাস নেন। মঙ্গলবার ফার্স্ট হাফে উচ্চবিদ্যালয় এবং সেকেণ্ড হাফে বালিকা বিদ্যালয়ে যান। এছাড়াও রামপুরহাট উচ্চবিদ্যালয়ে শনিবারে সমগ্র শিক্ষা অভিযানের আওতায় কেরিয়ার গাইডেন্সে জয়েন্টের মত বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রস্তুতির জন্য পাঠদান করেন। তাঁর এই সামাজিক দায়ব্ধতার জন্য ভারত সরকারের কাছে জাতীয় পুরস্কার পান তিনি। ২০১৫ সালে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাত থেকে দিল্লীর বিজ্ঞানভবনে এই পুরস্কার লাভ করেন তিনি। প্রধান শিক্ষক মহঃ নুরুজ্জামান জানান, রামপুরহাট হাইস্কুলে বায়োলজির শিক্ষকের অভাব আছে। ছাত্রদের অসুবিধা হচ্ছে। তারা আমাকে এসে নিখিলবাবুর কথা বলার পর, আমি তাঁকে ক্লাস নেওয়ার জন্য অনুরোধ করি। স্কুল খুব উপকৃত তাঁর এই সহযোগিতার জন্য। আমরা উনার কাছে কৃতজ্ঞ।  স্কুলের সভাপতি আরসাদ হোসেন বলেন, তাঁর মত শিক্ষক পেয়ে আমরা ধন্য। অবসরের দিনই ৫০ হাজার টাকা উনি স্কুলের হাতে তুলে দেন। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রপতি পুরস্কার বাবদ যে সাম্মানিক এককালীন অর্থ পেয়েছেন, সেই টাকার সুদ থেকে ছাত্রদের বই, ফিজ বিভিন্নভাবে দিয়ে থাকেন।      স্কুলের ছাত্র রফি সেখ ও কাজিবুর রহমান জানায়, যখন তারা একাদশ শ্রেণীতে পাঠরত, তখনই নিখিল বাবু অবসর নেন। জীবন বিজ্ঞানে আমাদের অসুবিধা হচ্ছিল। খুব ভালো লাগছে উনি আমাদের পড়াচ্ছেন। টিউশন পড়ার সামর্থ্য আমাদের সবার নেই। তাছাড়া উনি আমাদের পিতৃস্নেহে ভালোবেসে পড়ান। এটা কোথায় পাব!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only