বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

খাবির শেখ-খুনের তদন্ত কোথায় দাঁড়িয়ে?

মুর্শিদাবাদের খাবির শেখের লিঞ্চিংয়ে মর্মন্তুদ মৃত্যুর খবর দলমত নির্বিশেষে সকলকেই মর্মাহত করেছে। বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ বছর তিন থেকে গরুহত্যা-গরুপাচার– ছেলেধরা প্রভৃতি গুজবকে সামনে রেখে মানুষকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক ঐতিহাসিক ‘মব লিঞ্চিং প্রতিরোধ বিল’ বিধানসভায় পাস করিয়েছেন। বিলটি আইনে পরিণত হতে রাজ্যপালের স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে। 

আর তারই মধ্যে খাবির শেখকে গণপিটুনিতে খুনের ঘটনা সামনে এল। বহরমপুরের একটি পলিক্লিনিকে রহস্যময় কারণে কিংবা অকারণে হাত-পা বেঁধে গণপিটুনির দ্বারা ১০-১২ জন চিকিৎসাকর্মী ও তাদের সহযোগীরা হত্যা করে। পুলিশ প্রথমে ২ জন ও তারপর জনবিক্ষোভের মুখে আরও ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে বলে খবরে জানা গেছে। 

কিন্তু খাবির শেখের গণপিটুনিতে হত্যার রহস্যভেদের কাজ কতদূর এগিয়েছে? স্থানীয় মানুষেরা অভিযোগ তুলেছেন, তদন্তে ইতি না পড়লেও গতি কিন্তু খুবই শ্লথ। 

১৭ সেপ্টেম্বর জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের এক সম্প্রীতি সম্মেলন উপলক্ষ্যে বহরমপুরে গিয়েছিলেন মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরি এবং সাংসদ তথা ‘পুবের কলম’ পত্রিকার সম্পাদক আহমদ হাসান (ইমরান)। নিহত খাবির শেখের স্ত্রী আকিলা বিবি, তাঁর ২ কন্যা সন্তানকে নিয়ে দেখা করতে এসেছিলেন তাঁদের সঙ্গে। আকিলা বিবি অভিযোগ করেন, গণপ্রহারে তাঁর স্বামী এভাবে নিহত হওয়ার পরও পুলিশ বা প্রশাসনের কেউ কিন্তু তদন্ত করার জন্য তাঁদের ঘরে আসেননি। আকিলা আরও জানান, মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁকে দিয়ে ঘটনার এফআইআর না করিয়ে কে বা কারা তাঁর সম্পর্কিত আত্মীয় শামিম শেখের দ্বারা অভিযোগ দায়ের করানোর ব্যবস্থা করেন। আর এই অভিযোগে রয়েছে একটি মারাত্মক ভুল। আকিলার বক্তব্য, আমার স্বামীকে খুন করা হয় সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ। আর শামিম শেখের দায়ের করা অভিযোগে লেখা আছে, আমার স্বামীর নাকি মৃত্যু হয় সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ। পুলিশ জেনেবুঝেও এতে কোনও সংশোধন করেনি। কিন্তু সময়ের এই হেরফের হয়তো আদালতের যুক্তি হিসাবে উঠে আসবে। 

সদ্য বিধবা আকিলা বলেন, আমার কুঁড়ে ঘরটি ভেঙে পড়েছে। আমার মেয়ে দু’টো পড়াশোনা করত। এখন পড়াশোনা দূরে থাক, আমাদের প্রতিদিনের খাবার কীভাবে জুটবে তাই ভেবে কূল পাচ্ছি না। প্রশাসন বা অন্য কেউ সাহায্যের হাত নিয়ে আমাদের কাছে আসেনি। এই ধরনের মৃত্যুর জন্য অনেকে বলেছেন নাকি ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়। কিন্তু আমরা অশিক্ষিত গরিব মানুষ। আমাদের ভাগ্যে তা জুটবে কি না, তা বুঝতে পারছি না।

মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরি ও সাংসদ আহমদ হাসান তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেন, রাজ্য সরকার ও সমাজ আপনাদের পাশে রয়েছে। আপনাকে যাতে সর্বতোভাবে সাহায্য করা যায়, তার জন্য আমরা অবশ্যই সচেষ্ট থাকব। 

মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরির পরামর্শে আকিলা বিবি ওই দিনই নিজে পুনরায় বহরমপুর থানায় গিয়ে নতুনভাবে এফআইআর দায়ের করেন। এই এফআইআর-এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সকল ব্যক্তিকে গ্রেফতারের দাবি জানান স্বামীহারা আকিলা বিবি।  
এ দিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, এত বড় একটি ঘটনার তদন্ত খুবই মন্থর গতিতে চলছে। যদিও হত্যাকাণ্ডের ভিডিয়োতে দেখা যাচ্ছে কমপক্ষে ১০-১২ জন মিলে খাবির শেখকে বেদম পেটাচ্ছে। কিন্তু গ্রেফতার করা হয়েছে মাত্র ৫ জনকে। ঘটনার একপক্ষ কাল পরেও বাকিদের কেন চিহ্নিত করা হচ্ছে না তার কোনও জবাব পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও ঘটনার সাক্ষী এবং ভিডিয়ো মজুদ রয়েছে। 

এ সম্পর্কে বহরমপুর থানার আইসি সনৎ দাসকে পুবের কলমের তরফে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমরা দেখছি। গ্রেফতার হওয়া ২-৩ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে খুনের ধারা দিয়ে মামলা রুজু করা হয়েছে। 

তদন্তের স্বার্থে পুলিশ কেন এত দিন পরেও নিহত খাবির শেখের বাসস্থানে যায়নি? এই প্রশ্নের উত্তরে আইসি দাস বলেন, ঘটনা তো বহরমপুরে ঘটেছে। তাহলে আর খাবির শেখের গ্রামে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন কী? 
অথচ কয়েকটি মহল খাবির শেখকে ঘটনার দিনই বিকৃত মস্তিষ্ক বা মানসিক ভারসাম্যহীন বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল। এ ছাড়া যার মোটর সাইকেল নিয়ে খাবির শেখ বহরমপুরে এসেছিল সেটিও পাওয়া যায়– পলিক্লিনিক থেকে প্রায় দেড় দুই কিমি দূরে। কীভাবে বাইকটি সেখানে গেল– তারও কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। এখনও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট খাবির শেখের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। 
হত্যা করার আগে খাবির শেখের হাত ও পা শক্তভাবে বাঁধা হয়েছিল এবং তারপর অসহায় খাবির শেখকে নির্মমভাবে মারা হয়।  তার হাত-পা কে বেঁধেছিল– সে সম্পর্কেও এখনও পর্যন্ত পুলিশের কোনও বক্তব্য নেই।

তাবরেজ আনসারির গণপিটুনিতে হত্যার ক্ষেত্রে ঝাড়খণ্ড পুলিশ জানিয়েছে– হার্ট অ্যাকার্ট বা হ*দ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে নাকি তাঁর মৃত্যু হয়, মব লিঞ্চিংয়ে নয়। কেউ কেউ বলছেন, পশ্চিমবাংলায় হয়তো এমনটি হওয়ার জো নেই। তবে যেকোনও মানুষেরই মৃত্যু হয় হার্টের ক্রিয়া বন্ধ হয়েই। কিন্তু কী জানি কেন, হত্যাকারীদের ঢাল হিসাবে কেউ কেউ হ*দ ন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়াকেই প্রাধান্য দেন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only