বৃহস্পতিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

বহরমপুরে পলিক্লিনিকের মধ্যে পিটিয়ে খুন যুবককে



রুবিয়া খাতুন
গণপিটুনি রোধে রাজ্য সরকারের আনা বিল পাস হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই গণপিটুনির শিকার হলেন এক মুসলিম যুবক। খোদ বহরমপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র লালদিঘির পাশে এক পলিক্লিনিকের চিকিৎসকের কর্মী– ওষুেধর দোকানের মালিক ও কর্মীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে। বহরমপুর থানা থেকে এক কিমি দূরের এই ঘটনাস্থলে যখন পুলিশ এসে পৌঁছয়– তখন সব শেষ।
মৃত যুবকের নাম খাবির সেখ (৩৩)। বাড়ি বহরমপুর থানার সাহাজাদপুর গ্রামে। পেশায় রাজমিস্ত্রি সুস্থ-সবল খাবির সেখের কয়েকদিন থেকে একটু মানসিক সমস্যা চলছিল বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। বুধবার শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. অমিয় কুমার ঘটকের চেম্বারে এই যুবক ঢুকে পড়েন বলে অভিযোগ। তারপর আর বাইরে বেরোতে দেয়নি পলিক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। খাবির সেখের দুই হাত-পা পিছন দিকে বেঁধে যখন কয়েকজন ধরে তাঁকে বাইরে বের করে– তার কিছুক্ষণ পরেই মারা যান তিনি। পুলিশ মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। 
শহরের কেন্দ্রস্থলে এই পলিক্লিনিকে চার-পাঁচজন চিকিৎসক প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। ডা. অমিয় কুমার ঘটকের চেম্বারের কর্মী রণজিত বিশ্বাস জানিয়েছেন– সকাল ১০টা বাজছিল। ডাক্তারবাবু চেম্বারে আসেননি। হঠাৎ চেম্বারে এই যুবক প্রবেশ করে টেবিলে উঠে এসিটা অন করে। আমি কে কে বলে পরিচয় জানতে চাইলে চেম্বারের একটি চেয়ার ফেলে দেয়। ভাঙচুর করে। আমি নিষেধ করলে আমায় চেয়ার তুলে মারতে যায়। তখন চেম্বারের ভিতর আটকে রেখে বহরমপুর থানায় খবর দেওয়া হয়। দু’জন ট্রাফিক ওয়ার্ডেন এসে কোনওরকমে চেম্বার থেকে বের করে তাঁকে বাইরে বসিয়ে রাখে। তখন পালানোর চেষ্টা করলে উত্তেজিত জনতা হাত-পা বেঁধে মারধর করে। আধ ঘণ্টা পর পুলিশ এসে তাঁকে উদ্ধার করে।
ভগবানগোলার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম নিজের কাকাকে এই পলিক্লিনিকে অন্য চিকিৎসকের কাছে নিয়ে এসে অপেক্ষা করছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন– ঘরের ভিতরে দু’জন ট্রাফিক ওয়ার্ডেন এই যুবককে বেঞ্চে বসিয়ে চলে যায়। তারপর কেউ বলছে চোর– কেউ বলছে ডাক্তারবাবুকে আক্রমণ করতে এসেছিল। এমন সময় পলিক্লিনিকের লোকজন যুবকের দুই হাত ও পা গামছা দিয়ে বাঁধতে গেলে সে বাধা দেয়। তখন শুরু হয় গণপিটুনি। কিল– ঘুসি– লাথি মেরেছে আট-দশ জন মানুষ। সকলেই পলিক্লিনিকের লোক। বহিরাগত আমরা ভয়ে নিষেধ করতে পারিনি। যখন পাবলিক গণপিটুনি শুরু করে– তখন ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখে। পুলিশের সামনেই গণধোলাই চলে।
সাহাজাদপুর গ্রামের বাসিন্দা– পেশায় রাজমিস্ত্রি খাবির সেখের স্ত্রী আকিলা বিবি। ১০ ও ৭ বছরের দু’টি মেয়ে রয়েছে তাঁদের। আকিলা বিবি বহরমপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন– ‘আমার স্বামীর কোনও রোগ ছিল না। চুরি-ডাকাতি করে না। কোনও অভিযোগই তাঁর বিরুদ্ধে নেই। বাড়ি থেকে বহরমপুর যাবে বলে বেরিয়ে এসেছিল সকাল আটটার সময়। তারপর দুপুরে খবর পাই মারা গেছে। আমার স্বামীকে চোর সন্দেহে মিথ্যা অভিযোগে পিটিয়ে খুন করেছে। দোষীদের শাস্তির দাবি করছি।’ 
পলিক্লিনিকের মালিক অশোক বড়াল– ডাক্তারের কর্মী ও তাঁর এক বন্ধু--- মোট তিনজনকে পুলিশ আটক করেছে। পলিক্লিনিক মালিক অশোক বড়াল জানিয়েছেন– আমরা ঘরে আটকে রেখে পুলিশকে খবর দিই। তারপর যা করেছে পুলিশ করেছে। তারাই উদ্ধার করে বাইরে বের করে। আমরা কেউ কিছুই করিনি।
ঘটনাস্থলে বহরমপুর থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী হাজির হয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে বহরমপুর থানার আইসি সনৎ দাস জানিয়েছেন– খুনের তদন্ত শুরু করেছি। তিনজনকে আটক করা হয়েছে। গণপিটুনি আইনে কী আছে– সেসব পরে দেখা হবে। আপাতত খুনের মামলা চালু হয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only