বুধবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

আগে ও পরে হিরো কিন্তু হিমন্তই: এনআরসি তবে কি ‘ফাইনাল সলিউশন’-এর অপেক্ষায়?

হেমন্ত বিশ্বশর্মা

আহমদ হাসান ইমরান ­ 

‘জিন্দেগী কে সাথ মে ভি– জিন্দেগী কে বাদ মে ভি’। অসমে এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে লিখতে বসে ওই হিন্দি শ্লোগানটিই বারবার মনে পড়ছে। হিন্দি বিজ্ঞাপনটি ছিল ‘এলআইসি’-র। অর্থাৎ লাইফ ইনসিওরেন্স কম্পানি-র বার্তা ছিল– লাইফ ইনসিওরেন্স জীবনেও যেমন আপনাকে ফায়দা দেবে– তেমনই মৃত্যুর পরও– অর্থাৎ জীবনাবসানের পরেও স্বজনরা লাভবান হবেন। 

অসমের অর্থমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা সম্পর্কে ঠিক এই কথাটিই অনেকখানি প্রযোজ্য। এনআরসি চলাকালীন তিনি এই প্রক্রিয়ার প্রবল সমর্থক ছিলেন। সব সময় হুমকি দিতেন– মুসলমানদের অসম থেকে বহিষ্কার করার জন্যই তারা এনআরসি করছেন। বর্তমানে অসমসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবথেকে দাপুটে বিজেপি নেতা হচ্ছেন এই হিমন্ত বিশ্বশর্মা।  আর অসমে তিনি বকলমে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবেই পরিচিত। বলা যায়– অসম মন্ত্রীসভায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। এখনো আম্বেদকর ও তাঁর সহযোগীদের প্রণীত সংবিধানই ভারতে  প্রচলিত রয়েছে– হিমন্ত কিন্তু এসবের কোনও তোয়াক্কা করেন না। মন্ত্রী হিমন্ত সংবিধান অনুযায়ী শপথ নেওয়ার সময় উচ্চারণ করেছিলেন– তিনি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের প্রতি সমান সুবিচার করবেন। এছাড়া মন্ত্রী হিসাবে কোনও ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর  প্রতি তিনি ঘৃণা বা বিদ্বেষ প্রচার করবেন না। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলে থাকেন– হিমন্তের প্রতি ভারতীয় সংবিধানের এসকল নিয়ম ও সম্পর্কিত চেতনা মোটেই প্রযোজ্য নয়। কারণ হিমন্ত বিশ্বশর্মা মহাশয় কোনও লুকোছাপা নয়– প্রকাশ্য সভাতেই বহুবার প্রশ্ন তুলেছেন– ‘আপনারা বলুন– কে আপনাদের প্রকৃত শত্র&। কোনও হিন্দু? না মুসলমানরা?’ জনতাকে তিনি বলিয়েই ছাড়তেন– ‘প্রকৃত দুশমন’ হচ্ছে মুসলমানরা। মন্ত্রী হিসাবে এধরণের উন্মাদনা সৃষ্টি করতে তিনি কখনই ইতস্তত বোধ করেন নি।
আরও জোরেশোরে– আরও দ্রুত গতিতে  এনআরসি সম্পন্ন করে এই ‘শত্র&’-দের বহিষ্কার করার লক্ষ্যে শুধু ট্রাইব্যুনাল নয়– প্রত্যেককে কাজ করতে হবে বলে তিনি বরাবর প্ররোচনা দিয়ে এসেছেন। 
সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী– এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর এখন স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে হিমন্তর। তিনি বলতে আরম্ভ করেছেন– এই এনআরসি মানি না। 
অর্থাৎ এলআইসি-র বিজ্ঞাপনের মতো ‘হিমন্ত আছে হিমন্ততেই’। ‘এনআরসি কা পহলে ভি– এনআরসি কা বাদ মে ভি’- হিমন্তর মূল লক্ষ্য একটাই। বাংলাদেশি কিংবা বিদেশি নয়–  অসম থেকে ভাগাতে হবে মুসলিমদের। 

কিন্তু  তাঁর সেই বহু কথিত স্বপ্ন সুপ্রিমকোর্ট নির্দেশিত এনআরসি পূরণ করতে পারল না! এনআরসি-তে নাম ওঠেনি এমন ব্যক্তিদের যে হিসেব পাওয়া গেছে তাতে হিমন্তর মালুম হয়েছে প্রত্যাশা মতো মুসলমানরা বিপুলভাবে নাম বাদ যাওয়ার তালিকায় পড়েনি। বরং মুসলিমদের চেয়েও নাকি বেশি নাম কর্তিত হয়েছে বাঙালি হিন্দু ও নেপালিদের। 
তাই হিমন্ত নতুন করে আওয়াজ তুলেছেন– সুপ্রিমকোর্ট বললে কী হবে? এই এনআরসি চূড়ান্ত নয়। তিনি বুক ঠুঁকে এখন বলছেন– যতদিন নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ রয়েছেন– ততদিন কোনও কিছুই চূড়ান্ত নয়– কোনও কিছুই ‘ফাইনাল’ নয়। 
তাহলে কী হবে? হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সেই দাওয়াই-ও বাতলে দিয়েছেন। অসম সরকার আবারও সুপ্রিমকোর্টে যাচ্ছে। সেখানে তারা ফের নয়া আবেদন জানাবেন– সদ্য সমাপ্ত এনআরসি প্রক্রিয়া যেন নতুন করে ‘রি-ভেরিফিকেশন’ বা পুনঃযাচাই করা হয়। ‘অনিয়ম দূর করে’ তাদের পছন্দসই তালিকা তৈরি হলে তবেই তা যেন ‘এনআরসি ফাইনাল লিস্ট’ বা এনআরসি চূড়ান্ত তালিকা বলে ঘোষিত হয়। বিশ্ব শর্মা আশা প্রকাশ করেছেন– ‘আমরা সবাই মিলে সুপ্রিমকোর্টে আবেদন করলে শীর্ষ আদালত নিশ্চয় এই এনআরসি তালিকাকে স্থগিত করে দেবে।’ 
কেন্দ্রীয়মন্ত্রী  রাজনাথ সিং-ও সম্প্রতি বলেছেন– চূড়ান্ত তালিকা এটা নয়। তার মানে হয়তো অসমের ‘ফাইনাল লিস্ট’ তৈরি হবে জার্মানির নাৎসিদের কথিত সেই ‘ফাইনাল সলিউশন’-এর পর। নিরাপরাধ ও অসহায় ইহুদিদের বিরুদ্ধে নাৎসিরা এধরণের শ·াবলী ব্যবহার করতো। এখানে অবশ্য হিমন্তরা চাইছেন– মুসলিমদের বের করে চূড়ান্ত সমাধান তৈরি করতে। তাদের পরিকল্পনা কার্যকরী হলে আরও একবার সীতার মতো পরীক্ষা দিতে হবে অসমের বাঙালিদের। সীতা তো পাতালে প্রবেশ করে নিষ্কূতি পেয়েছিলেন। এই ভারতীয় বাঙালিরা কোথায় যাবেন? 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only