শুক্রবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

লিঞ্চিংয়ে খাবির সেখের হত্যা, রহস্য কিন্তু বাড়ছেই

রুবিয়া খাতুন, পুবের কলম ব্যুরো, বহরমপুর

বহরমপুর শহরে ‘মব লিঞ্চিং’ অর্থাৎ গণপিটুনির দ্বারা বুধবার দরিদ্র রাজমিস্ত্রি যুবক খাবির সেখকে যে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা শুধু মুর্শিদাবাদ নয়, সারাদেশের মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই হত্যাকাণ্ড আরও তাৎপর্য বহন করছে এই কারণে যে, ঘটনার মাত্র দিন কয়েক আগে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় ‘মব লিঞ্চিং প্রতিরোধ’ বিল সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে। কে জানে হয়তো হত্যার নেশায় বুঁদ দুর্বৃত্তদের কাছে সে খবরের গুরুত্ব ঠিকমতো প্রতিভাত হয়নি, কিংবা তাদের হয়তো বিশ্বাস রয়েছে এই ধরনের ‘মব লিঞ্চিং’ করেও আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে অথবা ‘সহযোগীদের’ সহায়তায় তারা ঠিক পার পেয়ে যাবে। যেমন পার পেয়ে গেছে পেহলু খানের হত্যাকারীরা, হয়তো বা পার পেতে চলেছে তরুণ তাবরেজ আনসারির খুনিরাও। 
খাবির সেখের নিহত হওয়ার ঘটনা ঘিরে ক্রমশই রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। লক্ষ্য করা গেছে একটি মহল ইতিমধ্যেই নিহত খাবির সেখকে ‘মানসিক রোগগ্রস্ত’ ও ‘আক্রমণামুখী ব্যক্তি’ বলে উল্লেখ করতে শুরু করেছে। অবশ্য কেন সদ্য প্রবাস থেকে ফিরে আসা খাবির সেখকে ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’ বলা হচ্ছে– তার সপক্ষে কোনও তথ্য প্রমাণ পেশ করা হয়নি।  
প্রকৃত তথ্য কী– তা জানার জন্য আমাদের সাংবাদিক রুবিয়া খাতুন সরাসরি হাজির হন খাবির সেখের বাড়ি সাহাজাদপুরে। তাঁর বক্তব্য হল– গ্রামের প্রায় এক কুঁড়ে ঘরে স্ত্রী ও ২ কন্যাকে নিয়ে থাকতেন খাবির সেখ। কুঁড়ে ঘরটির সর্বত্র দারিদ্র্যের ছাপ যে কোনও ব্যক্তি মাত্রই লক্ষ্য করতে পারবে। সাংবাদিক দেখে খাবিরের বেশকিছু প্রতিবেশী এগিয়ে এলেন। তাদের বক্তব্য– সাহাজাদপুর গ্রাম ও আশপাশের সকলের কাছেই খাবির সেখ একজন ঈমানদার মানুষ। একজন ভালো রাজমিস্ত্রি। পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ত সে। গ্রামেরই কাফি সেখের জন্য পাকা ঘর তৈরির কাজ করছিল সে। বুধবার সকালে দু’জন মিস্ত্রি ও তিনজন জোগাড়ে নিয়ে কাজ শুরু করে সে। বাড়িতে নাশ্তা করে সকাল সাড়ে ৯টায় বাড়ি থেকে বহরমপুর যাওয়ার কথা বলে খাবির বেরিয়ে যায়। কাফি সেখের মোটরবাইক সে নিয়ে যায় বাড়ি তৈরির কিছু মাল-মশলা কিনে আনবে বলে। 
সদ্য নিহত খাবিরের স্ত্রী আকলিমা বিবি জানান– বড় মেয়ে আসিয়া খাতুন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট মেয়ে এতিমা খাতুন পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে। ছোট্ট একটা কুঁড়ে ঘরে কোনওরকমে তাদের বাস। তিন বছর সৌদি আরবে কাজ করে রোযার আগে বাড়ি এসেছিল তাঁর স্বামী। তাদের কিছু দেনা ছিল। বিদেশে কাজ করে দেনা খানিকটা পরিশোধ করলেও এখনও বেশ কিছু কর্র্জ রয়েছে। স্বামী তো চলে গেলেন। এই অবস্থায় কীভাবে তাদের জীবন চলবে– তা ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছেন না আকলিমা বিবি। তাই প্রবল শোকের মধ্যেও আকলিমা মাথায় ঘুরছে কীভাবে ২ মেয়েকেই খানিকটা পড়াশোনা করাবেন। ওদের আব্বু কিন্তু চেয়েছিলেন– মেয়েরা যেন খানিকটা শিক্ষিত হয়। 
খাবিরের স্ত্রী এবং পড়শিরা সকলেই জানাল– খাবিরের কোনও মানসিক রোগ ছিল না। যদিও হয়তো বা বাঁচার জন্যই খাবিরকে মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে একটি মহল। অবশ্য এর উলটোটাও হয়। কখনও কখনও খুনিকেই ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ বলে তাঁর অপরাধ লঘু করার কোশেশ্ করা হয়। এক্ষেত্রে খুনিরা নয়– নিহতর ওপরই মানসিক ভারসাম্যহীনতা আরোপ করার চেষ্টা হচ্ছে।
এ দিকে– মব লিঞ্চিং-এ নিহত খাবির সেখের খুনের ঘটনায় সারা মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। উত্তেজনায় ফুঁসছে খাবির সেখের গ্রাম সাহাজাদপুর। বুধবার সন্ধ্যায় উত্তরপাড়া মোড়ে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করেছিল এসডিপিআই। বৃহস্পতিবার সামশেরগঞ্জ– ইসলামপুর– রানিনগর প্রভৃতি জায়গায় রাস্তা অবরোধ করে প্রতিবাদ জানায় সাধারণ মানুষ। অন্যায়ভাবে সুস্থ স্বাভাবিক খাবির সেখকে পিটিয়ে মারায় অভিযুক্তদের ফাঁসির দাবি করছে তারা।
বহরমপুর থানার পুলিশ সুরক্ষা পলিক্লিনিক থেকে আটক তিনজনের মধ্যে একজনকে বুধবার রাতেই ছেড়ে দেয়। ক্লিনিকের মালিক অশোক বড়াল ও কর্মী রণজিৎ বিশ্বাসকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করা হয়। নিহতের আত্মীয়দের অভিযোগে এই দু’জনের নাম আছে। এই ঘটনায় আরও অনেকেই যুক্ত থাকলেও তাদের নাম পুলিশ সংগ্রহ করতে পারেনি। পুলিশ বলছে– তারা কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বাকি ঘাতকদের নাকি শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। অবশ্য খাবির সেখকে লিঞ্চিং করার মোবাইলে তোলা ফুটেজ এখন ভাইরাল হয়ে শুধু জেলা নয়– মুর্শিদাবাদের বাইরেও অনেকের মনকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। 

বহরমপুর থানার তদন্তকারী পুলিশ অফিসার জানিয়েছেন– প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গিয়েছে গণপিটুণিতেই মৃত্যু। কেন গণপিটুণি তার প্রমাণ না পাওয়া গেলেও জানা গিয়েছে, খাবির সেখ হয়তো হঠাৎই অসুস্থবোধ করে। ডাক্তার দেখানোর জন্য ওই পলিক্লিনিকে আসে। কিন্তু ডাক্তার দেখানো নিয়ে খাবির ক্লিনিকের কর্মীদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ে বলে জানা গিয়েছে। তখন এই পলিক্লিনিকের কর্মীরা তাঁকে মারধর শুরু করলে সে ডা. অমিয় কুমার ঘটকের চেম্বারে ঢুকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা বলছেন– চেম্বারের ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয় সে। পুলিশের ২ জন ট্রাফিক ওয়ার্ডেন এসে দরজা খুলতে বললে পাঁচ মিনিট পর খাবির দরজা খোলে। প্রত্যক্ষদর্শী ট্রাফিক ওয়ার্ডেন জানিয়েছেন– দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে পলিক্লিনিকের কর্মীরা তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে খাবিরকে নির্মমভাবে পেটাতে শুরু করে। ওই ২ জন ট্রাফিক ওয়ার্ডেনের বক্তব্য– খালি হাতে তারা খাবিরকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও পারেননি। আধ ঘণ্টা পর বহরমপুর থানা থেকে পুলিশ আসে। তারা অর্ধমৃত খাবিরকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।
 খাবির সেখ যে মোটরবাইকে বহরমপুর এসেছিলেন সেই মোটরবাইকটি বেশ খানিকটা দূরে ব্রিজের কাছে রাস্তার পাশ থেকে পুলিশ উদ্ধার করে। প্রশ্ন উঠেছে– ঘটনাস্থল থেকে দেড় কিমি দূরে মোটরবাইকটি গেল কীভাবে?
অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন– এই মব লিঞ্চিং-এর ঘটনার ভিডিয়ো ক্লিপ ও পুলিশ কথিত সিসিটিভি ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও কেন পুলিশ এখনও পর্যন্ত মাত্র ২ জনকে গ্রেফতার করল? কেন সুরক্ষা পলিক্লিনিকের মানুষ পেটানো বাকি কর্মীদের নামও কেউ উচ্চারণ করছে না? পুলিশ তাদের গ্রেফতার না করুক– কেন আটক করেও সুরক্ষা পলিক্লিনিকের কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদও আইনের রক্ষকরা করছে না? 
ভিডিয়ো দেখে মনে হয়– শুধু পলিক্লিনিকের ভেতর অবস্থানকারী আরও কয়েক ব্যক্তি খাবিরের ওপর নৃশংস হামলায় অংশ নিয়েছিল। তাদের কেন চিহ্নিত করা হচ্ছে না? মানুষের জীবনকে ‘সুরক্ষা’ দেওয়ার জন্য ছিল ওই সুরক্ষা পলিক্লিনিক। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সুরক্ষা নয়– ক্লিনিকের কর্মীরা ভয়ংকর জিঘাংসা নিয়ে হত্যালীলায় মেতে উঠল। 
সবথেকে দুঃখজনক হল– শেষ পাওয়া খবর পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা কিংবা পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা খাবির সেখের পরিবারকে সাহায্য করা তো দূরের কথা– সান্ত্বনা দিতেও তাদের কুঁড়ে ঘরে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। পুলিশ এই মব লিঞ্চিং-এর ঘটনার রহস্যভেদ করবে কিনা– তা প্রকৃতই এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে উঠেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only