বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

বহরমপুরের রবীন্দ্র সদনে জমিয়তের সভায় উপচে পড়া ভিড়

রুবিয়া খাতুন

জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটির ডাকা শান্তি ও একতা সম্মেলন যেন সর্বধর্ম সম্মেলনে পরিণত হল। মঙ্গলবার বহরমপুর রবীন্দ্র সদনে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে যেমন বক্তব্য রাূেন হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি নুরে আলম চৌধুরি, সাংসদ  আহমদ হাসান ইমরান, সাংসদ আবু তাহের খান, শ্রম প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, তেমনই জোরালো বক্তব্য রাখেন বিশ্বকোষ সম্পাদক পার্থ সেনগুপ্ত, অরুণজ্যোতি ভিক্ষু, ফাদার অরিজিৎ হালদার। চারশো বছরেরও পুরনো রাধামাধব মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বিশ্বজিৎ রায়, মাওলানা নিজামুদ্দিন, জেলা পরিষদ কর্মাধ্যক্ষ রাজীব হোসেন। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের রাজ্য সভাপতি ও রাজ্যের গ্রন্থাগার মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরি ছিলেন সকলের মধ্যমণি। সবধর্মের সব নেতা মঙ্গলবার এক সুরে স্লোগান তোলেন, এনআরসি কোনওভাবেই এ রাজ্যে হতে দেব না। অসমের মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরে এনআরসির বিরোধিতায় সকলকে একজোট হয়ে নামতে বলেন।
মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরি বলেন, আমরা প্রত্যেক এলাকায় প্রত্যেক গ্রামে সদ্ভাবনা মঞ্চ তৈরি করব। ১১ জন সদস্যের এই মঞ্চে কমপক্ষে পাঁচজন অমুসলিম সদস্য নিতে হবে। এই কমিটি একে-অপরের সমন্বয় করে কাজ করবে। মসজিদের দরজা খুলে দিতে হবে। ইসলামের উদাহরণ দিয়ে সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরি প্রয়োজনে মসজিদে অমুসলিমদের ভাইদের নিয়ে মিটিং মজলিশ করতে হবে। কোনওভাবেই এ রাজ্যে এনআরসি চালু করতে দেব না। তা সত্ত্বেও নিজেদের কাগজপত্র সংগ্রহ করে রাখার আহ্বান জানান তিনি। খাবির সেখকে পিটিয়ে খুনের পর জেলা প্রশাসন আজও তার বাড়িতে যায়নি। কেন যাবে না? খাবির সেখের পরিবারকে বলেছি, মুখ্যমন্ত্রীর নিকট ক্ষতিপূরণ চেয়ে আবেদন করুন। ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ চাইবে। মুখ্যমন্ত্রীর নজরে হয়তো বিষয়টি নেই। আমি তাঁর নজরে আনব। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর মহাজাতি সদনে কনভেনশন করব। পরে কলকাতায় ১০ লক্ষ মানুষ নিয়ে এনআরসি-বিরোধী সমাবেশ করা হবে। এ ছাড়াও এনআরসি সংক্রান্ত বিষয়ে একটি লিগ্যাল সেল ও একটি অ্যাডভাইসরি টিম তৈরি করা হবে। তাঁরা পরামর্শ দেবেন। 

হিন্দু নেতা রাধামাধব মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বিশ্বজিৎ রায় বলেন, সাধারণ মানুষকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। সুড়সুড়ি দেওয়ার উদ্দেশ্য কিছু পাওয়া। অসমে সুড়সুড়ি দিয়ে ২০১৬ সালে ক্ষমতায় এসে এনআরসি করে এখন লেজে-গোবরে হয়ে গেছে। মানুষ তার ইচ্ছামতো ধর্ম পালন করবে, নিজের ইচ্ছামতো খাবার খাবে। এসবের জন্য রাষ্ট্রের অনুমতি নিতে হবে না।

বৌদ্ধভিক্ষু অরুণজ্যোতি ভিক্ষু বলেন, ভারত একতা-সম্প্রীতির বন্ধন। বর্তমানে যে সময় যাচ্ছে এমন অবস্থা কেউ কল্পনা করিনি। অসমের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে– আমাদের কী করতে হবে। এনআরসি কোনওভাবে এ রাজ্যে করতে দেব না– এই প্রতিজ্ঞা করতে হবে। দিলীপ ঘোষ বলেছেন, ২ কোটি মুসলমান তাড়াবেন। আগে মুসলিম– তারপর খ্রিস্টান– বৌদ্ধ– জৈন সবাইকে তাড়াবে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রায় সব সেক্টর– ব্যাঙ্ক– রেল সহ সব বেসরকারি হাতে তুলে দিচ্ছে। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা তুলে হয়তো কাশ্মীরকেও ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেবে কেন্দ্রীয় সরকার। 

শ্রমমন্ত্রী জাকির হোসেন বলেন, মুর্শিদাবাদে কোনওভাবে এনআরসি করতে দেব না। অসমে এনআরসি করে মানুষকে ডিটেনশন ক্যাম্পে রাূা হয়েছে গরু-ছাগলের মতো। ২০০ জন মানুষ প্রতি একটি বাথরুম। আমরা পিছিয়ে যেতে চাই না। রাজ্য সরকার সহযোগিতা করছে। জেলাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।
খ্রিস্টান ফাদার অরিজিৎ হালদার বলেন, বিচ্ছেদকামী শক্তি আমাদের একতাকে নষ্ট করতে চেষ্টা করছে। এই দেশ আমাদের– এখানে জন্মেছি– এখানে বড় হয়েছি। কেউ এখান থেকে তাড়াতে পারবে না।

রবীন্দ্র সদনের সিট উপচে মেঝে– গলির পরেও বাইরে শতাধিক মানুষের ভিড়ে ঠাসা এই শান্তি ও একতা সম্মেলন মুর্শিদাবাদে যে ঐক্যের বাতাবরণ তৈরি করেছে– তা যেকোনও অশুভ শক্তিকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে। এখন জেলার হিন্দু মহল্লায়ও এনআরসি-বিরোধী হাওয়া রয়েছে। এনআরসি-বিরোধী হাওয়া বিজেপির কাল হবে বলে তারা ঘোষণা করছে। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only