বৃহস্পতিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

৩৭০-কে তিস্ দিন, পাকিস্তান তু আপনে দিন গিন’


গুনে গুনে পাক্কা তিরিশ দিন পার হয়ে গেল। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদাসূচক ৩৭০ ধারা খারিজ এবং ৩৫ এ বাতিল করার পর দেখা যাচ্ছে– মোদি ও অমিত শাহ আতঙ্কবাদী গোষ্ঠীগুলি এবং সেইসঙ্গে পাকিস্তানকে একেবারে চুপ করিয়ে দিয়েছেন। তাই যথার্থভাবেই মোদি ও শাহের সমর্থকরা উল্লাসভরে এক নতুন স্লোগান মার্কেটে ছেড়েছেন। আর তা হল– ‘৩৭০-কে তিস্ দিন– পাকিস্তান তু আপনে দিন গিন’। অর্থাৎ কাশ্মীরে পাকিস্তান আর কিছুই করতে পারছে না– পারবে না। এখন বরং ভারতের উচিত হবে পাকিস্তানেরও ‘শেষের সে দিন’-কে তরান্বিত করা। সম্ভব হলে নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে একেবারে মানচিত্র থেকেই পাকিস্তানকে মুছে ফেলা। তাই এই সতর্কবাণী­ ‘পাকিস্তান তু আপনে দিন গিন’। 
প্রথম দিকে কাশ্মীর উপত্যকায় বেশ কিছু বিক্ষোভ হয়। বিশেষ করে জুম্মা ও ঈদের দিনে। আর তা দমন করতে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী পেলেট গান ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করে বলে বিদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বেশ কিছু কাশ্মীরি আহত হয় বলে বিবিসি– ওয়াশিংটন পোস্ট ও ইনডিপেনডেন্ট-এর মতো বিদেশি মিডিয়া দাবি করে। এই তথ্যগুলো যাচাই করার মতো তেমন কোনও উপায় ছিল না। কারণ উপত্যকার সংবাদপত্র ‘গ্রেটার কাশ্মীর’– ‘ব্রাইটার কাশ্মীর’-এর মতো স্থানীয় পত্রিকা ও পোর্টালগুলি একপ্রকার বন্ধ রয়েছে। আর জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ইন্টারনেট– মোবাইল ও ল্যান্ডফোনের সার্ভিস সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়– যা ৩০ দিন পরও কম-বেশি কায়েম রয়েছে। কিছু ল্যান্ড ফোন উপত্যকায় চালু করা হয়েছে বলে সরকারের দাবি। কাশ্মীরে প্রশাসক তথা রাজ্যপাল সত্যপাল মালিক বলেছেন– মোবাইল ফোন সন্ত্রাসবাদীরাই ব্যবহার করে। কাজেই বন্ধ না রেখে উপায় কী! ফলে দেশের গণমাধ্যমগুলিকেও নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারের বিবৃতির ওপর। ভারত বিরোধী ‘বিবিসি’– ‘দ্য ইনডিপেনডেন্ট’ প্রভৃতি সংবাদমাধ্যম সম্পূর্ণ এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরতে চাইছে। আর তারই ছেঁায়া লেগেছে ভারতেরও কয়েকটি সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলে। যেমন দ্য টেলিগ্রাফ– ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস– এনডিটিভি প্রভৃতি সংবাদপত্র ও চ্যানেল বলছে কাশ্মীরিদের ওপর নাকি সেনাবাহিনী প্রবল অত্যাচার চালাচ্ছে। শত শত কাশ্মীরি তরুণদের গ্রেফতার করা হয়েছে। কাশ্মীরিদের ওপর চলছে নির্যাতন। বিবিসি তাদের ইংরেজি– হিন্দি– উর্দু ও বাংলা ওয়েবসাইটে এমন কিছু নির্যাতনের ছবি আপলোড করেছে এবং সেইসঙ্গে  ভিডিয়ো ও ভয়েস রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে এমন কিছু চিত্র তুলে ধরেছে– যা সত্যিই মর্মন্তুদ। তাদের উদ্ধৃত করে আনন্দবাজার-এ প্রকাশিত হয়েছে যে– উপত্যকার তরুণদের প্রবল নির্যাতন করে মাইকে তাদের আর্তনাদ শোনানো হচ্ছে মহল্লার কাশ্মীরিদের– যেন কেউ আর টুঁ শব্দটি না করে। 
অবশ্য এসব ছবি ভিডিয়ো সত্যি কিনা– তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে। ফোটোশপ ছবি ও ফেক ভিডিয়োর রমরমা এখন বিশ্বজুড়ে। আমাদের সেনাবাহিনীর মুখপাত্ররা সাফ বলে দিয়েছেন– ভারতীয় সেনাবাহিনী একটি প্রফেশনাল বাহিনী। তারা সবসময় মানবাধিকার রক্ষায় সচেষ্ট এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী কোথাও মানবাধিকার হরণ করেছে– এমন কথা কেউ বলতে পারবে না।
অবশ্য বিবিসি-র রিপোর্টের বিক্ষোভ ও পেলেট গান ব্যবহারের ছবিকে প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে এক বিবৃতি দিয়ে তা খানিকটা স্বীকার করে নিয়েছিল প্রশাসন। 
রাজ্যপাল (পরে অবশ্য কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের প্রশাসক হিসাবে লেফটেন্যান্ট গভর্নর বলা হবে) বলেছেন– কাশ্মীরে একজনও মানুষ বিগত ৩০দিনে মারা যায় নি। সন্ত্রাসবাদীরাও একটি ছাড়া আর কোনও হামলায় লিপ্ত হয়নি। কাজেই কাশ্মীরের জনগণ ৩৭০ ধারা ও ৩৫এ ধারা বিলোপকে মেনে নিয়েছেনই বলা যায়। সেখানে এখন শান্তি বিরাজ করছে। 
বিদেশি সংবাদপত্রগুলি বলেছে– কাশ্মীরে কমপক্ষে ৩জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে।  তাদের পরিবারের ভিডিও ও বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলি বলছে– কাশ্মীরে নাকি ৭জন বাসিন্দা পিছু ১জন করে সেনা বা আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। এই বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলি ভুলে যাচ্ছে– কাশ্মীর যেহেতু একটি স্পর্শকাতর অঞ্চল– রয়েছে অগ্নিগর্ভ সীমান্ত ও নিয়ন্ত্রণ রেখা-- কাশ্মীরে সেনাদের আধিক্য সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত। 
কাশ্মীরে ৩০দিন পরও স্কুল-কলেজ-অফিস-আদালত খোলেনি। খোলেনি দোকানপাট। এবং রাস্তায় মানুষের দেখা নেই বললেই চলে। তবে মাঝেমধ্যে খিড়কির দরজা দিয়ে মহিলাদের উঁকি-ঝুঁকি অবশ্য ফোটোগ্রাফাররা লেন্সবন্দি করে চলেছেন। বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলির বক্তব্য– উপক্যকায় কার্ফুর মতো পরিস্থিতি এখনও বিদ্যমান রয়েছে। তবে কেন্দ্রশাসিত কাশ্মীরের রাজ্যপাল ঘোষণা করেছেন ৫০ হাজার জম্মু-কাশ্মীরের তরুণকে শীঘ্রই চাকরি দেওয়া হবে। কাশ্মীরে বিনিয়োগ ও উন্নয়নের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রের উদ্যোগপতিরা ঘোষণা করেছেন তারা কাশ্মীরের পর্যটকদের জন্য আরও রিসোর্ট ও হোটেল তৈরি করবেন। 





ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-ও অবশ্য বসে নেই। তিনি কাশ্মীরে উন্নয়ন যজ্ঞ শুরু করার জন্য জম্মু-কাশ্মীরের কিছু পঞ্চায়েত প্রধান ও পঞ্চায়েত সদস্যকে ৩ সেপ্টেম্বর উড়িয়ে এনেছিলেন নয়াদিল্লিতে। এই জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  অমিত শাহ বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আশা করা যায় তা বাস্তবায়িত হলে জম্মু-কাশ্মীরে এতোদিন  যা একেবারে হয়নি– কেন্দ্রের শাসনে তা হবে। অর্থাৎ কাশ্মীরিদের উন্নয়ন ও বিকাশের স্বপ্ন পূরণ হবে আর পাকিস্তান প্রশাসিত কাশ্মীরের মানুষ বুঝবে উন্নয়ন ও গণতন্ত্র চাইলে ভারতের সঙ্গে যোগ দেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনও বিকল্প নেই। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only