রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

নাবালকের তন্ত্রসাধনার বলি আর এক নাবালক

নাবালক তন্ত্রসাধক রতন নায়েক ও তার পরিবারের পরিকল্পিত ছকে খুন হল সাত বছরের রুদ্র নায়েক। এমনটাই অভিযোগ। ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়গপুর গ্রামীন থানার অন্তর্গত নিরঞ্জনবাড় গ্রামে। 

চৌদ্দ বছরের বালক রতনের ওপর ভর করে দেবতা। কখনও কালী, কখনও মনসা কখনও বা শীতলা ভর করত তার ওপর। এমনটাই দাবি করেছিল বাড়ির লোকেরা। কিছুদিনের মধ্যে মানুষের মুখে মুখে নামও ছড়িয়েছিল নাবালকের। ছেলের সৌজন্যে বাড়িতে উপার্জনও বাড়ছিল দিন দিন। মিলছিল অতিরিক্ত খাতিরও। ছেলের নাম ছুটছিল আশেপাশের পাঁচটা গ্রামে। দেবতার কথা অভ্রান্ত। রতন যা বলছে তা আসলে দেবতা তাঁকে দিয়ে বলাচ্ছেন। রটনা হয়েছিল সে কথা। সেই মতো রতনও আগাম বলে দিত নানা আশঙ্কা ও অশান্তির খবর। অনেক সময় তা নাকি মিলেও যাচ্ছিল। ফলে গ্রামের মানুষের  বিশ্বাস বাড়ছিল দিন দিন। তবে এই রতনের আগাম সতর্কতা যে তৈরি করা ছক– তা ঘুণাক্ষরেও ধরতে পারেনি গ্রামের কেউ। হাতে হাতে মোবাইল ঘুরলেও– শস্তায় ইন্টারনেট মিললেও– কুসংস্কার কিন্ত আজও ছড়িয়ে রয়েছে দেশজুড়ে। নাগরিক জীবনের থেকে গ্রাম্য জীবনে সে কুসংস্কার যে খানিকটা বেশি তাতে সন্দেহ নেই। 

নিজেদের সমস্যার সমাধান করতে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসছিল নাবালক ‘ভন্ড তান্ত্রিক’ রতনদের বাড়ি। দক্ষিণা নিয়ে গ্রামের লোকেদের ভবিষ্যত বলে দিত এই নাবালক। বেশ চলছিল ব্যবসা। তাল কাটল শনিবার রাতে। নিজের আধ্যাত্মিক শক্তি সত্য প্রমাণ করতে পাড়ার ৭ বছরের এক শিশুকে খুন করে বসে এই ভণ্ড তান্ত্রিক। উত্তেজিত গ্রামবাসীরা জানতে পেরে চড়াও হয় অভিযুক্তদের বাড়িতে। পুলিশের চেষ্টায় উদ্ধার হয় নাবালক। রবিবার গ্রামবাসদিরা অভিযুক্তদের বাড়িতে ভাঙচুর চালায়।

জানা গিয়েছে, নিরঞ্জনবাড় গ্রামের বাসিন্দা স্বপন নায়েকের নাবালক ছেলে রতন ক'দিন ধরেই বিভিন্ন তন্ত্র সাধনার গল্প শুনিয়ে গ্রামবাসীদের নজরে এসেছিল। ১৪ বছরের বালক রতন নাকি বিভিন্ন লোকের ও পরিবারের ভবিষ্যদ্বাণী করে দিচ্ছিল। কার বাড়িতে কখন চুরি হবে, কখন কারও বাড়িতে আক্রমণ হতে পারে তা সে আগাম বলে দিচ্ছিল । বেশ কিছু জিনিস নাকি তার কথার সঙ্গে মিলেও যাচ্ছিল। আর এতেই গ্রামের েলাকজনের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিল নাবালক রতন নায়েক। এর মাঝখানে শনিবার বিকেলের পর ঘটে গেল অন্য ঘটনা।

প্রতিবেশীর ৭ বছরের শিশু রুদ্র নায়েক শনিবার বিকেলে খেলতে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। অনেক রাত পর্যন্ত না ফেরায় খোঁজাখুঁজি করে রুদ্রর বাবা মা।  রতনের দ্বারস্থ হন তাঁরা। যেহেতু সে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে, তাই তার কাছ থেকে ছেলের সন্ধান জানার চেষ্টা করেন অসহায় মা-বাবা। এরপরই রতন েকান এক দেবীর ভরের নাটক করে। ভরের েঘারে সে জানায় রুদ্রকে দুজন লোক অনেক দূরে নিয়ে চলে গিয়েছ। রুদ্রর পরিবারের েলাকজন কথাটি বিশ্বাস করেনি। কারণ কয়েকদিন আগে রতন নাকি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল এলাকার কোন এক বাচ্চা ছেলের খুব ক্ষতি হতে চলেছে। রুদ্রর পরিবারের লোকজন রতনকে বলেন, তুকতাক করে সে যেন তাঁদের সন্তানকে ফিরিয়ে দেয়। রতন জানায় সেটা সম্ভব নয়। এরপরই পরিবারের লোকজন বলে বসেন বিষয়টা তাহলে পুলিশকেই জানাতে হবে। পুলিশের কথা শুনেই রতনের ভরের ঘোর কেটে যায়। উল্টোপাল্টা কথা বলতে শুরু করে সে। তখনই রুদ্রের বাবা-মা ও প্রতিবেশীরা রতনকে চেপে ধরেন। ভয় পেয়ে সে বলে পাশের ঘরে রয়েছে রুদ্র। সকলে গিয়ে দেখেন রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরের মেঝেতে পড়ে রয়েছে রুদ্র। দ্রুত তাকে উদ্ধার করে খড়গপুর মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসকরা জানান প্রায় তিন ঘন্টা আগে মৃত্যু হয়েছে রুদ্রের। তার মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল।      এর পরে এলাকার লোকজন উত্তেজিত হয়ে আক্রমণ করে রতনের বাড়ি। পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দিতে এসে গ্রামবাসীদের ক্ষোভের মুখে পড়ে। গ্রামবাসীরা দাবি করে অভিযুক্তদের গ্রামবাসীদের হাতে তুলে দেওয়া েহাক। অভিযুক্তদের পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে গ্রামবাসীরা। পুলিশ কোনওমতে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে পরিবারের আট সদস্য সহ অভিযুক্তকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।

পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে স্বপন নায়েকের ছেলের ভবিষ্যদ্বাণীকে বিশ্বাসযোগ্য করে েতালার লক্ষ্য নিয়েই প্রতিবেশীদের বাড়িতে চুরি– ইট বৃষ্টির মতো বিভিন্ন রকম ঘটনা ঘটাতো তার পরিবারের লোকজন। যে সমস্ত কাজ গুলি পরে ঘটানো হবে তা আগাম জানিয়ে দিত স্বপন নায়েকের ছেলে রতন নায়েক। রুদ্র নায়েককে যে খুন করা হবে তা আগাম ঘোষণা করেছিল রতন। সে বলেছিল– এলাকার একটি নাবালকের চরম ক্ষতি হতে পারে। পুলিশ জানতে পেরেছে শনিবার বিকালে প্রসাদের লোভ দেখিয়ে ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে রুদ্রকে ভারী কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করে খুন করা হয়েছে। রাতেই তার দেহ অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও প্রতিবেশীদের নজরদারির কারণে শেষ পর্যন্ত এই ছক বানচাল হয়ে যায়। রবিবার বিকেল থেকে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয় । গ্রামবাসীরা অভিযুক্তদের বাড়ি ভেঙে ঢুকে সমস্ত জিনিস লণ্ডভণ্ড করে দেয় । ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় সমস্ত জিনিসপত্র । পরিস্থিতি সামাল দিতে বেগ পেতে হয়েছে পুলিশকে । 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only