সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

বায়োমেট্রিক হাজিরা পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে উপাচার্য ও শিক্ষক কাজিয়া তুঙ্গে: কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়

নিজস্ব সংবাদদাতা, কল্যাণী: কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োমেট্রিক হাজিরা নিয়ে আন্দোলন অব্যাহত। কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শিক্ষকরা তাঁদের অভিযোগ উগরে দিচ্ছেন। বেশ কয়েকদিন ধরেই লাগাতার আন্দোলনের পথকে বেছে নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা। সূত্রের খবর, বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠনমূলক আরো অন্যান্য কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও কেবলমাত্র শিক্ষকদের কব্জায় আনার জন্য কর্তৃপক্ষ একচেটিয়াভাবে শিক্ষকদের মতামতকে অমান্য করে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে হাজিরার ব্যবস্থা করতে চাইছেন। অথচ পশ্চিমবঙ্গের কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকদের হাজিরার কোন ব্যবস্থা নেই। কিংবা এ বিষয়ে এখন অব্দি কোন ধরনের সরকারি নির্দেশিকাও জারি হয়নি।

কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে জানা গেছে, এতদিন আন্দোলন চলছিল কোন ধরনের ক্লাস বন্ধ না করে। কর্তৃপক্ষকে আমরা আমাদের দাবি-দাওয়া জানিয়েছিলাম এবং বায়োমেট্রিক বিষয় নিয়ে পুনর্বিবেচনা করার যথাযথ সময় দিয়েছি। এখনো অব্দি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোন ধরনের সদুত্তর আমরা পাইনি। আগামী দিন থেকে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ শিক্ষক স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হ‌ওয়াই আগামীকাল থেকে শিক্ষকমন্ডলীরা পেন-ডাউন বা সার্বিক বয়কটের পথ বেছে নিয়েছেন।
শিক্ষকদের মধ্যে অধিকাংশের দাবী, শেষ দু-তিন বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নানান ধরনের অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত শিক্ষকদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। শিক্ষকদের মতামতকে অগ্রাহ্য করে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য নিজের খামখেয়ালিপনায় নিজেদের কয়েকজন অত্যন্ত অনুগতদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। প্রসঙ্গত বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিকাঠামো ও শিক্ষার গুণগত মান শেষ কয়েক বছরে তলানিতে ঠেকেছে। এনআইআরএফ তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয় ৪৬ থেকে পৌঁছে গেছে ১০০ কাছাকাছি। গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিকাঠামো নিয়ে বিতর্কের সূচনা এর আগেই হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলগ্ন থেকেই শিক্ষক মহাশয়দের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দেওয়ার প্রথা চালু নেই। রাজ্যে কেন্দ্রীয় বা রাজ্যস্তরীয় কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই এই প্রথার প্রচলন নেই।
তাছাড়া শ্রেণিকক্ষে কেবল পঠন-পাঠন ছাড়াও শিক্ষক মহাশয়দের গবেষণা সংক্রান্ত এবং গবেষকদের নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের বাইরেও নানান ধরনের কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি কর্তৃপক্ষের কাছে দুটি দাবি পেশ করেছিলেন। গত সপ্তাহের সোমবারের মধ্যে শিক্ষকদের বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন খারিজ করার পদ্ধতি চালু করতে হবে এবং শিক্ষকদের হাজিরা বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নথিভুক্ত করা যাবে না। নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আজ সোমবার অবধি কর্তৃপক্ষ কোন ধরনের সিদ্ধান্ত শিক্ষকমন্ডলী দের জানাইনি। উল্টে বায়োমেট্রিক হাজিরা চালু জন্য চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। উপাচার্যের শিক্ষকমন্ডলীর সঙ্গে অসহযোগিতা এবং এই একগুঁয়েমি ভাবের জন্য সমস্ত শিক্ষক ইউনিট এক ছাতার তলে চলে এসেছে। যেখানে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী কয়েক বছর আগে জানিয়েছিলেন শিক্ষকদের হাজিরার ব্যাপারটি তাদের বিবেকের উপর ছেড়ে দেওয়া হলো, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের অনমনীয় ভাব, শিক্ষকদের বিভিন্ন স্বার্থ ক্ষুন্ন করে বিভিন্ন গঠনমূলক ইস্যুতে শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে ডিসিশন নেওয়া  এবং শিক্ষকদের প্রতি চরম ধরনের দূরাচার তাদেরকে এই আন্দোলনের পথের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন তাদের বক্তব্যে জানিয়েছেন, 'বায়োমেট্রিক অ্যাটেনডেন্স' এর মতো কর্পোরেট সংস্কৃতির প্রণয়ন না করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষণ ও গবেষণা মানোন্নয়নে কর্তৃপক্ষের বর্তমান চটকদারি ক্রিয়া-কলাপ বন্ধ রেখে প্রকৃত জ্ঞানার্জ্জনের জন্য পরিবেশকে উন্মুক্ত করা উচিত। এর জন্য প্রয়োজন - বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনে উপাচার্য কেন্দ্রিক কর্মপদ্ধতির বিকেন্দ্রীকরণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্টাটুটরী কমিটিগুলোকে যথা এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল, কোর্ট, ফ্যাকাল্টি কাউন্সিল, আন্ডারগ্র্যাজুয়েট
বোর্ড অফ স্টাডিস, ফিনান্স কমিটি ইত্যাদি নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের দিয়ে পূরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা।
সেইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি:(?)-র প্রকল্পগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অন্ধকারে না রেখে, সেগুলির বাস্তব পরিকল্পনা ও
ব্যয় সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের মতামত ও বিশেষজ্ঞতাকে মূল্য দেওয়া উচিত বলে তাঁরা মনে করেন।
গবেষণার ক্ষেত্রে পিএইচডি নির্ধারিত রেগুলেশনকে, ডিপার্টমেন্টাল রিসার্চ কমিটির সিদ্ধান্তকে মান্যতা দেওয়া, পিএইচডি কোর্সওয়ার্কের ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তিতা ফিরিয়ে আনা ও গবেষকদের ওপর অকারণে চাপ লঘু করা।
তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বমোট ৩০৫ টি শিক্ষক পদের ১১৭ সংখ্যক শূন্যপদ অবিলম্বে পূর্ণ করা উচিত বলেও তারা তাদের লিফলেটে দাবী করেছেন।  নির্দিষ্ট সময়ের ভিত্তিতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রমোশনের পদ্ধতি ত্বরান্বিত করার কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লাগাতার বিক্ষোভ কর্মসূচি জারি ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের নিচে বিক্ষোভ কর্মসূচির সূচনা হয়। দুপুর নাগাদ সমস্ত শিক্ষক উপাচার্যের মূল দরজায় উপস্থিত হন। দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি। আগামীকাল শিক্ষকরা 'পেন ডাউন' অবস্থান-বিক্ষোভ নেবেন। হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশ শিক্ষক‌ই আজকে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে হাজিরা দেননি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only