বুধবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

ক্রিকেটের নেশা থেকে বানালেন আস্ত স্টেডিয়াম! পড়ুন বীরভূমের মহিম শেখের কাহিনি


কৌশিক সালুই 

১৯৮৩ সালে প্রথমবারের জন্য ভারত ক্রিকেটের বিশ্বকাপ লাভ করল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে। সারা ভারতের সঙ্গে সঙ্গে বীরভূমের  অখ্যাত গ্রাম বড়  গুনসিমাও আনন্দে মাতোয়ারা হয়েছিল। আর ওই গ্রামেরই পাঁচ বছর বয়সী এক শিশু ক্রিকেট নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল। প্রথমে  বাবার হাতে তৈরি ব্যাট এবং টেনিস বল দিয়ে পাড়ার সমবয়সী এবং দাদাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলার শুরু। সেই খেলার নেশা থেকে আন্তর্জাতিক বা জাতীয় স্তরের কোনো খেলোয়াড় না হলেও নিজেই বানিয়ে ফেলেছেন একটা আস্ত স্টেডিয়াম। খেলার মাঠের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেট কোচিং একাডেমিও  খুলেছেন তিনি।  অখ্যাত এক গ্রামে স্টেডিয়ামের পরিকাঠামো দেখে সিএবি পর্যন্ত তাজ্জব হয়ে গিয়েছে এবং তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ভবিষ্যতে সিএবি প্রতিযোগিতার ম্যাচ ওই স্টেডিয়ামের জন্য ভাবা হবে। 
     
 মহিম শেখ। বাড়ি বীরভূমের সদাইপুর থানার বড় গুনসিমা গ্রাম। এলাকার সম্ভ্রান্ত চাষির পরিবারের ছেলে। আর পৈত্রিক জমি দিয়ে বানিয়ে ফেলেছেন একটি স্টেডিয়াম। বর্তমানে প্রায় ৩২ বিঘের বেশি জমি দিয়ে সেই কাজ করেছেন। ইতিমধ্যেই দুটি গ্যালারি তৈরি হয়ে গেছে এবং তৃতীয় গ্যালারির নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের দিকে। রাতের খেলার জন্য ছটি ফ্লাডলাইট লাগানো হয়েছে। অত্যাধুনিক জিমও করেছেন। তাছাড়া সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল মহিম বাবু ওই স্টেডিয়ামে ক্রিকেট কোচিং একাডেমি খুলেছেন। নাম এম জি আর ক্রিকেট কোচিং একাডেমি।  বাংলার প্রাক্তন রঞ্জি ক্রিকেটার তথা বীরভূমের ভূমিপুত্র প্রবাল ঘোষ সেখানে কোচ হিসেবে নিযুক্ত। ওই একাডেমি থেকে বীরভূম জেলার কয়েকজন, বাংলার বয়স ভিত্তিক ক্রিকেট দলে স্থান করে নিয়েছেন।  দুস্থ এবং প্রতিশ্রুতিমান  যারা,  তাদের সমস্ত দায়িত্ব এমজিআর ক্রিকেট একাডেমির পক্ষ থেকে নেওয়া হয়। উন্নত মানের ক্রিকেট একাডেমিতে যে সমস্ত পরিকাঠামোর থাকা দরকার তার সমস্ত কিছু আছে এমজিআর ক্রিকেট একাডেমিতে। প্রাক্তন ক্রিকেটার সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজু বন্দ্যোপাধ্যায় ওই স্টেডিয়াম ঘুরে দেখে গিয়েছেন। পাশাপাশি বিসিসিআইয়ের অন্যতম পিচ কিউরেটর আশীষ ভৌমিক ওই স্টেডিয়ামের ক্রিকেটের পিচ দেখে প্রশংসা করেছেন।  মহিম বাবুর বয়স চল্লিশ পার হয়ে গেলেও এখনও নিয়মিত ক্রিকেট খেলেন। তার ছেলে, ভাইপো এবং ভাগ্নে জেলাতে সুনামের সঙ্গে ক্রিকেট খেলেন। ওই একাডেমির ক্রিকেটাররা শুধু রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় নয়, প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের ক্রিকেট কোচিং একাডেমির বিভিন্ন দলের সঙ্গে মৈত্রী কাপ প্রতিযোগিতা প্রতিবছর নিয়ম করে খেলেন।
এম জি আর  ক্রিকেট কোচিং একাডেমির পাশাপাশি সেখানে একটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল তিনি তৈরি করেছেন। পড়ুয়াদের বয়স ১০ বছর হলেই তার একাডেমিতে ক্রিকেটের তালিম নিতে পারবে।

ক্রিকেটের পাশাপাশি তিনি ফুটবলের গুণগ্রাহী। প্রতিবছর নিয়ম করে ফুটবল প্রতিযোগিতা করেন। যে প্রতিযোগিতায় প্রচুর বিদেশি ফুটবলার নিয়মিত অংশগ্রহণ করে। সৈয়দ নইমউদ্দীন, সুব্রত ভট্টাচার্য, শিশির ঘোষ, সংগ্রাম মুখার্জি সহ প্রচুর প্রাক্তন ভারত বিখ্যাত ফুটবলার তার স্টেডিয়াম ঘুরে দেখে গিয়েছেন।  অখ্যাত গ্রামে স্টেডিয়ামের পরিকাঠামো দেখে সকলেই প্রশংসা করেছেন।


২০১০ সাল থেকে স্টেডিয়াম তৈরির কাজ শুরু হয়। বীরভূম জেলা পরিষদ ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে স্টেডিয়াম এর পরিকাঠামো নির্মাণে সহায়তা করেছে। যদিও বাকি খরচ মহিম  শেখ নিজেই করে চলেছেন। কৃষি কাজের পাশাপাশি তার ফ্লাইঅ্যাস ইটের কারখানা, জামা কাপড়ের ব্যবসা আছে। এর সঙ্গে তিনি দুবরাজপুর পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ।

মহিম  শেখ বলেন, "ছোট বয়সেই ক্রিকেট নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম। পৈতৃক জমি দিয়ে একটু একটু করে বানিয়ে ফেললাম এক স্টেডিয়াম। যেখানে ক্রিকেট কোচিং একাডেমি আছে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে প্রচুর প্রতিশ্রুতিমান ছেলেরা এখান থেকে ক্রিকেটের তালিম নেন। এখান থেকে কয়েকজন বাংলা দলে খেলার সুযোগ পেয়েছে। যেভাবে স্টেডিয়ামে পরিকাঠামো নির্মাণ করেছি তাতে সকলের প্রশংসা পেয়েছি। আমি সিএবির কাছে অনুরোধ করছি তাদের যে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা বা ম্যাচ হয় তা এই স্টেডিয়ামে করার সুযোগ দেওয়া হোক। তাহলে জেলার ক্রিকেট খেলার অনেক মান উন্নয়ন হবে। যেটা ভবিষ্যতে বাংলা তথা ভারতবর্ষের কাজে লাগবে।''

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only