সোমবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৯

বাবরি ধ্বংসের আগে শেষ ইমামের সাক্ষাৎকার (১)


বাবরি ধ্বংসের পর কীভাবে মসজিদের শেষ ইমামের দুই পুত্রকে খুন করা হয়েছিল? ওই পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের দিন কাটছে কীভাবে? সেই সব না জানা মর্মান্তুদ
ঘটনা তুলে ধরেছেন ‘দ্য প্রিন্ট’-এর প্রতিবেদক শিখা ত্রিবেদি। তারই ভাষান্তর পুবের কলম-এর এই প্রতিবেদন।

বাবরি মসজিদের শেষ ইমাম ছিলেন হাজি আবদুল গফফার। ১৯৪৯-এর সেই রাত পর্যন্ত তিনিই ছিলেন বাবরির ইমাম। যে রাতে গোপনে মসজিদে ঢোকানো হয়েছিল রাম লালার মূর্তি। মসজিদের মাঝখানের গম্বুজের ঠিক নীচে রাখা হয়েছিল শিশু রামের মূর্তি। জেলা প্রশাসন একজন পুরোহিতকে নিত্য পুজো করার অনুমতিও দিয়েছিল। সবটার সাক্ষী ছিলেন বাবরির শেষ ইমাম। 
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কিছুদিন আগের কথা। ‘দ্য প্রিন্ট’-এর প্রতিবেদক শিখা ত্রিবেদি দেখা করতে গিয়েছিলেন বাবরির শেষ ইমামের সঙ্গে। তাঁর সামনে ইমাম বলেন, ‘অযোধ্যা কখনও যুদ্ধ দেখেনি। কিন্তু আমি নিজে ওই ঘটনার পর দেখলাম রক্তপাত। কেবল এখানে নয়, যে জায়গাটাকে রামজন্মভূমি বলে মনে করা হয় সেই অওধেও ঝরল রক্ত। রক্ত ঝরল তার বাইরেও। ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর হাজার হাজার নয়া রামভক্ত করসেবক ধ্বংস করে দিল বাবরি মসজিদ।’ 
জমায়েত হল বিজেপি, আরএসএস, ভিএইচপি-র মতো দল ও সংগঠনগুলি। করসেবকরা দাবি করল, ষোড়শ শতকের এই মসজিদটি তৈরি করেছিলেন মুঘল সম্রাট জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের সেনাপতি মীর বাকি। তাঁর বাহিনী বৈষ্ণব মন্দির ধ্বংস করে সে জায়গায় বানিয়েছিল এই মসজিদ। একদিকে বৈষ্ণব মন্দির দাবি করলেও এখানেই যে রাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সে দাবি ছাড়তেও নারাজ তারা। 
নরসীমা রাওয়ের জমানায় সরকার মসজিদ সংলগ্ন ৬৭ একর বিতর্কিত জমি দখল করে। যার মধ্যে ২.৭৭ একর বাবরির বিতর্কিত জমিও ছিল। বাবরি ধ্বংসের পর অযোধ্যাকে কার্যত সশস্ত্র বাহিনীর দুর্গে পরিণত করা হয়েছিল। 
২০১৪-য় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ফের চেগে ওঠে বাবরির জায়গায় রামমন্দির বানানোর হুজুক। ২০১৭-য় নিত্যগোপাল দাসকে রাম জন্মভূমি ন্যাসের সভাপতি বানানো হয়। এই সংগঠনটি তৈরি হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। প্রস্তাবিত রামমন্দিরের দেখভালের উদ্দেশেই এই সংস্থাটি বানানো হয়েছিল। বাবরির রায় কী হবে তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন সেখানকার মুসলিমরা। এই মসজিদের শেষ ইমাম হাজি আবদুল গফফারের নাতিরাও জানালেন কী চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে তাঁদের। শেষ ইমামের নাতি শাহিদ জানালেন, আমার দাদু ভাঙা হৃদয়ে ইন্তেকাল করেছেন। আল্লাহর অশেষ রহমত যে, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দিন কয়েক আগেই তিনি চলে গিয়েছেন না ফেরার দেশে। কিন্তু তাঁর দুই ছেলে, অর্থাৎ আমার আব্বা-চাচাদের ভাগ্যে সে রহমত জোটেনি। আমার আব্বা মুহাম্মদ সাবির এবং চাচা মুহাম্মদ নাজির---দাদুর মতো এত সৌভাগ্যের অধিকারী ছিলেন না। বাবরি ধ্বংসের সেই বিভীষিকাময় রাতে করসেবকরা আমার আব্বা-চাচাকে তাড়া করে হত্যা করে। আমাদের বাড়ির ঠিক পাশে অযোধ্যা-ফৈজাবাদ রোডে তাঁদের খুন করা হয়। জানান বাবরির শেষ ইমামের নাতি। এই ঘটনার সময় শাহিদ ছিলেন ২২ বছরের তরতাজা তরুণ। 
বাবরির শেষ ইমামের নাতিকে এখন টোটো চালিয়ে দিন গুজরান করতে হয়। তিনি জানান, চোখের সামনে সব ধ্বংস হয়ে গেল, ‘আমাদের একটা কাঠ চেরাইয়ের কল ছিল। সেটা ওরা জ্বালিয়ে দিল। এখনও তার চিহ্ন পড়ে রয়েছে। ভেঙে পড়া ইট, কাঠ, লোহার উপর পড়েছে ঘাসের আস্তরণ। যে কেউ গেলেই দেখতে পাবেন।’ 
তিনি আরও বলেন, ‘যা কাঠ ছিল এবং কাঠ চেরাই মেশিন সমেত প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ টাকার সম্পত্তি পুড়ে শেষ হয়ে গিয়েছে। আব্বা-চাচাকে মেরেছিল ওরা। তার বিনিময়ে সরকার আমাদের দিয়েছিল মাত্র ২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ। এরপর আমরা ফের কারখানা চালু করতে চেষ্টা করি। কিন্তু বনদফতর অনুমতি দেয়নি। ওরা বলল কাগজ দেখাও। লাইসেন্স দেখাও। দেখাব কী করে, করসেবকরা যে সবকিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সব শেষ করে দিয়েছিল। ফলে আমাদের হাতে কোনও কাগজ ছিল না। সেলস ট্যাক্সের কাগজ, কাঠ কেনার কাগজ---সবকিছুই পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।’
এক সময় শাহিদরা ছিলেন অযোধ্যার অন্যতম সম্ভ্রান্ত পরিবার। এক ডাকে তাঁর দাদুকে চিনত সকলে। তাঁর আব্বা-চাচার যথেষ্ট সম্মান ছিল। অথচ এখন অযোধ্যা-ফৈজাবাদের রাস্তায় টোটো চালিয়ে বেড়াতে হয় তাঁকে। এটাই তাঁর দিন গুজরানের একমাত্র উপায়। বাবরি ধ্বংসের পর ১৬ জন মুসলিমকে কেবল অযোধ্যাতেই খুন করা হয়েছিল। পুলিশ ময়নাতদন্তও করেছিল। নিহতদের কবরের বন্দোবস্ত করেছিল প্রশাসন। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই খুনের ঘটনায় কোনও তদন্ত হয়নি। একজনকেও এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়নি। কারও বিরুদ্ধে দায়ের হয়নি মামলা। সপা-বসপা এই দলকেই বিজেপি মুসলিম পন্থী বলে অভিযোগ করে। অথচ তারা সরকারে থাকাকালীনও একজনের বিরুদ্ধেও কোনও মামলায় দায়ের হয়নি। এমনটা জানিয়েছেন স্থানীয় সংবাদপত্র ‘জন মোর্চা’ দৈনিকের সম্পাদক শীতলা সিং। (ক্রমশ)
পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব- ধ্বংসের সেই আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে বাবরির শেষ ইমামের নাতিকে (২)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only