মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৯

ধ্বংসের সেই আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে বাবরির শেষ ইমামের নাতিকে (২)

বাবরি মসজিদের শেষ ইমাম আবদুল গফফারের নাতি শাহিদ

বাবরি ধ্বংসের পর কীভাবে মসজিদের শেষ ইমামের দুই পুত্রকে খুন করা হয়েছিল? ওই পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের দিন কাটছে কীভাবে? সেই সব না জানা মর্মন্তুদ ঘটনা তুলে ধরেছেন ‘দ্য প্রিন্ট’-এর প্রতিবেদক শিখা ত্রিবেদি। তারই ভাষান্তরের দ্বিতীয় পর্ব পুবের কলম-এর এই প্রতিবেদন।


বাবরি রায়ের প্রত্যাশায় থমথমে অযোধ্যা। আপনারা কি বাবরির দাবি ছেড়ে দিতে চায়ছেন? প্রতিবেদকের এই প্রশ্নের জবাবে বাবরির শেষ ইমামের নাতি বলেন, আব্বা-চাচা এবং দাদুর ওপর যে অবিচার হয়েছে তার বিচার চাই। ‘আমরা যদি সব দাবি ছেড়ে দিই তাহলে তা হবে দাদুর স্মৃতির প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা। হিংসা এবং বিদ্বেষে সেদিন ভেঙে দেওয়া হয়েছিল বাবরি মসজিদ। একথা খানিকটা ঠিক যে, আমি তেমন ভয়াবহভাবে এই হিংসার শিকার হয়নি। তবে আজও সেদিনের ভীতি তাড়া করে বেড়ায় আমাদের।’ অওধ অঞ্চলের একটি জায়গার নাম অযোধ্যা। এই অওধে মুসলিম অভিজাতদের দান করা বহু জমিতে গড়ে উঠেছিল মন্দির। হনুমানগরহি তেমনই একটি মন্দিরের নাম। এটি অযোধ্যার সবথেকে বড় মন্দির। সুন্দর ভবন মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল পড়শি বস্তি জেলার অভিজাত পরিবারের আনুকুল্যে। গোটা কাজটি তদারকি করেছিল মনু মিঞা। তিনি ছিলেন শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। আমৃত্যু তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করে গিয়েছিলেন। জীবদ্দশায় বাবরির অন্যতম মামলাকারী হাসিম আনসারি এবং দিগম্বর আখরার রামচন্দ্র পরমহংশের  সম্পর্কে চিড় ধরেনি। ২০০৩-এ মৃত্যু হয় রামচন্দ্র পরমহংশের। ততদিন তাঁদের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক অক্ষুন্ন ছিল। আদালতে মামলা চললেও ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা এই তিক্ততা দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এখন বাতাসে বিদ্বেষ। ফলে নতুন করে সমস্যার গন্ধ পেলেই শাহিদ তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের পাঠিয়ে দেন প্রতিবেশি গোন্ডা জেলায়। তিনি জানান, ‘প্রতিবছর ৬ ডিসেম্বর করসেবকরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে আমাদের এলাকায় মিছিল করে। পাকিস্তান চলে যাওয়ার হুমকি দেয়। সেদিনের সেই আতঙ্ক আমাদের ছেড়ে যেতে চায়ছে না।'


আমাদের মধ্যে সেই সু-সম্পর্ক আর নেই। পারস্পরিক দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছে। জানান ৭৮ বছরের ওয়ালিউল্লাহ খান। এলাকায় তিনি পরিচিত লালা দরজি হিসাবে। জনপ্রিয় দরজি হলেও আলাদা করে তাঁর কোনও দোকানঘর নেই। টিনের ছাউনির বাড়িতেই তাঁর দোকান। বাবরির বিতর্কিত জমির লাগোয়া তাঁর বাড়ি। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরে তাঁর বাড়িতে লুটপাঠ চালিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। ওয়ালিউল্লাহ এমনভাবে কথা বলছিলেন, যেন দেখতে পাচ্ছিলেন সেদিনের সেই বিভীষিকা। ধুষর দু’চোখে ঘোরলাগা দু’স্বপ্ন। ‘১৯৯২ এর ৭ ডিসেম্বর আমি চোখের সামনে দেখলাম লেলিহান আগুন গিলে ফেলল আমার ঘরটাকে।’ সেদিন তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে অবশ্য বাঁচিয়েছিল একটি হিন্দু পরিবার। সে কথাও জানান তিনি। ‘অযোধ্যার হিন্দুদের সঙ্গে আমার খুবই সদ্ভাব ছিল।ওরা আমার কাছেই কাপড় সেলাই করতে আসত। আমরাও গৃহস্থলির সামগ্রী হিন্দুদের দোকান থেকেই কিনতাম। আমরা পরস্পরকে নিজেদের জন্য নিরাপদ মনে করতাম। পরে সেখানে ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতাদের আগমণ হল।রথ নামল। ত্রিশুলের আস্ফালন হল। একটা বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হল চারপাশে।’ জানান বৃদ্ধ দরজি। ওয়ালিয়ুল্লাহ বলেন, ১৯৮৬ তে প্রথম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করলাম। সেই সময়ই প্রথমবার রাজীব গান্ধির নির্দেশ খুলে দেওয়া হল বাবরি মসজিদের গেটের তালা। জনগণের দর্শনের জন্য তা খুলে দেওয়া হল। তিনি যে মুসলিম তোষণ করছেন না তা প্রমাণ করতে বর্ণহিন্দু অধ্যুষিত এই নির্বাচনী কেন্দ্রে এমন কাণ্ড করা হয়েছিল। (ক্রমশ)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only