বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৯

বর্তমান আর ভবিষ্যতের মাঝে অস্তিত্বের স্মৃতি মেলাচ্ছে বাংলার হাট

রুবাইয়া জেসমিন

গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় আকাশটা আবছা লাল হয়ে নিভতে শুরু করেছে। সাইকেল আর মানুষের যাতায়াতে সরু রাস্তাটা একটু ফুরফুরে। কিছু দূরের নদী থেকে ভেসে আসছে হালকা শীতল বাতাস। অন্ধকার একটু একটু করে গিলতে শুরু করেছে চারিদিকের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর। নদীর পারে একজন কিশোর বসে আছে; না জানি কোন সুরের প্রেমে পড়েছে আজ। অন্ধকার বাড়ছে, কিন্তু কোন ভয় নেই ওর। কারণ আজ হাটবার, অনেক মানুষের যাতায়াত পাশেই রাস্তাটাতে। গল্পটা বেশ পুরোনো, আর সংস্কৃতিটাও। সময়ের সাথে সংস্কৃতির পরিবর্তন হবে- এটাই নিয়ম। কিন্তু এর এক একটা বিন্দুকেও সময় ধরে রেখে দেবে ডায়েরির পাতায়; কারণ সে গল্
 লিখতে ভালোবাসে আর মুছতেও।
ইতিহাসের পাতা ধরে এগোতে শুরু করলে কত শতাব্দী পেরোলে যে হাটের সূচনা দেখা যাবে, তা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এর ইতিহাসটা সভ্যতার বেড়ে ওঠার ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। আমাদের পৌরাণিক কাহিনীতেও উঠে এসেছে হাটের গল্প। মানুষ সমস্ত কিছুকে গুছিয়ে রাখতে ভালোবেসেছে চিরদিন। এই গুছিয়ে রাখার তাগিদ থেকেই হয়ত হাটের জন্ম। একটা জায়গায় সবকিছু পাওয়া যাবে আর খালি থলেটা ভর্তি করে বাড়ি ফিরবে মানুষ- এক সপ্তাহের বাজার। বলা যাই বছরের বড় বড় উৎসবের মাঝের ব্যবধানটাকে কিছুটা কমিয়েও দিয়েছে সমাজের এই ছোট্ট মিলন মেলা। মাসে চারটা দিন কোথাও আবার আটদিন!
হাট কিভাবে যেন আমাদের সংস্কৃতির সাথেও মিশে গেল একদিন। গল্প-কবিতা-গান এমনকি আঞ্চলিক সাহিত্যেও একটা জায়গা খুঁজে নিল সে। উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্য ভাওয়াইয়া গানেও দেখা মিলল এর অস্তিত্ব। একসময় নদীর ধার বরাবর হাটের শুভসূচনা হত। যোগাযোগ ব্যবস্থা তখন এত উন্নত হয়নি। সড়ক পথে গরুর গাড়িতে করে জিনিসপত্র আনার তুলনায় জলপথেই অনেক সহজ এবং সময় সাশ্রয়কারী ছিল। আর এই হাট মানুষকে একটা নতুন জীবিকার সন্ধানও এনে দিল। কত মানুষের সংসার যে এর সাথে গেঁথে গেল তা কল্পনাও করা যায়না। বানিজ্যের সাথে সাথে উন্নতি ঘটল সমাজের অর্থনীতির। কিন্তু ওই যে সময় গল্প লিখতে ভালোবাসে আবার মুছতেও। একসময় যে হাট সমাজের অর্থনীতিকে একটা নতুন স্তম্ভ দিয়েছিল, সে এখন ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিতেই ব্যস্ত। গল্পটা হয়ত বিবর্তনের অথবা নতুনত্বকে স্বাগত জানানোর! টেকনোলজির হাত ধরে এখন আধুনিক সমাজ ঝাঁ-চকচকে অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে। এখানে বড্ড বেমানান ঐতিহ্য ভরা হাটের গল্প।
হাটগুলো আসতে আসতে বন্ধ হয়ে আসছে। যে কটা এখনও বেঁচে আছে অথবা বেঁচে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে সেগুলোতে ভিড় ক্রমশ কমছে। বেচাকেনার মাধ্যমটা আরও বেশ সরল হয়েছে আজ। পাড়ায় পাড়ায় দোকান, একটু শহরে গেলেই শপিং মল- সংস্কৃতিটাকেই একটা নতুন মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। না আশ্চর্যের কিছু নেই; টেকনোলজির উন্নতির সাথে এই পরিবর্তন খুব মানানসই। যুক্ত পরিবার যখন একক, বাড়িগুলো যখন ফ্ল্যাটের রূপ নিয়েছে- সাপ্তাহিক মিলনমেলায় প্রয়োজন বোধহয় তখন সত্যিই নিষ্প্রভ!
এই পরিবর্তনের রাজত্বকে আরেকটু মসৃণ করতে এসেছে অনলাইন কেনাকাটা, সমাজের ভদ্র ভাষায় যাকে বলে ই-কমার্স। আর কোথাও যাওয়ার দরকার নেই বাড়িতে বসে জিনিস দেখা আর বাড়িতেই ডেলিভারি। দ্রব্যাদি পছন্দ না হলে ফেরতও চলে যায়। টাকাপয়সাও খুব সুরক্ষিত এই ব্যবস্থায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো দ্রব্যাদি পাওয়ার এক মাস পরেও টাকা দেওয়া যাচ্ছে। আর এই কেনাকাটার তালিকায় যুক্ত হয়েছে খাওয়ার থেকে পোশাক সব কিছু। বড় বড় শহরগুলোতে একদিনে ডেলিভারির ব্যবস্থাও আছে। সব মিলিয়ে সভ্যতা এখন টেকনোলজির গাড়িতে চেপে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। মানুষের জীবন ও জীবিকা সহজ করতেই একদিন হাটের জন্ম হয়েছিল আর সেই একই কারণেই তার পতনও হচ্ছে। হওয়াটা হয়ত অস্বাভাবিক না। তবু হাজার হাজার বছর ধরে যে ব্যবস্থা একটা সমাজকে পরিসেবা দিয়ে গেল, শুধু পরিসেবা নয় মিশে গেল তার সংস্কৃতিতেও তাকে ভুলিয়ে দেওয়া একটু হলেও সময় সাপেক্ষ। কিন্তু এই ভুলিয়ে দেওয়ার পদ্ধতিটাও কেমন যেন সেই অনলাইন সার্ভিসগুলোর মতোই দ্রুতগতিতে হচ্ছে। হয়ত আগামী প্রভাতে বাস্তবের মাটি থেকে মুছে যাবে হাটবারের চিৎকার, তবু সে বেঁচে থাকবে সময়ের কাঠঘোরায় ইতিহাস হয়ে। সভ্যতা আর সংস্কৃতির দলিলের মধ্যে সে গান করবে, সুর মেলাবে আর দেখবে নতুন প্রজন্মের নতুন সংস্কৃতির বেড়ে উঠা। রবি ঠাকুরের সাথেই সুর মিলিয়ে সে আজ বলছে-
“তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি।
সকল খেলায় করবে খেলা এই আমি- আহা,
নতুন নামে ডাকবে মোরে, বাঁধবে নতুন বাহু-ডোরে,
আসব যাব চিরদিনের সেই আমি।
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।।“

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only