মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৯

গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র খোঁজার মিথ্যা অজুহাতে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা গণহত্যা ঘটিয়েছে:­ ডোনাল্ড ট্রাম্প

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের অভিযোগ ছিল– সাদ্দাম হোসেনের ইরাক গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি ও মজুদ করছে। অতএব বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বর*প সাদ্দামকে কবজায় আনতে হবে। যুদ্ধ হবে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। টনি ব্লেয়ার– বুশ ও তাঁদের দোসররা সেই অজুহাতে ইরাক আক্রমণ করে ২০০৩ সালে। তবে মারণাস্ত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। সুতরাং– যুদ্ধ হয়েছিল মিথ্যা অজুহাতে। সেই স্বীকারোক্তি বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখে।  

পুবের কলম প্রতিবেদন­ বলপ্রয়োগ ও ভয় দেখানোর নীতিকে ব্যবহার করে আজ বিশ্বে দোর্দণ্ডপ্রতাপ আমেরিকা।  রিপাবলিকান থেকে শুরু করে ডেমোক্রেটিক পার্টি---সবাই এই নীতি ব্যবহার করে চলেছে। সম্প্রতি সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা করেছে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ এবং ছদ্ম-বামপন্থী ‘জ্যাকোবিন’ ম্যাগাজিন। কারণ আমেরিকার একশ্রেণির মিডিয়া ও জনগণ আগ্রাসনেই বিশ্বাস করে। তবে এই আগ্রাসন নীতি থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত মিলেছে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক এক টুইট-বার্তা থেকে। গত বুধবার ট্রাম্প সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহারের নিজ সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই দিয়ে একটি টুইট করেছেন। সেই টুইট বার্তায় তিনি লিখেছেন– ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জন্য আমেরিকা ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ ব্যয় করেছে (যা ভারতীয় মুদ্রায় ৫,৬৮,২৩,৬০০ কোটি টাকা!)। সেই যুদ্ধে আমাদের হাজার হাজার সৈন্য নিহত হয়েছে কিংবা গুরুতর আহত হয়েছে। অপরদিকে মারা গিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। আমেরিকার ইতিহাসে ঘটা নিকৃষ্টতম ভুল সিদ্ধান্ত এটি। এটি একটি ঐতিহাসিক ভুল। গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র রয়েছে– এমন সম্পূর্ণ ভুল ও মিথ্যা অভিযোগ তুলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল আমেরিকা। ’

ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পরে থেকে আমেরিকার সংবাদমাধ্যম যেন বশ্যতা স্বীকার করেছে তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্টের! এখানেই তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবর জানিয়েছেন। তাঁর টু্যইটার অ্যাকাউন্ট মারফত জানা গিয়েছে নয়া ফ্যাসিবাদী অভিবাসন নীতি– হোয়াইট হাউসের কর্মী ও মন্ত্রিপরিষদের ঘন ঘন পদ পরিবর্তনের ঘোষণা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির পরিবর্তন বিষয়ে! গত মাসে তিনি প্রায় ৮০০-র বেশি টুইট করেন। তবে কর্পোরেট মিডিয়া ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক টুইটগুলিকে গুরুত্ব না দেওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার আগ্রাসন নীতির সমালোচনা করছেন--- সেটাকেও তারা পাত্তা দিচ্ছে না বা দিতে চাইছে না। 
দু’টো ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে আমেরিকার বিশ্ব-রণনীতি। যখন ট্রাম্প ও তাঁর দলবল চিনের মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুতিতে পুরো মনোযোগ দিচ্ছে– তখন কিছু রাজনৈতিক দল– সৈন্যবাহিনী– গোয়েন্দারা মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য ও আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রাশিয়ার মোকাবিলার জন্য মার্কিন হস্তক্ষেপ জিইয়ে রাখার পক্ষে সওয়াল করছে। এটা মূলত ইউরেশিয়া অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখার জন্য করা হচ্ছে। কিন্তু এই ভূ-রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে একজন আমেরিকান রাষ্ট্রপতির এ হেন স্বীকারোক্তি যে– ওয়াশিংটন মিথ্যা ও অনুমানের ভিত্তিতে ভুয়ো অজুহাতে যুদ্ধ বাধিয়েছে– যা শেষ পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছে---এর সরাসরি একটি রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে– সে ট্রাম্পের যা-ই ইচ্ছা থাকুক না কেন। এটা আসলে এক ধরনের সরকারি বিবৃতির মতো– যা বলে দাবি করছে যে– পূর্ববর্তী সরকারগুলো গণহত্যার জন্য দায়ী ছিল। 
ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে– ২০০৩ সালে আমেরিকা মিথ্যা অভিযোগ তুলেই ইরাক আক্রমণ করেছিল। ধারণা ছিল– সেখানে নাকি গণবিধ্বংসী মারণ-অস্ত্র রয়েছে। সেটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। প্রকারান্তরে তিনি এটাই বলেছেন যে– জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন আমেরিকার জনগণ ও সমগ্র বিশ্বের মানুষকে মিথ্যা বলেছিলেন যুদ্ধ সৃষ্টি করার জন্য। 
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী– আন্তর্জাতিক আদালত গঠন করে যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়ে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসীদের বিচারের জন্য এমন ট্রাইবুনাল (নুরেমবার্গ ট্রাইবুনাল) গঠন করা হয়েছিল। হিটলার-পক্ষকে এই বিশ্বযুদ্ধ সৃষ্টির জন্য মূলত দায়ী করা হয়েছিল। হলোকাস্টের জন্যও তাদের অপরাধী হিসেবে বিচারের ব্যবস্থা হয়। এই নিয়ম মানলে এবার বুশ– ওবামা প্রশাসন– উচ্চপদস্থ আধিকারিক– এমনকি ট্রাম্প-প্রশাসনেরও এমন আধিকারিক যারা মধ্যপ্রাচ্য মার্কিন হস্তক্ষেপ জিইয়ে রেখে সিরিয়া– লিবিয়া প্রভৃতি দেশে যুদ্ধ বাধিয়েছে– তাদেরকে কাঠগড়ায় তোলার ব্যবস্থা হওয়া উচিত। ইরানকে যে আমেরিকা ক্রমাগত যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে– সেটাও তো যুদ্ধাপরাধ। তারও বিচার হওয়া উচিত। যুদ্ধে মূল কারণ ছিল ইরাকের বিপুল তৈল-সম্পদ। সেই তেলের খনি কবজা করার জন্যই এই আক্রমণ করা হয়েছিল। আর এই ব্যাপারটি এশিয়া ও ইউরোপে আমেরিকার মূল প্রতিপক্ষগুলিকে কঠোরভাবে দমন করতে সাহায্য করেছিল। বাড়বাড়ন্ত ঘটেছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের। 
 যুদ্ধের ফলে ইরাক একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। অথচ এই দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তুলনায় শিক্ষা– স্বাস্থ্য ও পরিকাঠামোগত দিক দিয়ে সামনের দিকে অবস্থান করছিল। যুদ্ধের ফলাফলও ছিল মারাত্মক। ‘জন হপকিনস ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ’ একটি সমীক্ষা (২০০৬) করেছিল বিষয়টি নিয়ে। সেটি প্রকাশিত হয়েছিল খ্যাতনামা মেডিক্যাল জার্নাল ‘দ্য ল্যান্সেট’-এ। সেখানে দেখা যাচ্ছে– যুদ্ধের প্রথম ৪০ মাসে মৃতু্য বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৬৫৫–০০০-এ। এত ভয়াবহ পরিণতি ছিল সেই যুদ্ধের। এই গণহত্যার পরিণাম শেষপর্যন্ত গৃহযুদ্ধে পর্যবসিত হয় আমেরিকার ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতির মাধ্যমে। জল– শক্তি– স্বাস্থ্য ইত্যাদি সেক্টর বিধ্বস্ত হয়ে যায়।  এই গণহত্যা বারাক ওবামার শাসনকালেও জারি ছিল। আইসিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ওবামা এটি নতুন ভাবে আরম্ভ করেন। এই যুদ্ধে ভিয়েতনামের পর সবচেয়ে বেশি বোম্বিং হতে দেখেছিল বিশ্ব। মসুল– রামাদি– ফাল্লুজাহ ও অন্যান্য  ইরাকি শহরগুলি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।  সম্প্রতি করা একটি সমীক্ষা অনুযায়ী– ইরাকে আমেরিকার ১৬ বছরের সেনা-অভিযানে প্রায় ২৪ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। 
এই ইরাক যুদ্ধ যে শুধু ইরাকের জনগণের ক্ষতিসাধন করেছে তা নয়। আমেরিকার সমাজ-জীবনেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। ৪৫০০-এর বেশি মার্কিন সৈন্য ও ৪০০০ মার্কিন কন্ট্রাক্টর প্রাণ হারান এই যুদ্ধে। হাজার দশেক সেনা আহত হয়েছিল ও হাজার হাজার সেনা যুদ্ধের আতঙ্কে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়। বহু সৈনিক-পরিবার তাদের সন্তান– ভাইবোন– পিতামাতাকে হারায় এই ইরাক যুদ্ধে। আজ ট্রাম্প বলছেন– সেই যুদ্ধ মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। যেসব ভুক্তভোগী এই যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন– তাদের উচিত এখন সরকারের কাছে এর বিচার চাওয়া। কেন এই অপরাধ করা হয়েছিল– কেন  তাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছিল? এই যুদ্ধের খরচও কম ছিল না। ২০০১-এর পর থেকে হিসেবে করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। 
ট্রাম্পের এই স্বীকারোক্তির পরেও কিন্তু কর্পোরেট মিডিয়া চুপ করে আছে। আসলে এইসব কর্পোরেট মিডিয়াই কিন্তু ইরাক আগ্রাসনের সময় মিথ্যার বেসাতি করে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করেছে এবং যুদ্ধ-বিরোধী কণ্ঠকে দাবিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। জুডিথ  মিলারদের মতো নামী কলামিস্টরা এই যুদ্ধের আগুনে ঘি ঢেলেছেন এই বলে যে– ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। অতএব যুদ্ধের প্রয়োজন রয়েছে। ওঁরা নিজেদের কলামে এটা লিখতেও দ্বিধা করেননি যে– তেলের জন্য যুদ্ধ করতে আমাদের অসুবিধা থাকা উচিত নয়। এই মিডিয়া প্রপাগান্ডা যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে যুদ্ধ জিইয়ে রাখতে ও জনগণের মনোভাব ঘুরিয়ে দিতে। তাই আজ যখন ট্রাম্পের বিলম্বিত বোধোদয় ঘটছে– তখন এই কর্পোরেট মিডিয়াগুলি পাত্তা দিতে চাইছে না। তবে তারা পাত্তা না দিলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই স্বীকারোক্তি যদি ভবিষ্যতে আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতি বদলাতে সাহায্য করে– তবে তা বিশ্বের জন্য যথেষ্ট স্বাস্থ্যকর হবে।       

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only