বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৯

'মৃত্যু উপত্যকা থেকে ফিরুক ঘরের মানুষ'


পুবের কলম, ওয়েব ডেস্ক, মুরারই: কেউ মজুরি না পেয়ে মৃত্যু উপত্যকায়, কেউ প্রাণের জন্য পালিয়ে আসছেন বাড়িতে। এমন পরিস্থিতিতে উৎকণ্ঠায় বহু মানুষ। জানা গেছে, মুরারই-২ ব্লক থেকে অন্তত ৩০-৪০ জন এলাকাবাসী রুজিরোজকারের কারণে কাশ্মীরে। বেশিরভাগ মুরারই -২ ব্লকের দাঁতুড়া, নয়াগ্রাম, বিশোড়, মিত্রপুর এলাকার বাসিন্দা।

মুরারই-২ ব্লকের মিত্রপুর ও  আমডোল পঞ্চায়েতের অধীন বেশ কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, সারা বছর কাজ থাকে না। সেই কারণেই ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া। মুম্বাই, চেন্নাই ও কাশ্মীর তাদের গন্তব্য।

এর আগেও, ২০১৪ সালে মিত্রপুর অঞ্চলের নয়াগ্রামের বাসিন্দা দুই নিরপরাধ কর্মী নয়াগ্রামের হায়দর আলি, জুলফিকার সেখকে পেটের দায়ে খাটতে গিয়ে ২৮ দিন পুলিশি অত্যাচারের শিকার হতে হয়। এখন তারা চেন্নাইয়ে কাজ করেন।

পেটের দায়ে নয়াগ্রামের নাসিমা বিবির স্বামী কর্মসূত্রে থাকেন কাশ্মীরে। সেখানে আপেল বাগান কিংবা ক্ষেতে কাজ করেন। মা ও মেয়ে বাড়িতে থাকে। নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া মাত্রই উৎকণ্ঠায় রয়েছে পরিবার।

তাঁদের দাবিগ্রামে তেমন কাজ নেই। তাই কিছু বেশি আয়ের সন্ধানে কেউ বৃদ্ধ বাবা-মা, অসুস্থ ভাইকে রেখে জীবন হাতে নিয়ে বাঙালির কাশ্মীরে যাওয়া। কিন্তু পুলগ্রামে পড়শি জেলা মুর্শিদাবাদের পাঁচজনের মৃত্যুতে তাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

তাই তাঁরা চান, পরিবারের লোক কাশ্মীর ছেড়ে বাড়ি ফিরুক। বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের সভাপতি সামিরুল ইসলাম বলেন, বীরভূমের পাইকর থানার মিত্রপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের নয়াগ্রামের প্রায় ৪০ জন বাসিন্দা কর্মসূত্রে কাশ্মীরে আছেন। আমরা সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। বলেছি, মজুরির কথা চিন্তা না করে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসুন।

কিন্তু আমার প্রশ্ন, কেন আমাদের রাজ্যের বাঙালিদের ভিন রাজ্যে যেতে হবে? এই দায় কারতৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য আপেল শেখ জানান, গ্রামে ১০০ দিনের কাজ নেই। পর্যাপ্ত কাজ দেওয়া যাচ্ছে না। তাই কাশ্মীরে কাজের সন্ধানে যায় এলাকার মানুষ। কারণ সেখানে আয় অনেক বেশি।

নয়াগ্রামের গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর শেখের চার ছেলের মধ্যে এক ছেলে আগেই মারা গিয়েছে। বড় ছেলে দীর্ঘদিন থেকে দিল্লিতে থাকে। বাড়িতে অসুস্থ সেজো ছেলে এছাড়া স্ত্রী, বউমা রয়েছেন। বাড়িতে উপার্জনক্ষম বলতে ছোট ছেলে রাকিবুল সেখ। সংসার চালাতে তাই তাকে পারি দিতে হয়েছে কাশ্মীরে।

জানা গেছে, মুরারই -২ ব্লকের আমডোল পঞ্চায়েতের লম্বাপাড়ার বাসিন্দা কাবাতুল সেখ (২৮), আনিকুল সেখ (২২), আলি হোসেন (১১) এবং মিত্রপুর পঞ্চায়েতের ভাগোল বর্ষাপুকুরের বাসিন্দা নাজিমুদ্দিন সেখ(৩৮), নয়া গ্রামের মইনুদ্দিন সেখ (৩৮), একইগ্রামের ডাবলু সেখ (৪২) সহ বেশ কিছুজন কাশ্মীরে আছেন। তাঁদের পরিবারও আতঙ্কগ্রস্থ।
নয়াগ্রামের সাজাহান সেখ জানানরোযার মাস থেকে খেটে কটা টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরব এই আসা ছিল। এখন প্রাণের মায়ায় বাড়ি ফিরছি। মজুরি যাক, প্রাণে বাঁচি আগে। একই কথা নয়াগ্রামের শাজাহান সেখের। 

তিনি বলেন, আমরা সবাই একে একে জম্মু আসছি। সবাই বারমুল্লা জেলায় আপেলের বাগানে কাজ করছিলাম। কাশ্মীরে ইন্টারনেট পরিষেবা নেই। তাই ব্যাঙ্কের টাকা তুলতে পারছে না মালিক। এখন প্রাণের মায়ায় জম্মুতে আসছি। কিন্তু জম্মুতেও এসে নেট কাজ করছে না। রেলের টিকিট বুক করতে পারছি না। একটা ট্রেনের খোঁজ ছিল। সেটা আর চলে না। দেখি কি হয়। বাড়ি ফিরে ছেলে বৌদের কি বলব? বলেছিলাম, রোযার মাসে কাশ্মীরে আসায় ঈদে কিছু দিতে পারছি না। তবে ফিরে তোমাদের সব আবদার মিটিয়ে দেব! কিন্তু আর পারলাম কৈ! 

নয়াগ্রামের বদিপুকুর পাড়ার বাসিন্দা আলাউদ্দিন সেখ বলেনবাড়িতে বাবা আব্দুল সেখ, স্ত্রী অনিতা বিবি সহ অন্যান্য সদস্যরা আছেন। রোযার মাসে কাশ্মীর আসায়  কাউকে ঈদে কিছু দিতে পারিনি।

নাজিমুদ্দিন সেখ জম্মু থেকে বলেন, রোযার মাস থেকে আপেলের বাগানে খাটছি। কাশ্মীর চলে  আসায়  কাউকে ঈদে কিছু দিতে পারি নি। বাড়িতে স্ত্রী সাজেদা বিবি ও রাইমুদ্দিন সহ অন্যান্য সদস্যদের কাছে খালি হাতে ফিরব কি করে! তাই অপেক্ষায় আছি। টাকা পেলেই চলে আসব!

একই কথা  ভাগোল বর্ষাপুকুরের বাসিন্দা নাজিমুদ্দিন সেখ, নয়া গ্রামের মইনুদ্দিন সেখ ও ডাবলু সেখের। তাঁরা বলেন, মালিক বলছে, কাশ্মীরের ইন্টারনেট বন্ধ, ব্যাঙ্ক পরিষেবা বন্ধ। তাই টাকা তুলতে পারছে না।

শ্রীনগরে মকিবুল সেখ জানান, এখানে পরিস্থিতি ভালো। টাকা পেলেই বাড়ি ফিরব। মালিক ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলতে পারছে না। এদিকে তাঁর বাড়িতে কান্নায় ভেঙে পড়ছে। তাঁর শাশুড়ির একটাই কথা, ফিরে এসো!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only