রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৯

বিদেশনীতি বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ওমপ্রকাশ মিশ্রর সাক্ষাৎকার



‘এনআরসি ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’


অধ্যাপক ওম প্রকাশ মিশ্র যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান। জাতীয় নিরাপত্তা পরামর্শদাতা পর্ষদের প্রাক্তন আমন্ত্রিত সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি নীতিনির্ধারক বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রাক্তন প্রধান। কিন্তু সেসব ছাপিয়ে টিভি চ্যানেলের দৌলতে আমজনতা তাঁকে চিনত কংগ্রেসের নেতা হিসেবে। প্রদেশ কংগ্রেসের সেই প্রাক্তন সহ-সভাপতি অধ্যাপক ওমপ্রকাশ মিশ্র কয়েক মাস আগে যোগ দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসে। তাঁর মুখোমুখি হয়েছিল পুবের কলম। বিস্তারিতভাবে ওমপ্রকাশ জানালেন তাঁর দল ছাড়ার পিছনের কথা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই অধ্যাপক মুখ খুললেন মোদি সরকারের জমানায় ভারতের বিদেশনীতি নিয়েও। শুনলেন চিন্ময় ভট্টাচার্য।

প্রশ্ন­ সিনিয়র কংগ্রেস নেতা হিসেবেই আপনাকে জনগণ চিনত। হঠাৎ কেন দলবদল?

ওমপ্রকাশ­  জাতীয় কংগ্রেসের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে ৩৯ বছর দলের জন্য কাজ করেছি– প্রতিনিধিত্ব করেছি এবং দলের নীতি ও আদর্শকে উর্ধ্বে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। ২০১৬ সালে কংগ্রেস এবং বাম জোটের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে সারারাজ্যে সর্বাধিক সংখ্যক নির্বাচনী প্রচারসভাও করেছি। এই জোটকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে বিজেপিকে রুখে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। আর সেটাই সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ২০১৮-র জুন মাসে এক পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচির প্রস্তাবও তৈরি করেছিলাম। অথচ দেখা গেল– কংগ্রেসের রাজ্য নেতৃত্ব বামেদের সঙ্গে জোটকে এগিয়ে না নিয়ে গিয়ে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাল। এর বিরুদ্ধে দলের ভিতরে প্রতিবাদ করেছি। আর জুলাই মাসে কংগ্রেসের সহ-সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছি। কারণ তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধিতা করতে গিয়ে তা বিদ্বেষের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন কংগ্রেস ও বাম নেতৃত্ব। যা বিজেপির রাজনৈতিক সুবিধা করে দিয়েছে। যার প্রমাণ– বিজেপির ভোট অভাবনীয়ভাবে ১০.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০.৩ শতাংশ হয়েছে। এই দায় নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রদেশ কংগ্রেস নেতারা তা করেননি। পাশাপাশি প্রদেশ নেতারা কেন বিজেপিকে অভিসন্ধিমূলকভাবে রাজনৈতিক জায়গা ছেড়ে দিলেন– তারও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু সেটাও কংগ্রেস করেনি।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার– বিজেপির বিরুদ্ধে আমার বক্তব্য দল অগ্রাহ্য করেছে। আমি পদত্যাগপত্র দেওয়ার পরও তা অগ্রাহ্য করা হয়েছে। আমি পদত্যাগ করার দু’মাস পর– ৩ সেপ্টেম্বর আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়। এই ধরনের ব্যবহার আসলে প্রদেশ কংগ্রেস নেতাদের বিজেপি প্রেম এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষকেই তুলে ধরেছে। যেদিন পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে– তার ঠিক পরদিনই ৪ সেপ্টেম্বর– মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে এবং নেতৃত্বে আমি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করেছি। 

প্রশ্ন­ বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতীয় রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুত্ব কতটা বলে মনে করেন?

ওমপ্রকাশ­  বর্তমানে দেশের রাজনীতিতে প্রগতিশীল– ধর্মনিরপেক্ষ, ভাবমূর্তির নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ কেউ হলে– তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের সুশাসন এবং উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর ভূমিকার কথা এখন শুধু গোটা দেশই নয়– বিশ্বও জানে। যেটুকু প্রশাসনিক ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল, তিনি সামলে নিয়েছেন। যার ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছে। তাঁর বিজেপি বিরোধিতা নিয়ে আজ কোনও প্রশ্ন তোলার জায়গা নেই। তাছাড়া, আগে থেকেই বিজেপি বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়কারীর ভূমিকা নিচ্ছে তৃণমূল। যার ফলে, আগামী দিনে সেই ভূমিকা আরও জোরালো হবে বলেই আশা করা যায়। 

 শেখ হাসিনা তো সম্প্রতি দিল্লি ঘুরে গেলেন। এনআরসি কি ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে? এই সফর থেকে বাংলাদেশ কী পেল?

ওমপ্রকাশ­ এনআরসি ইস্যু ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই আমার মনে হয়। এমনিতেও– আমরা আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে বাধ্য। এত খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, ভারতকে বারবার বাংলাদেশ সরকারকে বলতে হচ্ছে যে– তাদের অসম্মতি এবং বিরোধিতায় কাউকে বলপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানো হবে না। অথচ আরএসএস এবং বিজেপি একটা অপপ্রচার চালাচ্ছে। এর ফলে যেটা হবে– তা হল--- অযথা বাংলাদেশের সংখ্যালঘু মানুষ অস্বস্তিতে পড়বেন। পাশাপাশি, এদেশে বিশেষ করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিম বাংলায় জনসাধারণের মধ্যে সম্পর্ক বিষাক্ত এবং তিক্ত হয়ে উঠবে। শুধু এনআরসিই নয়। নাগরিকত্ব নিয়ে যে কোনও সংবিধান বিরোধী এবং বিভেদকামী নীতি প্রণয়ন এবং তার বাস্তবায়ন– সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গভীর ক্ষতর সৃষ্টি করবে। অথচ– গোটা উপমহাদেশের স্বার্থেই ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার দরকার ছিল। সেটাতেই ঘাটতি থাকছে।

 শি জিনপিং ভারতে এলেন। নয়াদিল্লি ইঙ্গিত দিল ভারত-চিন সম্পর্কের উন্নতি হচ্ছে। অথচ সেই চিনই পাকিস্তানকে ৩০০ ট্যাঙ্ক বিক্রি করল আপনার কী মনে হয়?

ওমপ্রকাশ­  শুধু চিনের সঙ্গে সম্পর্ক? মোদি সরকারের সাড়ে পাঁচ বছরের কর্মশালায় দেশের রাজনৈতিক এবং সামাজিক নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক এখন অনেক ভালো। আফগানিস্তানে তো আমেরিকা আর পাকিস্তান যোগসাজশ রেখে ভারতকে কোনও ক্ষেত্রেই ঢুকতে দিচ্ছে না। তার ওপর রাফালে সহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে যে ধরনের ভয়ানক অস্বচ্ছতা তৈরি হয়েছে, তা যথেষ্ট চিন্তার। সবচেয়ে বড় কথা, বর্তমানে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল ভারতের নিন্দা করছে। মোদি-শাহর জমানায় আমরা সত্যিই অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। 
আর চিন? ভারতের সঙ্গে চিনের সম্পর্কের কথা সবাই জানে। ডোকলামে তাদের সেনা প্রায়ই অনুপ্রবেশ করছে। সেখানেই প্রশ্ন উঠছে– আমরা কি এই অনুপ্রবেশ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় নমনীয়তা প্রদর্শন করছি? চিনকেও তাদের ভারত সীমান্ত নিয়ে উদার হতে হবে। বর্তমানে দু’দেশের সীমান্তের যা স্থিতি রয়েছে– সেটা বজায় রেখেই ভারত-চিনের সম্পর্কের উন্নতি ঘটানো দরকার। চিনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রুট’ প্রকল্পে আমাদেরও সহযোগিতা করা উচিত। তাতে দু’দেশেরই স্বার্থ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। 

আর পাকিস্তান? যেভাবে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়ছে, তাতে কি সত্যিই পরমাণু যুদ্ধের কোনও সম্ভাবনা রয়েছে? 

ওমপ্রকাশ­  বর্তমানে ভারত-পাকিস্তান দু’দেশকেই আরও সংযত আচরণ করতে হবে। কেবলমাত্র তাতেই উপমহাদেশের সংহতি এবং স্থায়িত্ব নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। আণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে সার্বিক যুদ্ধের নজির বিশ্বে নেই। কারণ এই যুদ্ধ কোনও পক্ষকেই জয়ী করতে পারে না। বিভিন্ন নেতারা এই যুদ্ধ নিয়ে যা হুমকি দিচ্ছেন– সেটা কোনও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় নয়। দু’দেশের সমস্যা বরং বাস্তবোচিত দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাধান করা উচিত। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only