বুধবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৯

বাবরি ধ্বংস ফাটল ধরাল সম্পর্কে, অযোধ্যার বৃদ্ধ দরজি ওয়ালিউল্লাহর দীর্ঘশ্বাস (৩)

স্থানীয় দর্জি ওয়ালিউল্লাহ
বাবরি ধ্বংসের পর কীভাবে মসজিদের শেষ ইমামের দুই পুত্রকে খুন করা হয়েছিল? ওই পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের দিন কাটছে কীভাবে? সেই সব না জানা মর্মন্তুদ ঘটনা তুলে ধরেছেন ‘দ্য প্রিন্ট’-এর প্রতিবেদক শিখা ত্রিবেদি। তারই ভাষান্তরের শেষ পর্ব পুবের কলম-এর এই প্রতিবেদন।

এক ধাক্কায় দেশের রাজনীতিতে ঢুকে পড়ল রাম লালা। সব রাজনৈতিক দলই রামলালা নিয়ে সচেতন হয়ে পড়ল। হিন্দুত্ববাদের মঞ্চ তৈরি হল নতুন করে। শুরু হল রামজন্মভূমি নিয়ে বিক্ষোভ। ১৯৯০ এ হাজার হাজার করসেবক প্রথমবার হাজির হল সরযূ নদীর তীরে। মসজিদ ধ্বংসই ছিল তাদের লক্ষ্য। সেই সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন ১৬ জন। তার আগে পর্যন্ত অযোধ্যায় আলাদা করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল না। তা শুরু হল, ওই সময় থেকেই। রাতারাতি অযোধ্যা একটি বিতর্কিত অঞ্চলে পরিণত হল। আক্ষেপের সঙ্গে জানালেন বৃদ্ধ ওয়ালিউল্লাহ। পরবর্তী দশকগুলিতে অযোধ্যায় বদল শুরু হল। ক্রমে সেটাই সেখানকার বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবন হয়ে উঠল। আগে মন্দিরগুলি নানা প্রয়োজনে স্থানীয় মুসলিমদের ওপর নির্ভর করত। পুজোর ফুল থেকে শুরু করে পোশাক সবকিছুতেই মুসলিমদের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল। ক্রমশ দুই সম্প্রদায়ই পরস্পরকে বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়।


‘আমাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ল। তারপরও আমার বহু হিন্দু কাস্টমার ছিল। প্রকাশ্যে তখনও কেউ শত্রুতা করত না। কিন্তু তারা এড়িয়ে চলতে শুরু করল। তখন স্পষ্ট বুঝতে পারলাম আমাদের সম্বন্ধে তাদের মনোভাব  ঠিক কেমন। আমাদের মধ্যে যে নরম সম্পর্ক ছিল, সেটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বহু পুরাতন জয় সিয়া রাম বন্ধ হয়ে তার জায়গায় জন্ম নিল ‘জয় শ্রীরাম’।’ দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদককে জানান ওয়ালিউল্লাহ। আর্থিক উন্নয়নের নিরিখে বিশ্বের সবথেকে গতিশীল দেশ ভারত। কিন্তু অযোধ্যা আটকে রয়েছে সেই মন্দির-মসজিদ দ্বন্দ্বে। এখানকার বাসিন্দাদের দিন কাটে  ভাঙা রাস্তা আর বদ্ধ নর্দমায়। আদালতে মামলা চলাকালীন কোনও সরকার আজ পর্যন্ত রামজন্মভূমির উন্নয়নের কোনও চেষ্টা করেনি। বদ্ধ নর্মদায় হোক কিংবা ভাঙাচোরা রাস্তা, গত ২৭ বছরে ওয়ালিউল্লাহ একবারও বের হননি নিজের শহর ছেড়ে। এই শহর যে তাঁর জন্মস্থান। 
কখনও কখনও তাঁকে কারাগার মনে হয় ঠিকই, তবুও এই শহর ছেড়ে যেতে মন চায় না তাঁর। বৃদ্ধ বলেন, ‘এখানকার প্রতিটি রাস্তায় নিরাপত্তা বেষ্টনী রয়েছে। অযোধ্যায় মাথা উঁচু করে কেউ হাঁটতে পারে না। পুলিশ ভিআইপিদের নিরাপত্তার জন্য বেষ্টনী তৈরি করল। অথচ তার জন্য আমাদের মাথা নিচু করে হাঁটতে হচ্ছে। এখানে প্রত্যেকের দম বন্ধ হয়ে আসছে।’
এই ৭৮ বছর বয়সেও সেলাই মেশিনের পিছনে বৃদ্ধ জোর করে বসান তাঁর ক্লান্ত শরীর। দু’চোখে ঝাপসা দৃষ্টি। তাতে তিনি কেবল দেখতে পান ইতিহাসের সেই প্রেতাত্মাদের। ওয়ালিউল্লাহ মনে করেন শান্তি আনতে যা করণীয়, তার সবটাতেই তাঁর সায় রয়েছে। তবে দ্রুত যেন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া না হয়। সাবধান করে তিনি বলেন, ‘মনে রাখবেন, অযোধ্যায় যদি একটি পেরেক পরে তবে তার শব্দ প্রতিধ্বনিত হবে গোটা ভারতে।’ (শেষ)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only