বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৯

বাবরির দাবি ছাড়ছে ওয়াকফ বোর্ড? শুনানির শেষ দিনে চাঞ্চল্যকর মোড়


পুবের কলম, নয়াদিল্লি: বাবরি মসজিদ, রামজন্মভূমি মামলার জন্য বুধবার ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এ দিন সুপ্রিম কোর্টে সমাপ্ত হল ১৪০ বছর পুরনো জমির মালিকানা সংক্রান্ত শুনানিপর্ব। মামলাটির শেষ পর্যায়ে সুপ্রিম কোর্ট ৪০ দিন ধরে প্রাত্যহিক শুনানি করেছে। বুধবার এই শুনানি পর্ব শেষ হল। এই সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্ট-এর প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ স্পষ্ট মন্তব্য করেন, যথেষ্ট হয়েছে। এ নিয়ে আর শুনানির সময় বৃদ্ধি করা হবে না। বাবরি মসজিদ পক্ষের বক্তব্য আগেই শেষ হয়েছিল। বুধবার শেষ হল হিন্দুপক্ষের শুনানি। ওয়াকিফহাল মহল বলছেন, এই মামলার রায় ১৭ নভেম্বরের মধ্যে ঘোষণা হওয়ার কথা। কারণ শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ ১৭ নভেম্বর অবসর গ্রহণ করবেন।  বুধবার রাতে খবর পাওয়া গেছে, সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রি একটি নোটিশ জারি করে বলেছে, আজ ১৭ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, বিচারপতি এস এ ববদে, বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, বিচারপতি এস আবদুল নাজির, বিচারপতি অশোক ভূষণ তাঁদের চেম্বারে মামলাটি নিয়ে পুনরায় বসবেন এবং রুদ্ধদ্বার আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে সেখানে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম খবর প্রকাশ করেছে, শুনানির শেষদিন অযোধ্যা মামলায় মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষ থেকে নতুন করে কোনও প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়। সেই প্রস্তাব ঘিরেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। জানা যাচ্ছে, শুনানি শেষ হলেও আজ বৃহস্পতিবার সেই নতুন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে পারেন বিচারপতিগণ।
সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেছে, ৩ দিনের মধ্যে মামলারত পক্ষগুলি রায় সম্পর্কিত ছাড় চেয়ে লিখিত আবেদন জানাতে পারে।
ইতিমধ্যেই অযোধ্যা মামলা আপসে মিটমাট করার জন্য যে প্যানেল গঠন করা হয়েছিল, বুধবার শুনানির শেষ দিনে ওই প্যানেলের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এফ এম আই খালিফউল্লাহ সদস্য অ্যাডভোকেট শ্রীরাম পাঞ্চু, আধ্যাত্মিক নেতা শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর তাদের এক মীমাংসা প্রস্তাব সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করেছে। 
বুধবার শুনানির শেষ দিন হিন্দু মহাসভার আইনজীবী বিকাশ সিং একটি বই সহ ছবি সুপ্রিম কোর্টে পেশ করেন। যাতে বলা হয়েছে, ওই বিশেষ স্থান লর্ড রামের জন্মস্থান। তারা এই সম্পর্কিত কয়েকটি নথিও পেশ করেন। বাবরি মসজিদ পক্ষের আইনজীবী রাজীব ধওয়ান এই নথিগুলি সম্পর্কে আপত্তি জানিয়ে বলেন, এগুলো মামলার রেকর্ডে নেই। এবার ৫ বিচারপতির বেঞ্চের কাছে এই অনুমতি চান যে, আপনারা যদি পারমিশন দেন, তাহলে আমি হিন্দু মহাসভার এই নথিগুলি ছিঁড়ে ফেলব। এরপরই তিনি ওই নথিগুলি আদালতের মধ্যেই টুকরো টুকরো করে ফেলেন। ধাওয়ান এই মামলা সংক্রান্ত একটি বই পেশ 
করা নিয়েও আপত্তি জানান। আদালত ধাওয়ানের আপত্তিকে নথিভুক্ত করে। 
বুধবার শুনানির প্রথমদিকে হিন্দুপক্ষের আইনজীবী সি এস বৈদ্যনাথন স্বীকার করেন, মুসলিমরা বিতর্কিত স্থানটিতে ১৮৫৭ সাল থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত যে জুম্মার নামায আদায় করেছেন, সে সম্পর্কে কিছু প্রমাণ অবশ্যই থাকতে পারে। তিনি বলেন, এরপর থেকে মুসলিমরা সেখানে নামায পড়েছেন এমন কোনও প্রমাণ নেই। অন্যদিকে মুসলিম পক্ষের বক্তব্য হচ্ছে, তারা বাবরি মসজিদে বিরামহীনভাবে নামায পড়েছেন এবং ১৯৪৯ সালের ২২ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে গোপনে রাম-সীতার মূর্তি সেখানে স্থাপন করার পর উত্তরপ্রদেশ প্রশাসন বাবরি মসজিদে নামায আদায় বন্ধ করে দেয়। 
এ দিকে চাঞ্চল্যকর দাবি করা হচ্ছে যে, সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড নাকি অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ সম্পর্কে দাবি ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে এবং সরকার যদি এই স্থানটিকে রাম মন্দিরের জন্য দিয়ে দেয়, তাহলে তাদের কোনও আপত্তি নেই। পরিবর্তে নাকি ওয়াকফ বোর্ড বলেছে, এর পরিবর্তে যদি সরকার অযোধ্যায় অবস্থিত অন্য মসজিদগুলিকে সংস্কার করে দেয়, তাহলে তারা বাবরি মসজিদের জমি রাম মন্দির নির্মাণের জন্য দিয়ে দেবে। 
এ দিকে ওয়াকফ বোর্ডের আইনজীবী রাজীব ধাওয়ান বলেছেন, সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড এই ধরনের কোনও অবস্থান নিয়েছে বলে তাঁর জানা নেই। ওয়াকিফহাল মহল বলছেন, সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান জাফর আহমদ ফারুকিকে যোগী সরকার বাবরি মসজিদ জমির মালিকানা নিয়ে এই ধরনের একটি অবস্থান গ্রহণ করতে বাধ্য করতে পারে। কারণ মঙ্গলবারই উত্তরপ্রদেশের আঞ্চলিক ভাষার পত্রিকাগুলিতে বেরিয়েছিল যে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড চেয়ারম্যান জাফর আহমদ ফারুকির আদেশ অনুযায়ী বাবরি মসজিদের জমির মালিকানা সংক্রান্ত মামলায় তাদের দাবি ছেড়ে দিতে রাজি হয়ে গেছে। সেই অনুযায়ী, তাদের আইনজীবী রাজীব ধাওয়ানকে না জানিয়েই নিজেরাই সুপ্রিম কোর্টে একটি এফিডেভিট দাখিল করে এই মামলায় তাদের দাবি প্রত্যাহার করে নেয়।  এ দিকে ওয়াকিফহাল মহল বলছে, যোগী সরকার জাফর আহমদ ফারুকির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ৩টি এফআইআর দাখিল করেছে। উত্তরপ্রদেশের যোগী সরকার ফারুকির বিরুদ্ধে একটি সিবিআই তদন্তেরও সুপারিশ করেছে। যোগী সরকার বলছে, ফারুকি ও অন্য ওয়াকফ বোর্ড সদস্যরা অবৈধভাবে ওয়াকফের সম্পত্তি বিক্রি ও বোর্ডের জন্য জমি ক্রয় করেছে। প্রমাণিত হলে এটি একটি বড় অপরাধ। যোগী সরকার ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান ফারুকিকে ভয় দেখিয়ে এই মামলায় দাবি ছেড়ে দেওয়ার জন্য স্বীকৃতি আদায় করেছে। 
তবে বাবরি মসজিদের বিষয়টি শুধুমাত্র সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের এক্তিয়ারভুক্ত নয় বরং সমগ্র ভারতের মুসলিমদের ভাবাবেগ জড়িত রয়েছে এই মামলাটির সঙ্গে। তাদের বক্তব্য যদি এইভাবে ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত যে উপাসনালয় মসজিদ ছিল এবং যেখানে নিয়মিতভাবে মুসলিমরা নামায আদায় করেছে, জোর করে তার চরিত্র পরিবর্তন করে ফেলা হয় তাহলে সংখ্যালঘুদের আরও বিভিন্ন ধর্মস্থান যেমন মসজিদ, চার্চ এবং বৌদ্ধদের মঠকে এইভাবেই দখল করে নেওয়া হতে পারে। 
এ দিকে জানা যাচ্ছে, সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড চেয়ারম্যান জাফর আহমদ ফারুকি কথিত মুসলিম হামলাকারীদের থেকে নিজেকে রক্ষা করতে ওয়াই ক্যাটিগোরির সিকিউরিটি দাবি করেছেন। বুধবার সকাল থেকে তিনি তাঁর মোবাইল সুইচ অফ করে রেখেছেন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only