বুধবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৯

ভারত বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে লজ্জাজনক অবস্থায় কেন?



সদ্য প্রকাশিত গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স (জিএইচআই) অর্থাৎ বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ১১৭টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান তালিকার নিচের দিকে– ১০২ নম্বরে। ২০১৮ সালে এই তালিকায় ভারতের স্থান ছিল ১০৩ নম্বরে– তবে সেই বছরের তালিকা তৈরি করা হয়েছিল ১১৯টি দেশের উপর সমীক্ষা করে। তাই এই বছরের তালিকা দেখে আপাতদৃষ্টিতে ভারত এক ধাপ উপরে উঠেছে মনে হলেও আদতে কিন্তু অন্য দেশের তুলনায় খুবই খারাপ অবস্থায় রয়েছে। বরং ভারতের চেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান– বাংলাদেশ– শ্রীলঙ্কা– নেপাল। ক্ষুধার নিরিখে বিশ্ব ক্ষুধা সূচক ক্রমবিন্যস্ত হয় ‘সর্বনিম্ন’ (লো) – ‘মাঝামাঝি’ (মডারেট)– ‘উদ্বেগজনক’ (সিরিয়াস)– ‘বিপজ্জনক’ (অ্যালার্মিং) ও ‘ভীষণ বিপজ্জনক’ (এক্সট্রিমলি অ্যালার্মিং)। অন্যান্য ৪৭টি দেশের সঙ্গে ভারতের স্থান ‘উদ্বেগজনক’ পর্যায়ে।
২০১৯ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে জানা যাচ্ছে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ৮২ কোটি ২০ লক্ষ। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৭৮ কোটি ৫০ লক্ষ। সমীক্ষায় আরও জানা গিয়েছে– বেশ কয়েকটি দেশ ক্ষুধা সূচকে ২০১০ সালের তুলনায় উপরের দিকে উঠে এসেছে। প্রায় ৪৫টি দেশ ২০৩০ সাল পর্যন্ত ক্ষুধা দূরীকরণ করতে পারবে– সমীক্ষায় এমন অনুকূল তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই সেই দেশগুলি ২০৩০ সালের মধ্যেও ‘সর্বনিম্ন’ পর্যায়ে আসতে ব্যর্থ হবে ধরে নেওয়া যায়।
বিশ্ব ক্ষুধা সূচক কী?
২০০০ সাল থেকে প্রায় প্রতি বছর প্রকাশিত হয় বিশ্ব ক্ষুধা সূচক– চলতি বছরের তালিকা ১৪তম। এই সূচকে যে-দেশ যত কম স্কোর পাবে সেই দেশের স্থান তত সন্তোষজনক অবস্থায় তালিকায় উপরের দিকে থাকবে। এই ক্ষুধা সূচক তৈরি করার মূল লক্ষ্য– ২০৩০ সালের মধ্যে সমগ্র বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা সম্পূর্ণ দূরীকরণ করা। এই কারণে ক্ষুধা সূচকের স্কোর গণনা করতে বাদ দেওয়া হয় নিশ্চিত উচ্চ আয়ের দেশগুলিকে। সাধারণ দৃষ্টিতে আমরা ক্ষুধা বলতে খাদ্যের অনটন বুঝলেও নিরীক্ষার ক্ষেত্রে তা গণ্য হয় না। ক্ষুধা সূচকের তালিকা প্রস্তুত করতে ক্ষুধা বিচার্য হয় ক্যালোরি গ্রহণের মাত্রা অনুযায়ী। তবে এখানেই তা সীমাবদ্ধ নয়। অন্যান্য দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ভিন্ন হওয়ার জন্য চারটি মানদণ্ড বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের তালিকা তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কীভাবে পরিমাপ করা হয় ক্ষুধা?
অপুষ্টিজনিত­ গণনা করা হয় কত সংখ্যক মানুষ পুষ্টিগুণ কম এমন খাবার খেতে অভ্যস্ত সেই নিরিখে। অর্থাৎ– ক্যালোরি গ্রহণের মাত্রা অপর্যাপ্ত কি না।
চাইল্ড ওয়েস্টিং­ পরিমাপ করা হয় পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের উচ্চতার অনুপাতে কম ওজনের নিরিখে। দৈনন্দিন জীবনে পুষ্টিকর খাবারের অভাবে এর কারণ।
চাইল্ড স্টান্টিং­ পরিমাপ করা হয় পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের বয়সের অনুপাতে কম উচ্চতার নিরিখে। দীর্ঘদিন ধরে পুষ্টিকর খাবারের অভাবে এর কারণ।
চাইল্ড মর্টালিটি­ পরিমাপ করা হয় পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মৃত্যুর হার কেমন– সেই নিরিখে।
বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের অবস্থা কেমন?
ব্রাজিল– রাশিয়া– ভারত– চিন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা এই পাঁচটি দেশ নিয়ে উদীয়মান অর্থনীতির যে সঙঘ ‘ব্রিকস’ (প্রতিটি দেশের নামের আদ্যাক্ষর অনুযায়ী) গঠিত হয়েছিল– সেই পাঁচটি দেশের তুলনায় বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। মোট ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে এই ক্ষুধা সূচক তালিকা তৈরি করা হয়। অর্থাৎ– যদি কোনও দেশের স্কোর হয় ‘০’– তবে ধরে নেওয়া হয় সেই দেশে ক্ষুধার্ত মানুষ নেই। তালিকায় যেখানে ভারতের স্থান ১০২– সেখানে চিনের স্থান ২৫। তাই চিন সেই দেশের নাগরিকের ক্ষুধা নিবারনের ক্ষেত্রে অনেকটা সফল– স্থান পেয়েছে ‘নিম্ন’ পর্যায়ে। ক্ষুধার্ত নির্ধারণ মানদণ্ডে ভারতের স্কোর ৩০.৩ এবং চিনের স্কোর মাত্র ৬.৫। গরিব আফ্রিকান দেশগুলি-সহ শ্রীলঙ্কা (তালিকায় স্থান ৬৬)– মায়ানমার (তালিকায় স্থান ৬৯)– নেপাল (তালিকায় স্থান ৭৩)– বাংলাদেশ (তালিকায় স্থান ৮৮) ও পাকিস্তান (তালিকায় স্থান ৯৪) ভালো অবস্থায় আছে ভারতের তুলনায়। অন্যান্য যে-দেশগুলি ভারতের চেয়ে এগিয়ে আছে--- সৌদি আরব (তালিকায় স্থান ৩৪)– ভেনেজুয়েলা (তালিকায় স্থান ৬৫)– লেসোথো (তালিকায় স্থান ৭৯)– বুরকিনা ফাসো (তালিকায় স্থান ৮৮) এবং উত্তর কোরিয়া (তালিকায় স্থান ৯২)। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের এবং বিরাট অর্থনীতির দেশ ভারতের নাম বিশ্ব ক্ষুধা তালিকায় ১০২ নম্বরে থাকা অত্যন্ত লজ্জাজনক ব্যাপার। তালিকায় ভারতের নিচে যে-দেশগুলি আছে সেই দেশগুলি দুর্বল সরকার দ্বারা পরিচালিত কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে বছরভর চরম দুর্দশায় থাকে।  তার মধ্যে কয়েকটি দেশ মারাত্মকভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত। এই দেশগুলি হল আফগানিস্তান (তালিকায় স্থান ১০৮)– ইয়েমেন (তালিকায় স্থান ১১৬)– হাইতি (তালিকায় স্থান ১১১)– লাইবেরিয়া (তালিকায় স্থান ১১২)–  জাম্বিয়া (তালিকায় স্থান ১১৩)– মাদাগাস্কার (তালিকায় স্থান ১১৪) ইত্যাদি। তালিকার প্রথম দিকে আছে বেলারুস– বসনিয়া– বুলগেরিয়া– চিলি– কোস্টারিকা– ক্রোয়েশিয়া ইত্যাদি দেশগুলি।
বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের স্থান এত নীচে কেন?
২০১৯ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারত স্কোর করেছে ৩০.৩। এই নিরিখে ভারতের কাছাকাছি দেশ নিগার (তালিকায় স্থান ১০১– স্কোর ৩০.২) এবং সিয়েরা লিওন (তালিকায় স্থান ১০৩– স্কোর ৩০.৪)। আলোচিত সূচকে ২০০০ সালে ভারতের স্কোর ছিল ৩৮.৮ এবং ক্ষুধার মানদণ্ডে ‘বিপজ্জনক’ (অ্যালার্মিং) পর্যায়ে ছিল। গত ১৯ বছরে ভারত ক্ষুধা দূর করার প্রচেষ্টায় ক্রমশ এগিয়ে গিয়ে বর্তমানে ‘উদ্বেগজনক’ পর্যায়ে আসতে পেরেছে ‘বিপজ্জনক’ পর্যায় থেকে। তবে এই এগিয়ে যাওয়ার গতি অপেক্ষাকৃত ধীর গতিতে সম পর্যায়ের অন্য দেশগুলির তুলনায়। দৃষ্টান্ত হিসাবে উল্লেখ করতেই হয়– ২০০০ সালে বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে নিগার ও সিয়েরা লিওন দেশ দু’টির স্কোর ছিল যথাক্রমে ৫২.১ ও ৫৩.৬। দু’টি দেশই ছিল ‘ভীষণ বিপজ্জনক’ পর্যায়ে। ভারতের চেয়ে অপেক্ষাকৃত দ্রুত গতিতে সেই খারাপ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হয়েছে দেশ দু’টি। তাই ক্ষুধা সূচকের তালিকায় ভারত স্কোর কমিয়ে অগ্রসর হলেও এবং ২০০০ সাল থেকে দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধির দেশ হিসাবে গণ্য হলেও ক্ষুধা দূরীকরণে পরিস্থিতি আশাপ্রদ নয়। ফলস্বরূপ– ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা দূরীকরণের লক্ষ্যমাত্রায় ভারত উল্লেখযোগ্য উন্নতি করবে বলে মনে হয় না।
ভারতের ধীর গতিতে উন্নতির নেপথ্যে কী কারণ?
ভারত বিস্তর উন্নতি করেছে ধরে নিলেও একটি ক্ষেত্রে অবস্থা অতীতের তুলনায় আরও খারাপ অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। সেটি হল চাইল্ড ওয়েস্টিং, অর্থাৎ পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের উচ্চতার অনুপাতে কম ওজন। এই ক্ষেত্রে ২০১০ সালে ভারতের স্কোর ছিল ১৬.৫ এবং বর্তমানে ২০.৮। ৯ বছরে এই তারতম্য প্রমাণ করে যে ভারতের অধিকাংশ মানুষ অপুষ্টিজনিত খাদ্য গ্রহণ করে যার ফলে অন্য দেশগুলির তুলনায় ভারত অনেকটা খারাপ অবস্থায়।
বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের রিপোর্টে বলা হয়েছে– ‘চাইল্ড ওয়েস্টিং-এ ভারতের স্কোর ২০.৮ শতাংশ যা অনেকটা বেশি। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত এবং অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনও দেশের ওয়েস্টিং রেট গণনা করা হয়। চাইল্ড স্টান্টিং-এ ভারতের স্কোর ৩৭.৯ শতাংশ যা অত্যন্ত বেশি। ভারতে ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সি শিশুদের যে খাবার দেওয়া হয় তা ন্যুনতম।’
ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে– ‘২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’ শুরু করেন। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল– সমস্ত ভারতবাসীর খোলা জায়গায় মলত্যাগ বন্ধ করতে এবং প্রতিটি বাড়িতে শৌচাগার থাকা নিশ্চিত করতে। নতুন শৌচাগার তৈরি হওয়ার পরেও খোলা জায়গায় মলত্যাগ এখনও সম্পূর্ণ ত্যাগ করে উঠতে পারেনি ভারতের আপামর গ্রামবাসী। তাই জনস্বাস্থ্য– শিশুদের বিকাশ ইত্যাদি নিরিখে ভারত সংকটজনক অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

হাইলাইট­
সমগ্র বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা– অপুষ্টিজনিত উপসর্গ ইত্যাদি বিষয়ে সমীক্ষা চালিয়ে প্রস্তুত হয় ‘গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স’ (বিশ্ব ক্ষুধা সূচক) নামের খতিয়ান। সম্প্রতি প্রকাশিত ২০১৯ সালের সূচকে দেখা যাচ্ছে– প্রতিটি নাগরিকের মুখে পুষ্টিকর খাবার তুলে দেওয়ার খতিয়ানে ভারত (১০২) রয়েছে তালিকার নিচের সারিতে। ভারতের চেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা (৬৬)– মায়ানমার (৬৯)– নেপাল (৭৩)– বাংলাদেশ (৮৮) ও পাকিস্তান (৯৪)।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only