বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৯

চোখের জলে বিদায় জানাল বাহালনগর



বাহালনগর থেকে মুহাম্মদ মুস্তাক আলির রিপোর্ট 

কাশ্মীরে নিহত রফিক সেখ, কামিরুদ্দিন সেখ, নাইমুদ্দিন সেখ, রাকিবুল সেখ এবং মুরসেলিম সেখদের গোসল দেওয়া লাশ বাড়ি থেকে এক এক করে পৌঁছে গেল স্থানীয় গোরস্থানে। তারপর মুর্শিদাবাদের নানা জায়গা থেকে আসা কুড়ি হাজারেরও বেশি মুসল্লি এবং নিকটাত্মীয়দের অশ্রুধারার মাঝে লাশগুলিকে সামনে রেখে আদায় করা হল জানাযার নামায। সকলেই প্রার্থনা করলেন, আল্লাহ্! এই মানুষগুলি পরিবারের মুখে ভাত জোগাতে কাশ্মীরে গিয়েছিল। এই কাজেই তারা শহিদ হয়েছে। তুমি তাদের জান্নাতে স্থান দিও।’ অনেকে আবার আল্লাহ্-র কাছে দু’হাত তুলে ইনসাফ কামনা করলেন। এক এক করে মৃতদেহগুলি সদ্য খোঁড়া পাঁচটি কবরে নামানো হল। এর পর ইসলামি নিয়মানুসারে মাটি দেওয়া শেষ হলে অনুষ্ঠিত হল গণ দুআ। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানাযায় শরিক মানুষরা নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে গেলেন। আর এর মধ্যে দিয়ে শুরু হল নিহতদের পরিবারগুলির বেঁচে থাকার এক অনন্য লড়াই। এ লড়াই তাদের কোনও গন্তব্যে পৌঁছে দেবে, তা অবশ্য তাদের জানা নেই।

তবে প্রিয়জনদের হারানোর রুদ্ধ কান্নায় মনে হচ্ছিল সাগরদিঘির বাহালনগরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে। নিহত মজদুর রফিক সেখের সদ্য বিধবা স্ত্রী সামিরুন বিবি, কামিরুদ্দিন সেখের স্ত্রী রওশান আরা বিবি, মুরসালিমের সহধর্মিণী সায়রা বিবি, নাইমুদ্দিন সেখের স্ত্রী আবেদা বিবি, রফিকুল সেখের বিধবা স্ত্রী মাবিয়া বিবিদের বুক ফাটা কান্নার মধ্যে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছিল, ‘পেটের দায়ে ভিনরাজ্যে যাওয়া এই মানুষগুলোর কী এমন অপরাধ ছিল? কেন তাঁদের নির্মমভাবে খুন করা হল? কাশ্মীরের কুলগামে নিহত শ্রমিকদের এতিম বাচ্চাদের কান্নার দৃশ্য সহ্য করার মতো ক্ষমতা বোধহয় কম মানুষেরই ছিল। সবারই প্রশ্ন, কারা খুন করল নিরীহ এই প্রবাসী শ্রমিকদের? কিন্তু কারও কাছে এর কোনও উত্তর ছিল না। যদিও জনপ্রতিনিধিরা তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ন্যক্কারজনক এই ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে তাঁরা সরব হয়েছেন।

কাশ্মীরে নিহত হয়েছেন এই গ্রামের মজদুররা, এই খবর পাওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ সহ সাধারণ মানুষের ঢল নেমেছে। এ দিন বৃহস্পতিবার নিহত শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে দেখা করতে যান জঙ্গিপুর লোকসভার সাংসদ খলিলুর রহমান, রাজ্যের শ্রম প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, সাংসদ মহুয়া মৈত্র, বিধায়ক সুব্রত সাহা, আমিরুল ইসলাম, মুহাম্মদ আখরুজ্জামান, মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদের মেন্টর মুহাম্মদ সোহরাব, সাংসদ আবু তাহের, জেলা পরিষদ সদস্য মোশারফ হোসেন প্রমুখ।

বৃহস্পতিবার ভোরের আলো ফোটার আগেই শোকার্ত গ্রামে নিহত শ্রমিকদের লাশ সঙ্গে করে নিয়ে পৌঁছন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। তিনি নিহত প্রত্যেক শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে তাঁর গভীর সমবেদনা জানান। একইসঙ্গে ফিরহাদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর শোকবার্তাও পৌঁছে দেন।
দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ বাহালনগরে পৌঁছে যান রাজ্য সরকারের পরিবহণমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া পাঁচ লক্ষ টাকা করে অনুদানের চেক পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেন। নিহত প্রত্যেক পরিবারের সদস্যদের একজনকে সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন।
ওই দুঃসংবাদ পাওয়ার পর বুধবার সারারাত জেগেছে এনএইচ-৩৪ রোডের পাশে ছোট্ট অথচ গোছানো বাহালনগর গ্রামের প্রায় সব মানুষ। ওই রাতেই শোকার্ত আত্মীয়-স্বজন ও সাধারণ মানুষরা পৌঁছে যান ওই গ্রামে। গ্রামবাসীরা বলেন, এ রকম দৃশ্য গ্রামে কোনওদিন দেখা যায়নি। কারণ, এ দিন উপস্থিত হয়েছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলাশাসক জগদীশপ্রসাদ মীনা, জেলা পুলিশ সুপার মুকেশকুমার সহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ আধিকারিক। আর ভিড়ের চাপে এবং মানুষের কালো মাথায় ঢাকা পড়ে যায় অখ্যাত এই গ্রামটি।

বাহালনগর ছোট হলেও রয়েছে ঘনবসতি। প্রায় হাজার ছয়েক লোকের বাস। অধিকাংশ দরিদ্রসীমার নীচে বসবাস করেন। গ্রামবাসীদের কথায় সারা বছর এলাকাতে কাজ মেলে না। তাই ভিন রাজ্যগুলোতে রুজির খোঁজে অনেকেই পাড়ি জমান। কাশ্মীরেও বাড়তি মজুুরির টানে ছুটে যান এলাকার বহু শ্রমিক। এলাকাবাসীর বক্তব্য, আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে ধান রোয়া শেষ হলে তেমন কাজ মেলে না শ্রমিকদের। রুটির টানেই ছুটে যান শ্রমিকরা দিল্লি, কেরল, সুরাত, মুম্বই, পঞ্জাব, কাশ্মীর, তামিলনাড়ু প্রভৃতি জায়গায়। সারা কাশ্মীরে ৬০-৬৫ দিনের জন্য কাজে যান। তাঁরা ফিরে এসে কাশ্মীরি মানুষদের আপ্যায়নের বা সুনামের কথা কথা শোনান গ্রামবাসীদের। উচ্চ মজুরি তো মেলেই, কাজ করিয়ে ন্যায্য মজুরি দেয় না, এমন ঘটনা অন্তত কাশ্মীরে ঘটে না। বরং ভালো কাজ করলে বাড়তি মজুরিই জোটে কাশ্মীরে। তাই এমন কাশ্মীরে নিরাপরাধ শ্রমিকদের কারা খুন করল তাই নিয়েই ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছে স্থানীয় জনমানসে।
সামিরুল বিবি, রওশান আরা বিবি, আবেদা বিবি, মাবিয়া বিবিদের বক্তব্য, ইতিপূর্বে একাধিকবার নিহত এই শ্রমিকরা কাশ্মীরে কাজে গেছেন। তাঁদের দাবি, বাড়ি ফিরে এসে কখনও এই শ্রমিকরা কাশ্মীরের মানুষের বিরুদ্ধে সামান্যতম অভিযোগ করেননি। তাঁদের আর্তি, কেবল পেটের জন্য এই শ্রমিকরা কাশ্মীরে কাজে গিয়ে বিনা অপরাধে খুন হয়ে গেলেন। এখন সন্তান-সন্ততি নিয়ে কীভাবে চলবে তাঁদের? এই ভাবনা তাঁদের এখন কুঁরে কুঁরে খাচ্ছে।
অন্যদিকে– আর যে সব শ্রমিকরা এলাকা থেকে কাশ্মীরে কাজে গিয়েছেন তাঁরাও আতঙ্কে মুর্শিদাবাদে ফিরে আসছেন বলে সেইসব পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।

হাসান রেজা, নজরুল সেখ, হাসমত আলি প্রমুখের বক্তব্য, কাশ্মীরে গিয়ে কেউ ফেরি করতেন, কেউবা কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। এতদিন কাশ্মীর গিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি। বর্তমানে কাশ্মীরে রয়েছে সেনা বাহিনীর কড়া প্রহরা। এর মাঝেও মুর্শিদাবাদের একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের পাঁচ জন শ্রমিকের খুনের ঘটনা সকলকে অবাক করেছে।

মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম বলেন, মুর্শিবাদাদের এই পাঁচ নিহত শ্রমিদের দায় এড়াতে পারেন না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কাশ্মীর যে অশান্ত এ ঘটনায় প্রমাণ করছে। নৃশংস এই হত্যায় উপযুক্ত তদন্ত করতে হবে। নিহত পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাই।

শ্রম প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের বক্তব্য, রাজ্য সরকার সর্বতোভাবে নিহত পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা করবে। কাশ্মীরে নতুন করে অশান্ত পরিবেশের জন্য বিজেপি নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্র সরকার অস্বীকার করতে পারে না। অবিলম্বে কাশ্মীরে শান্তি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে কেন্দ্র সরকারকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only